
হাসপাতালে রোগী, পরিবার ও চিকিৎসকরা।
শেষ আপডেট: 19 June 2024 18:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পূর্ব ভারতের সবচেয়ে কম বয়সে পেডিয়াট্রিক রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট করে নজির গড়ল দ্য ক্যালকাটা মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিএমআরআই। একটি নয়, দু'-দু'টি শিশুর কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সফল হয়েছে এই হাসপাতালে। ২ বছর বয়সি আদিদেব এবং ৭ বছর বয়সি পবিত্রার এই সফল সার্জারি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক নির্মাণ করল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, এই দু'টিই ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল অস্ত্রোপচার। সাফল্যের সম্ভাবনাও ১০০ শতাংশ ছিল না। তার পরেও যে ঝুঁকি নিয়ে এবং যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অস্ত্রোপচারের পথে পা বাড়িয়ে সফল হয়েছে সিএমআরআই, সেটা যে কেবল চিকিৎসক ও হাসপাতালের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব তা নয়, নিরন্তর গবেষণার ফলে তৈরি আধুনিক ও কার্যকরী ওষুধপত্রেরও অবদান রয়েছে এর পিছনে। রয়েছে পরিবারের যত্ন, নিখুঁত ও নিরলস পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার।
এই দু'টি অস্ত্রোপচারের নেপথ্য ছিলেন হাসপাতালের রেনাল সায়েন্সের এইচওডি ডাঃ প্রদীপ চক্রবর্তী (ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন), ডাঃ রাজীব সিনহা (পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজিস্ট) ডাঃ অম্লান চক্রবর্তী (ইউরোলজিস্ট এবং ডোনার সার্জন), ডাঃ শতরূপা মুখার্জী (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভিস্ট), সুবীর বসুঠাকুর (এইচওডি- অ্যানেস্থেশিয়া) এবং ডাঃ শুভ্র শীল (ট্রান্সপ্ল্যান্ট অ্যাসোসিয়েট)।
প্রথম ট্রান্সপ্লান্টের রোগী, ছোট্ট আদিদেবের বাবা একজন ব্যাঙ্কার এবং মা আইটি-র কর্মী। তার বয়স যখন মাত্র ৬ মাস ছিল, তখনই তাকে প্রস্রাবের সমস্যা নিয়ে পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজিস্ট ডাঃ রাজীব সিনহার কাছে আনা হয়েছিল। পরীক্ষানিরীক্ষা করে তার একটি জেনেটিক ডিসঅর্ডার ধরা পড়েছিল, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলা হয় এইচএলএ ১। সেই সঙ্গে বিটা ১ মিউটেশনও ধরা পড়েছিল। যার ফলে বিরল কিডনির অসুখ বাসা বাঁধে তার শরীরে। চিকিৎসা বলতে কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনও পথ নেই। কিন্তু ৬ মাস বয়সে তা সম্ভব ছিল না কোনওভাবেই। তাই দু'বছর ধরে, নানা চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে রেনাল ট্রান্সপ্লান্টের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন চিকিৎসকরা। ইতিমধ্যে আদিদেবের অটিজমও ধরা পড়ে।
দু'বছর বয়স হওয়ার পরে আদিদেবের সবরকম ক্লিনিক্যাল পরীক্ষানিরীক্ষা করে, তার কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। তার আগে আদিদেবের বাবা-মাকে বোঝানো হয়েছিল ট্রান্সপ্ল্যান্টের সম্ভাব্য ঝুঁকি, জটিলতা, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ-- সবটুকুই। করা হয়েছিল কাউন্সেলিংও। আদিদেবের মা নিজেই এগিয়ে এসেছিলেন ডোনার হিসেবে। শেষমেশ, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, মায়ের কিডনি বসেছিল আদিদেবের শরীরে। অপারেশনের পরে, অপারেশন পরবর্তী জটিলতা পার করার পরে, একে সফল রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট হিসেবে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
সিএমআরআই-এর রেনাল সায়েন্সের এইচওডি এবং সিনিয়র ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডাঃ প্রদীপ চক্রবর্তী জানান, পেডিয়াট্রিক কিডনি প্রতিস্থাপনের চ্যালেঞ্জগুলি বড়দের থেকে অনেক বেশি জটিল। তিনি বলেন, 'পেটের ভিতরে জায়গাই পাওয়া যায় না, একটা সংকীর্ণ জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে হয় কিডনি। অস্ত্রোপচারের প্রচুর প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের কিডনির তুলনায় শিশুর কিডনির আকারও অন্য হয়। এছাড়াও অপারেশনের আগে এবং পরে দীর্ঘ সময়ের জন্য অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে রাখাও শিশুর ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয়। এই কারণে আমাদের টিমের দক্ষ অ্যানাস্থেসিস্ট খুবই সাবধানতার সঙ্গে সিডেশনের মাত্রা কমাতে-বাড়াতে থেকেছিলেন। অপারেশনের একটা পর্যায়ে রোগীর সামান্য জ্ঞানও ছিল।'
পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজিস্ট ডাঃ রাজীব সিনহার কথায়, 'শিশুটি দু'বছরেরও বেশি সময় ধরে আমার কেয়ারে ছিল। এই লম্বা সময় ধরে তার সমস্ত ওষুধপত্র পরিচালনা করা, তার সমস্ত শারীরিক অসুবিধার দিকগুলি খেয়াল রাখা ও প্যারামিটারগুলি স্থিতিশীল রাখা, এমনকি তার শিশুমনের অবসাদ দূর করা-- সবটাই খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই পর্বে একাধিক বার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে, এমনকি ভেন্টিলেশনেও রাখতে হয়েছে। সর্বোপরি, সে একটি স্পেশ্যাল চাইল্ড, তার অটিজম আছে। এবং প্রতিস্থাপনের সময়ে তার মা-ও অসুস্থ ছিল, যেহেতু তিনি নিজে ডোনেট করেছিলেন কিডনি। শেষ পর্যন্ত সমস্ত উদ্বেগের পর্ব পার করে আমরা আলোর মুখ দেখি। অপারেশনের ১২তম দিনে আদিদেব নিজে হাঁটতে শুরু করে এবং ২০ দিনের মাথায় তাকে ছুটি দেওয়া হয়।'
আদিদেবের মতোই, আরও একটি শিশু, ৭ বছরের পবিত্রা করকে ডাঃ রাজীব সিনহার কাছে নিয়ে আসা হয়েছিল প্রস্রাবের পরিমাণ আচমকা অনেকটা বেড়ে যাওয়া এবং খিদে কমে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে। পরীক্ষানিরীক্ষায় ধরা পড়ে, কিডনির জটিল সমস্যা রয়েছে তার। প্রয়োজন বুঝে বায়পসি করেন চিকিৎসকরা, যাতে জানা যায়, 'ফোকাল সেগমেন্টাল গ্লোমেরুলো-নেফ্রাইটিস'-এ আকান্ত সে। এক্ষেত্রেও কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া অন্য কোনও চিকিৎসার পথ খোলা ছিল না।
ডাঃ প্রদীপ চক্রবর্তী জানান, ২০২৩ সালে পবিত্রা আমাদের কাছে এসেছিল ট্রান্সপ্লান্টের জন্য। সে অত্যন্ত রুগ্ন একটি বাচ্চা ছিল। শরীরে চর্বি প্রায় ছিলই না। এই পরিস্থিতিতে তার ট্রান্সপ্লান্টের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু তার দিদিমা কিডনি ডোনার হিসেবে এগিয়ে এসে আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। তার পরিবারের সহযোগিতায় শেষমেশ আমাদের মেডিক্যাল টিম এগিয়ে যায়।
এর পরে চলে প্রস্তুতি পর্ব। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে, রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট করা হয় পবিত্রার। চ্যালেঞ্জিং অস্ত্রোপচারের পরে ধীরে ধীরে ভাল সাড়া দেয় পবিত্রা। তার প্রস্রাবের পরিমাণ ঠিকঠাক হয় এবং তার রেনাল প্যারামিটারও উন্নত হতে থাকে। ডাঃ চক্রবর্তীর কথায়, 'এই কেসটা আমাদের কাছে মিরাকেল ছিল। অপারেশনের সাত দিন পরে সে হাসতে হাসতে বাবার সঙ্গে বাড়ি চলে যায়।'
সিএমআরআই-এর ইউনিট হেড, মিস্টার সোমব্রত রায় উল্লেখ করেছেন, 'চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। ট্রান্সপ্লান্ট টিমের এই সাফল্য পেডিয়াট্রিক রেনাল কেয়ারের একটি নতুন বেঞ্চমার্ক তৈরি করল। আর আমরাও শিশুদের সেরা স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যাপারে আরও বেশি দায়বদ্ধ হলাম।'