হঠাৎ হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ও জীবন বাঁচাতে ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিয়াক ডিভাইস (Implantable Cardiac Device) কীভাবে কাজ করে— জানুন বিস্তারিত।

ডক্টর দিলীপ কুমার।
শেষ আপডেট: 15 August 2025 16:09
রাতে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, আর আর জেগে উঠলেন না। মর্নিং ওয়াক সেরে বাড়ি ফিরছিলেন, হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন—আর ফেরা হল না। কিংবা পার্টির মাঝখানে হঠাৎ পড়ে গেলেন, সবাই ভাবলেন হয়তো ক্লান্তি… কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
এমন হঠাৎ মৃত্যুর খবর এখন প্রায়ই আমাদের কানে আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর নেপথ্যে থাকে হৃদযন্ত্রের সমস্যা, হঠাৎ থেমে যাওয়া হৃদস্পন্দন, মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক বা অ্যারিদমিয়া। এই ঘটনাগুলির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সেই নিঃশব্দ মৃত্যু। প্রশ্ন ওঠে—“হার্ট কবে থেমে যাবে, তা কি আগে থেকে জানা সম্ভব?” চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে— হ্যাঁ, সম্ভব। আর এ যুগে সেই আশ্বাসের নাম ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিয়াক ডিভাইস।
এই জীবনদায়ী প্রযুক্তি, এর কার্যপ্রণালি এবং সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় পূর্ব ভারতের অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট ও ডিভাইস বিশেষজ্ঞ ডাঃ দিলীপ কুমার।
‘সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ’—যার মৃত্যু আসে হঠাৎ, কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই। সাধারণত এর কারণ অ্যারিদমিয়া, হার্ট অ্যাটাক বা বহুদিন ধরে চলা অজানা হৃদরোগ। এই পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে আসে ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিয়াক ডিভাইস।
শরীর কিছু বলার আগেই যদি হৃদযন্ত্র বিপদের মুখে পড়ে, এই ডিভাইস তা সনাক্ত করে। যেমন— অতিরিক্ত ভেন্ট্রিকুলার বিট বা অ্যারিদমিয়ার আভাস মিললে ডিভাইস সতর্ক সংকেত পাঠায়। চিকিৎসক সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সময়ের আগে বিপদ থামিয়ে দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
এই ডিভাইসের আধুনিকতম বৈশিষ্ট্য হল রিমোট মনিটরিং সিস্টেম। ডিভাইসটি সারাক্ষণ হৃদয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করে। হার্টবিটের গতি, অতিরিক্ত স্পন্দন, হার্ট ফেইলিওরের সম্ভাবনা ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে।
তথ্য সেকেন্ডের মধ্যে চলে যায় নির্মাতা সংস্থার সার্ভারে, যেখানে বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করেন। কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় চিকিৎসকের কাছে। রোগীর মোবাইল অ্যাপে প্রাথমিক তথ্যও পৌঁছে যায়, যতটা জানা জরুরি, ততটাই।
ফলে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তাঁর হৃদয় থাকে প্রযুক্তি, চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানদের নীরব পাহারায়।
এমন উদাহরণ বহু রয়েছে। হয়তো অ্যারিদমিক হার্ট ডিজিজের কারণে রোগীর শরীরে এই ডিভাইস ইমপ্ল্যান্ট করা হয়েছিল। শুরুতে সব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কিছুদিন পরে ডিভাইসটি অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে একাধিকবার শক দেয়। চিকিৎসকরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে তোলেন। আজ তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। ডিভাইস না থাকলে হয়তো সেই দিনেই তাঁর জীবন শেষ হয়ে যেত।
অনেকে মনে করেন—ডিভাইস বসালে হয়তো জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। বিমান ভ্রমণ, সাঁতার, দৌড়ঝাঁপ— সব বন্ধ। ডাঃ কুমার বলছেন, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ডিভাইস বসানোর পর কয়েকদিন শরীর মানিয়ে নিতে সময় লাগে, কিন্তু পরে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে পারেন। এখানে মূল কথা হল, সঠিক গাইডলাইন মেনে চলা ও মানসিক শক্তি বজায় রাখা।
ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিয়াক ডিভাইস সব রোগীর জন্য নয়। যাঁদের সাডেন কার্ডিয়াক ডেথের ঝুঁকি বেশি, অ্যারিদমিয়া বা হার্ট ফেলিওরের উপসর্গ আছে— তাঁদের জন্যই এটি জীবনদায়ী হতে পারে।
এমনিতে ৩৫ বছরের পর নিয়মিত ইসিজি ও হার্ট স্ক্রিনিং করানো জরুরি। কারণ অনেক সময় শরীর সঙ্কেত না দিলেও ভিতরে ভিতরে সমস্যা তৈরি হতে থাকে। সেখানে প্রযুক্তি আগেভাগে জানিয়ে দেয়—যেখানে শরীর বোঝে না, সেখানে প্রযুক্তি বোঝে।
সব মিলিয়ে, ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিয়াক ডিভাইস শুধুই একটি চিকিৎসা নয়, এটি যেন হৃদয়ের নীরব প্রহরী। প্রতিটি অতিরিক্ত স্পন্দনে, প্রতিটি শ্বাসে সে নজর রাখে। রোগীর অজান্তে, প্রতিদিন সুরক্ষা দেয়। তাই সচেতন হোন, নিয়মিত পরীক্ষা করান। প্রযুক্তি আছে পাশে, কিন্তু প্রথম পদক্ষেপ আপনারই।