ডুবতে শুরু করলে শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাসের বদলে সমুদ্রের জল শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে পড়ে। সেই জলের সঙ্গে থাকা কাদা, বালি ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কণাও ধীরে ধীরে ফুসফুসে জমতে থাকে। এতে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা কমে যায়।

শেষ আপডেট: 31 March 2026 16:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সমুদ্রে নেমে দুর্ঘটনা যে কারও হতে পারে। সাঁতার জানেন কি জানেন না— দু’ক্ষেত্রেই ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। বরং অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা সাঁতার জানেন তাঁদেরই আত্মবিশ্বাস বেশি থাকায় গভীর জলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, আর সেখানেই ঘটে বিপদ।
কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে?
সমুদ্রে বা জলে অনেকেই নামেন, কিন্তু সবাই ডুবে যান না। ঝুঁকি বেশি থাকে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ বা শারীরিকভাবে দুর্বলদের। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে জলে নামলেও বিপদ বাড়ে। এ অবস্থায় শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও উপস্থিত বুদ্ধি— দুটোই কমে যায়।
ডুবে যাওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে ঘটে?
সমুদ্রে এমন জায়গায় পৌঁছে গেলে যেখানে জলের স্রোত বা গভীরতা বেশি, তখন অনেকেই আর ফিরতে পারেন না। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়া, প্যানিক, এমনকি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকও হতে পারে।
প্রথমে মানুষ ভেসে থাকার চেষ্টা করে, চিৎকার করে— সঙ্গে দ্রুত নিশ্বাস বের হতে থাকে । তারপর জলের মধ্যেই শ্বাস নিতে গেলে বাতাসের বদলে জল ঢুকে পড়ে শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে। তখন শুরু হয় হাবুডুবু খাওয়া, এবং ধীরে ধীরে তলিয়ে যাওয়া।
শ্বাসনালীতে কী হয়?
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলেন, "ডুবতে শুরু করলে শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাসের বদলে সমুদ্রের জল শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে পড়ে। সেই জলের সঙ্গে থাকা কাদা, বালি ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কণাও ধীরে ধীরে ফুসফুসে জমতে থাকে। এতে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা কমে যায়। ফুসফুসে তৈরি হয় এক ধরনের ফেনা, যাকে বলা হয় ফ্রথ ইন ড্রাউনিং। শ্বাসনালীর মিউকাস ও স্বাভাবিক রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে মিশে এই ফেনা আরও ঘন ও আঠালো হয়ে ওঠে এবং একসময় ‘ম্যাসিভ কলাম অব ফ্রথ’ তৈরি করে শ্বাসনালীতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ফুসফুসে আর স্বাভাবিকভাবে বাতাস ঢুকতে পারে না, শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু ঘটে।"
কত দ্রুত ঘটে সবকিছু?
ডা. বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, পুরো প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত— সাধারণত ৩ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যেই। অনেক ক্ষেত্রে ৩ মিনিটের মধ্যেই ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যান এবং ধীরে ধীরে ব্যথাহীন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। এই সময়টুকুই ‘গোল্ডেন টাইম’। দ্রুত জল থেকে তুলে শ্বাসনালী পরিষ্কার করা, প্রাথমিক লাইফ সাপোর্ট দেওয়া এবং তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সাকশন ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। তবে ৮ মিনিটের বেশি সময় পেরিয়ে গেলে বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না।
তবে এটাও দেখা গেছে, এই পরিস্থিতি থেকে গোল্ডেন টাইমের মধ্যে উদ্বার করা রোগী বেঁচে ফিরে এলেও হাইপোক্সিক এনসেফালোপ্যাথি (HIE) নিয়ে বেঁচে আছেন। অর্থাৎ তাঁর স্মৃতিশক্তি চলে যায়, জড়বুদ্ধি নিয়ে বেঁচে থাকে ব্যক্তি। কোনও অঙ্গ প্যারালিসিসও হয়ে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনা
গত ২৯ মার্চ ওড়িশার তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (৪৩) মৃত্যু হয়। জানা গেছে, শুটিং শেষে সমুদ্রে নামার পর চোরাবালিতে তলিয়ে যান তিনি। উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তে তাঁর শ্বাসনালী থেকেও নোনাজল, বালি ও কাদা মিলেছে— যা জলে ডুবে মৃত্যুর দিকেই ইঙ্গিত করছে।
জলে নামার সময় আত্মবিশ্বাস নয়, সচেতনতা সবচেয়ে বড় ভরসা। সমুদ্রের স্রোত, গভীরতা ও নিজের শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় রাখাই দুর্ঘটনা এড়ানোর একমাত্র উপায়।