আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা, তার সঙ্গে ক্রমাগত মানসিক চাপ - সব মিলিয়ে প্রশ্নটা আর ‘কোনটা ভাল’ নয়। বরং এটা বোঝা বেশি জরুরি যে, কীভাবে শরীরের সচলতা ও মানসিক শান্তি একসঙ্গে কাজ করে দীর্ঘমেয়াদে হার্টের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে পারবে।

শেষ আপডেট: 21 February 2026 18:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আধুনিক 'ওয়েলনেস' দুনিয়া (healthy lifestyle and wellness) কিছু বিশেষ সংখ্যার প্রতি যেন অদ্ভুতভাবে আসক্ত - ১০ হাজার স্টেপ হাঁটা (10,000 steps daily), ১০ মিনিট ধ্যান (10 minutes meditation), ফিটনেস ট্র্যাকার (fitness tracker) মেনে চলা করা, মন শান্ত রাখা - প্রতিদিন একই লক্ষ্য (Heart health walking vs meditation)। কিন্তু হৃদ্স্বাস্থ্য (heart health) কোনও সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। এর মূল কথাই হল ভারসাম্য যা হার্টের খেয়াল রাখে করে, আর এমন কিছু অভ্যাস যা তাকে সুরক্ষা দেয় (heart healthy habits)।
আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা (sedentary lifestyle), তার সঙ্গে ক্রমাগত মানসিক চাপ (mental pressure)- সব মিলিয়ে প্রশ্নটা আর ‘কোনটা ভাল’ নয়। বরং এটা বোঝা বেশি জরুরি যে, কীভাবে শরীরের সচলতা ও মানসিক শান্তি একসঙ্গে কাজ করে দীর্ঘমেয়াদে হার্টের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের একমত - দুটোই জরুরি
নভি মুম্বইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালের কার্ডিওলজি কনসালট্যান্ট চরণ রেড্ডি বলছেন, রোগীরা প্রায়ই জানতে চান, প্রতিদিন ১০ হাজার স্টেপ হাঁটবেন, না কি ১০ মিনিট মেডিটেশনে মন দেবেন? তাঁর স্পষ্ট উত্তর, যে কোনও একটাকে বেছে নেওয়ার প্রশ্নই নেই, হার্টের জন্য দুটোই সমান প্রয়োজন।
এর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালের কার্ডিওলজি কনসালট্যান্ট প্রশান্ত নায়ার জানান, হার্টের সুস্থতার জন্য রোজ মুভমেন্ট যেমন দরকার, তেমনই প্রয়োজন সঠিক রিকভারি বা বিশ্রাম।
একই সুরে কথা বলেছেন কানিংহাম রোড ফর্টিস হাসপাতালের সিনিয়র কার্ডিওলজি কনসালট্যান্ট বাসবরাজ উটাগি বলেন, শারীরিক ব্যায়াম ও মানসিক সুস্থতা - দুটোই সমান গুরুত্ব দিয়ে নজরে রাখতে হবে।
কেন হাঁটাহাঁটি এখনও এত গুরুত্বপূর্ণ?
হাঁটা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলির একটি। তার জন্য জিম, বিশেষ যন্ত্রপাতি বা নির্দিষ্ট সময় - কিছুই দরকার নেই, শুধু নিয়মিত মেনে চলার মতো অভ্যাসটুকুই যা দরকারি।
ডা. রেড্ডির মতে, দ্রুত হাঁটা হৃদ্পেশি শক্তিশালী করে, রক্তসঞ্চালন উন্নত করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ডা. নায়ার জানান, নিয়মিত হাঁটলে মেটাবলিক স্বাস্থ্য ভাল থাকে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে - এমনকি প্রতিদিন ১০ হাজার স্টেপের কম হলেও উপকার পাওয়া যায়। প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ হাজার স্টেপ নিয়মিত হাঁটলেও চোখে পড়ার মতো উন্নতি দেখা যায়।
ডা. উটাগি আরও যোগ করেন এই অভ্যাস -
ছোট ছোট দৈনিক অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের মজবুত ভিত্তি তৈরি করে। হাঁটাকে শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশির জন্য শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন ভাবা যেতে পারে।
লুকিয়ে থাকা বড় বিপদ - দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
শুধু হাঁটাচলা করলেই সব সমস্যা মিটে যায় না। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরকে সবসময় ‘ফাইট বা ফ্লাইট’ অবস্থায় রেখে দেয়। এতে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ে এবং রক্তনালীর উপর চাপ পড়ে।
ডা. রেড্ডি সতর্ক করছেন, নিয়ন্ত্রণহীন মানসিক চাপ নীরবে শরীরে ইনফ্ল্যামেশন বাড়ায় এবং হার্টের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ডা. নায়ার জানান, অতিরিক্ত কর্টিসল উচ্চ রক্তচাপ ও অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দনের কারণ হতে পারে। ডা. উটাগির মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক টানাপড়েন সময়ের সঙ্গে হাইপারটেনশন ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থাৎ, নিয়মিত ব্যায়াম করলেও যদি মন কখনও বিশ্রাম না পায়, তাহলে হৃদ্যন্ত্র পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে না।
মাত্র ১০ মিনিট শান্ত থাকাও হার্টের জন্য শক্তিশালী ওষুধ
ভাল খবর এটাই যে, দীর্ঘ সময় নয়, প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সচেতনভাবে শান্ত থাকার অভ্যাসই যথেষ্ট। ডিপ ব্রিদিং হোক বা ধ্যান - যেকোনও উপায়েই শরীরের ‘রিল্যাক্সেশন রেসপন্স’ সক্রিয় হয়।
ডা. নায়ারের মতে, এতে হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি উন্নত হয় -যা হার্ট ভাল থাকার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, এবং কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের উপরও চাপ কমে। ডা. উটাগি এই সময়কে ‘রিকভারি উইন্ডো’ বলে উল্লেখ করেন, যখন হার্ট ও রক্তনালী নতুন করে ভারসাম্যে ফিরে আসে। ডা. রেড্ডিও প্রতিদিন কিছু সময় আলাদা করে বার করে শ্বাসপ্রশ্বাসে মন নেওয়া ও নিজেকে শান্ত রাখার অভ্যাসের পরামর্শ দেন। শান্ত ওই সময়টুকুকে ভাবতে পারেন হার্টের ‘রিপেয়ার মোড’।
আদর্শ সমাধান - ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটাকে বেছে নেওয়া নয়, দুটোকে একসঙ্গে মেলানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। হৃদ্স্বাস্থ্য ভাল রাখতে দরকার -
নিয়মিত মুভমেন্ট শরীরের সক্ষমতা বাড়ায়, আর মানসিক শান্তির ক্ষয় কমায়। একসঙ্গে কাজ করলে এর প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
হার্ট কোনও বিশেষ সংখ্যা নয়, ছন্দ বোঝে
আপনার হার্ট কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যার পিছনে ছুটতে বলে না। সে চায় ছন্দ, কাজের পর বিশ্রাম, মুভমেন্টের পর শান্তি। নিয়মিত হাঁটুন। প্রতিদিন কিছু সময় ধীরে চলুন। শক্তি ও শান্তি - দুটোই সমানভাবে গুরুত্ব দিন। দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্স্বাস্থ্যের আসল রহস্য হয়তো এই ভারসাম্যেই।