এই প্রবণতা ভয়াবহ, শুধু আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাবের জন্যও।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 20 January 2026 13:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একসময় মনে করা হত ফ্যাটি লিভার রোগ মূলত মধ্যবয়সী অলস জীবনযাপন এবং শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদেরই সমস্যা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এই রোগ নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে শিশু ও কিশোরদের মধ্যেও। একসময় বিরল বলে যা মনে করা হত, এই পেডিয়াট্রিক সমস্যা এখন পরিণত হয়েছে এক বড় জনস্বাস্থ্য–সঙ্কটে। তার মূলে রয়েছে শিশুদের দ্রুত বেড়ে চলা ওবেসিটি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং কমতে থাকা শারীরিক কসরত।
এই প্রবণতা ভয়াবহ, শুধু আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাবের জন্যও।
এসপিএআরএস হাসপাতালের ইয়েলাহাঙ্কা শাখার গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারির সিনিয়র কনসালট্যান্ট রাঘবেন্দ্র বাবু এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
শিশুদের মধ্যে ফ্যাটি লিভার কীভাবে তৈরি হয়?
ফ্যাটি লিভার রোগ বা নন–অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) হয় যখন লিভার কোষে অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে অতিরিক্ত চর্বি জমে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর মূল কারণ জীবনযাত্রা - অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, মিষ্টি পানীয় এবং ব্যায়ামের অভাব।
এই রোগের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল এর নিঃশব্দ প্রকৃতি। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে কোনও উপসর্গই দেখা যায় না, যতক্ষণ না রোগটি আরও মারাত্মক রূপ নেয়— যেমন লিভারে প্রদাহ, যাকে বলে নন–অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো–হেপাটাইটিস (NASH)।
সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গিয়েছে, শহরাঞ্চলের প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে প্রায় একজনের ফ্যাটি লিভার রয়েছে। যাদের ওজন বেশি বা ওবেসিটি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে হার আরও বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন শিশুদের মধ্যেও NAFLD এক অন্যতম সাধারণ ক্রনিক লিভার সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে শনাক্ত হয়।
আধুনিক জীবনযাত্রা এবং রোগের যোগসূত্র
আজকের ডিজিটাল জীবনযাপন শিশুদের স্বাস্থ্যের চেহারা আমূল বদলে দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার সামনে বসে থাকা, খেলাধুলা বা আউটডোর অ্যাক্টিভিটির অভাব, আর সহজলভ্য বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার— এই সবই মিলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অতিরিক্ত চিনি, ভাজাভুজি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে এবং লিভারে ফ্যাট জমাতে সাহায্য করে। শুধু স্থূল শিশু নয়, চেহারায় রোগা হলেও যদি খাবারে ভারসাম্য না থাকে এবং চলাফেরা কম হয়, তারাও ঝুঁকিতে।
দীর্ঘমেয়াদে কী ক্ষতি হতে পারে?
চিকিৎসা ঠিক সময়ে শুরু না হলে ফ্যাটি লিভার ভবিষ্যতে ভয়াবহ জটিলতায় পরিণত হতে পারে - লিভার ফাইব্রোসিস, সিরোসিস, এমনকী লিভার ক্যানসার পর্যন্ত। তাছাড়া, শিশুদের মধ্যে NAFLD সাধারণত টাইপ–২ ডায়াবিটিস, হাই কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের মতো বিপজ্জনক মেটাবলিক সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
অতএব, প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ জরুরি - শুধু লিভারের চিকিৎসার জন্যই নয়, বরং পুরো মেটাবলিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও।
প্রতিরোধ শুরু হোক ঘর থেকে এবং স্কুলে
ভাল খবর হল, শিশুদের ফ্যাটি লিভার রোগ সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তন করলে তা অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য ও সারিয়ে তোলা সম্ভব। এর মূল চাবিকাঠি সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত শরীরচর্চা।
অভিভাবকদের উচিত শিশুদের বেশি করে ফল, শাকসবজি, সম্পূর্ণ শস্য এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেতে উৎসাহিত করা— পাশাপাশি জাঙ্ক ফুড, সফট ড্রিঙ্ক ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দেওয়া।
স্কুলগুলোকেও পুষ্টি শিক্ষা ও ফিটনেস প্রোগ্রামকে পাঠ্যসূচির অংশ করতে হবে। যেসব শিশুর ঝুঁকি বেশি, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও লিভার ফাংশন টেস্ট বা আলট্রাসাউন্ড করা জরুরি।
সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই এখন মূল অস্ত্র
শিশুদের মধ্যে ফ্যাটি লিভার কেবল একটি রোগ নয়, বরং জীবনযাত্রার বিপজ্জনক সংকেত। এর ক্রমবর্ধমান হার আমাদের সমাজের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁককেই প্রতিফলিত করে। তাই সচেতনতা তৈরিই প্রথম পদক্ষেপ।
শিশু–চিকিৎসক, স্কুল এবং অভিভাবক - সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এমন এক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য, যেখানে স্বাস্থ্যকর খাবার ও সক্রিয় জীবনযাপন অগ্রাধিকার পায়। শহুরে জীবনযাত্রা যত বাড়ছে, ততই আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে উঠছে।
ফ্যাটি লিভার আর শুধু বড়দের রোগ নয়, এটি আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য সতর্কবার্তা। সচেতনতা, শিক্ষা এবং টেকসই জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা শিশুদের এই প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে বাঁচাতে পারি, নিশ্চিত করতে পারি এক সুস্থ, নিরাপদ ভবিষ্যৎ।