নিয়মিত ব্যায়াম কীভাবে স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, মনোযোগ উন্নত করে ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমায়—সহজ ভাষায় জানুন বিস্তারিত।

মস্তিষ্ক চনমনে রাখতে কার্যকরী ব্যায়াম।
শেষ আপডেট: 27 December 2025 13:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স বাড়ার (Aging) সঙ্গে সঙ্গে শুধু শরীর নয়, ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাও (Brain Capacity)। অনেকেই ভাবেন, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া (Memory Loss), মনোযোগে ঘাটতি (Lack of Concentration) বা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়াটা (Indecisive) বুঝি বয়সের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টা পুরোপুরি তা নয়। নিয়মিত শরীরচর্চা (Regular Exercise) করলে বয়স যতই বাড়ুক, মস্তিষ্ককে রাখা যায় অনেকটাই চনমনে ও সক্রিয় (Active Brain)।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শুধু শরীর ভাল রাখার জন্যই নয়— ব্যায়াম মস্তিষ্কের জন্যও ভীষণ উপকারী। স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, মনোযোগ ধরে রাখা, এমনকি ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতেও ব্যায়ামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স যাই হোক না কেন, একটু বেশি নড়াচড়া করলেই তার সুফল পায় মস্তিষ্ক।
ব্যায়াম করলে উপকার পায় শুধু পেশি বা হাড়— এমনটা ভাবলে ভুল হবে। শরীরচর্চার সরাসরি প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কেও। ব্যায়ামের সময় মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বেড়ে যায়, ফলে সেখানে বেশি অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছয়। এতে মস্তিষ্ক আরও ভালভাবে কাজ করতে পারে।
এছাড়াও ব্যায়ামের ফলে শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্কের কোষগুলিকে সুরক্ষা দেয় এবং নতুন কোষ তৈরিতেও সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা মনখারাপ কমাতেও কার্যকর। ফলে মন ও মেজাজ—দুটোই থাকে সুস্থ।

স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়: নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্কের সেই অংশগুলিকে শক্তিশালী করে, যেগুলি তথ্য ধরে রাখা ও মনে করার সঙ্গে যুক্ত।
মনোযোগ বাড়ে: শরীরচর্চা করলে একাগ্রতা বাড়ে, দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলানো সহজ হয়।
বয়সজনিত স্মৃতিক্ষয়ের ঝুঁকি কমে: গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিয়মিত ব্যায়াম করলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশের আশঙ্কা অনেকটাই কমে।
মানসিক চাপ কমায়: শরীরচর্চা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, ফলে পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা সহজ হয়।
ব্যায়ামের ক্ষেত্রে কোনও একটাই আদর্শ পদ্ধতি নেই। যেটা আপনার ভাল লাগে এবং নিয়মিত করা , সেটাই সবচেয়ে কার্যকর। তবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী কয়েকটি ব্যায়ামের কথা বলা যায়।
১. হাঁটা
সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর ব্যায়াম। হাঁটলে রক্ত চলাচল বাড়ে, মস্তিষ্ক পায় হালকা কিন্তু ধারাবাহিক উদ্দীপনা। প্রায় সকলের পক্ষেই এটি করা সম্ভব। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন, প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করুন।
২. নাচ
নাচ শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্ককেও চ্যালেঞ্জ করে। নতুন স্টেপ শেখা, তাল মিলিয়ে চলা— সব মিলিয়ে মস্তিষ্কের ভাল অনুশীলন হয়। দলবদ্ধভাবে নাচলে সামাজিক যোগাযোগও বাড়ে। সপ্তাহে ১–২ দিন ঘণ্টাখানেক নাচলেই উপকার মিলবে।
৩. যোগাসন
যোগব্যায়ামে শরীরের নড়াচড়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ—তিনটিই একসঙ্গে কাজ করে। এতে একাগ্রতা, ভারসাম্য ও মানসিক শান্তি বাড়ে। সপ্তাহে ৩ দিন আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা করে যোগাসন করা যেতে পারে।
৪. অ্যারোবিক ব্যায়াম
সাঁতার, সাইকেল চালানো বা জগিংয়ের মতো ব্যায়াম হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্ক—দু’টিরই জন্য উপকারী। হার্টবিট বাড়ার ফলে মস্তিষ্কে বেশি অক্সিজেন পৌঁছয়। সপ্তাহে মোট ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
৫. ওয়েট ট্রেনিং
ওজন তোলা বা স্কোয়াট, পুশ-আপের মতো ব্যায়াম পেশি শক্ত করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। শারীরিক শক্তির সঙ্গে মানসিক তীক্ষ্ণতাও বাড়ে। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন এই ধরনের ব্যায়াম করা ভাল।
৬. মন-শরীর মিলিয়ে ব্যায়াম
তাই চি-র মতো অভ্যাসে ধীর গতির নড়াচড়া, ভারসাম্য ও মনোযোগ একসঙ্গে কাজ করে। এতে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। সপ্তাহে ২–৩ দিন যথেষ্ট।

ব্যায়াম শুরু করতে গিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অল্প অল্প করেই শুরু করা যায়।
ছোট করে শুরু করুন: প্রথমে অল্প হাঁটা বা সহজ ব্যায়াম দিয়ে শুরু করুন।
যেটা ভাল লাগে সেটাই বেছে নিন: নাচ, বাগান করা—যেটা আনন্দ দেয়, সেটাই করুন।
নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করুন: প্রতিদিনের রুটিনে ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় রাখুন।
সঙ্গী জুটিয়ে নিন: বন্ধুর সঙ্গে ব্যায়াম করলে উৎসাহ বাড়ে।
শরীরের কথা শুনুন: নতুন কিছু শুরু করলে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হন।
ব্যায়াম শুধু স্মৃতিশক্তি বাড়ায় না, সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটায়। নিয়মিত শরীরচর্চা উদ্বেগ ও অবসাদ কমাতে সাহায্য করে, মন ভাল রাখে, শক্তি বাড়ায়। শরীরকে সুস্থ রাখার মধ্য দিয়েই আসলে মস্তিষ্ককেও দীর্ঘদিন সতেজ রাখা সম্ভব।

বয়স যতই হোক, মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ রাখার সবচেয়ে সহজ ও শক্তিশালী উপায় হল ব্যায়াম। হাঁটা, যোগাসন বা নাচ—যে কোনও নড়াচড়াই মস্তিষ্কের জন্য আশীর্বাদ। ধীরে শুরু করুন, আনন্দ নিয়ে চালিয়ে যান। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে ধন্যবাদ দেবে।
(এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য। কোনও শারীরিক সমস্যা বা বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।)