হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট কোনও সাধারণ অস্ত্রোপচার নয়। এটি শেষ পর্যায়ের হার্ট ফেইলিওর বা গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য একপ্রকার ‘লাইফলাইন’। কিন্তু প্রতিস্থাপনের পরও ঝুঁকি থেকেই যায়—অঙ্গ প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে রোগীকে দীর্ঘদিন কঠোর নজরদারিতে থাকতে হয়।

একাধিকবার হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট কতটা ঝুঁকির?
শেষ আপডেট: 3 April 2026 19:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে / বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে—রীনা রাজু। দেশের প্রথম ও একমাত্র অ্যাথলিট, যাঁর দু’বার সফল হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে। এমনই এক লড়াইয়ের দিনগুলোতে পাশে পেয়েছিলেন বলিউড অভিনেতা সলমন খান-কে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন রীনা।
এটা গল্প নয়, সত্যি! দু’দু’বার হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট—এ যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিরল অধ্যায়। রীনা রাজুর লড়াই সেই কারণেই শুধু অনুপ্রেরণার নয়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে।
হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট কোনও সাধারণ অস্ত্রোপচার নয়। এটি শেষ পর্যায়ের হার্ট ফেইলিওর বা গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য একপ্রকার ‘লাইফলাইন’। কিন্তু প্রতিস্থাপনের পরও ঝুঁকি থেকেই যায়—অঙ্গ প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে রোগীকে দীর্ঘদিন কঠোর নজরদারিতে থাকতে হয়।
একাধিকবার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কতটা নিরাপদ?
এই প্রেক্ষিতেই উঠে আসছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
একাধিকবার হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট কি চিকিৎসাগতভাবে নিরাপদ ও কার্যকর? নাকি এটি অত্যন্ত সীমিত ও ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই করা সম্ভব?
রীনা রাজুর অভিজ্ঞতা সেই বিতর্ককেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। তাঁর হার্টে জন্মগত ত্রুটি ছিল। ২০০৯ সালে, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিজের অসুস্থ হৃদযন্ত্র বদলে নতুন জীবন পান তিনি। এরপর ২০১৭ সালে ফের আরও একবার হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হয় তাঁর।
এরাজ্যের চিকিৎসক কী বলছেন?
কলকাতার অন্যতম কার্ডিওলজিস্ট ডা. দেবদত্ত ভট্টাচার্য জানান, এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। একাধিকবার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সাধারণত প্রথমবার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে রোগীর হার্ট খুব বেশি হলে ১০ বছর ভালো থাকে। এই সময়ের মধ্যে প্রতিস্থাপিত হৃদযন্ত্রে নানা পরিবর্তন আসে, বিশেষ করে করোনারি আর্টারিগুলিতে ব্লকেজ তৈরি হয়। ফলে ধীরে ধীরে হার্ট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় কার্ডিয়াক অ্যালোগ্রাফ্ট ভাস্কুলোপ্যাথি (Cardiac Allograft Vasculopathy)।
এই সমস্যা ট্রান্সপ্ল্যান্ট রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়। যেহেতু দাতার হৃদযন্ত্র তার স্নায়ুবিক সংযোগ হারায়, তাই সাধারণত বুকে ব্যথা হয় না। ফলে এই রোগটি অনেক সময় রুটিন পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে। ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট এর প্রধান লক্ষণ হতে পারে।
অন্যদিকে, অন্যের শরীরের হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করলে শরীরে নানা ধরনের ইমিউন রিঅ্যাকশন চলতেই থাকে। অর্থাৎ শরীর প্রথমেই প্রতিস্থাপিত হৃদযন্ত্রকে গ্রহণ করতে চায় না। এই প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে রোগীকে দীর্ঘদিন ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ খেতে হয়। ফলে পরবর্তীকালে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়াও, এত ওষুধ নেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে একটি সময় এসে ‘হার্ট রিজেকশন’ শুরু হয়। কারও ক্ষেত্রে ৫-৬ বছর পর, কারও ক্ষেত্রে ৮-১০ বছর পর এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপিত হৃদযন্ত্র আজীবন সুস্থ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ফলে, যদি কারও কম বয়সে—ধরা যাক ৩০ বছর বয়সে—হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়, তাহলে ৪০-এর কোঠায় গিয়ে নতুন করে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বাঁচিয়ে রাখতে দ্বিতীয়বার ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রয়োজন হতে পারে—যেমনটা হয়েছে রীনা রাজুর ক্ষেত্রে।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার ফলে একাধিকবার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এর জন্য অভিজ্ঞ ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান অত্যন্ত জরুরি। কারণ এক শরীরে বারবার অন্যের হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করতে গেলে প্রচুর সাপোর্টিভ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, যা শরীরকে অনেক সময় দুর্বল করে দেয়। তাই ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর সচেতনতা ও নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. ভট্টাচার্যের কথায়, ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর রোগী কতটা সুস্থ থাকবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করে বয়সের উপর। বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার প্রতিস্থাপন করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তুলনায় কম বয়সে যাঁদের ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বিশেষ করে ১৫–৩০ বছর বয়সিদের মধ্যে দ্বিতীয় প্রতিস্থাপন তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, যদি অন্য কোনও জটিলতা না থাকে।
কাদের হার্ট প্রতিস্থাপন দরকার?
চিকিৎসকের কথায়, জন্মগত ত্রুটি ছাড়াও ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি (DCM) এবং ইস্কেমিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি (Ischemic Cardiomyopathy)-র ক্ষেত্রে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রয়োজন হতে পারে।
ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথিতে হৃদপিণ্ডের প্রধান পাম্পিং চেম্বার (সাধারণত বাম ভেন্ট্রিকল) প্রসারিত, পাতলা এবং দুর্বল হয়ে যায়। ফলে হৃদপিণ্ড সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। এতে হার্ট ফেইলিওর, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (অ্যারিথমিয়া), ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
অন্যদিকে, ইস্কেমিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি হয় করোনারি ধমনিতে দীর্ঘদিন রক্তপ্রবাহ কম থাকার ফলে বা হার্ট অ্যাটাকের কারণে। এতে হৃদপেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাম ভেন্ট্রিকল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাম্পিং ক্ষমতা কমে যায়। ফলস্বরূপ হার্ট ফেইলিওর দেখা দেয়।
এই দুই ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের কথা ভাবা হয়। তবে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, বয়স, অন্যান্য জটিলতা—সবকিছু বিচার করেই চিকিৎসকেরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।