রাজধানী এক্সপ্রেসে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল আট মাসের এক শিশু। সেনা জওয়ানের তৎপরতায় সিপিআর দিয়েই বাঁচানো হয় শিশুটিকে। ঘটনাটি ফের প্রমাণ করল প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবাজারে।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি
শেষ আপডেট: 19 October 2025 11:10
শুক্রবার ডিব্রুগড়গামী চলন্ত রাজধানী এক্সপ্রেসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে এক আট মাসের শিশু। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, অজ্ঞান হয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে। বিপদ আগে থেকে টের পাননি বাবা-মা, কিছু বুঝতে পারছিলেন না তাই। ট্রেনে এমন হলে কী করতে হয়, তাও অজানা। এগিয়ে আসেন এক সেনা জওয়ান।
উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে সিপিআর দিয়ে শিশুটির প্রাণ বাঁচান তিনি। পরে জানা যায়, ছুটি সেরে বাড়ি ফিরছিলেন সেনার ৪৫৬ ফিল্ড হাসপাতালের সদস্য সিপাহী সুনীল। পেডিয়াট্রিক সিপিআর (Paediatric CPR) প্রয়োগ শুরু করেন প্রাণ বাঁচান একরত্তির। জানান, শিশুর নাড়ি পরীক্ষা করে তিনি বুঝতে পারেন, সময় নষ্ট করা যাবে না। চিকিৎসার প্রাথমিক ধাপ শুরু করার পাশাপাশি ট্রেনের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর পর রেল পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় রঙিয়া স্টেশনে নামিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশংসা জুটেছে সেনা কর্মীর। বহু লোক শেয়ার করেছেন। প্রতি ঘটনায় যেমন একাধিক প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। ট্রেনে বাচ্চাটির সহযাত্রীরা অনেকে বলছেন, বাবা- মা যেভাবে হাউহাউ করে কিছু না করতে পেরে কাঁদছিলেন, চিৎকার করছিলেন, সবাই বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন, তাতে বাচ্চাটিকে বাঁচানো যেত না ওই সেনাকর্মী না থাকলে। ট্রেনে এমন যেকারও হতে পারে, যেকোনও সময়, হতে পারে বাড়িতে বা যেকোনও জায়গায়। ঘুরতে গেলে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনেকের টেনশন থাকে। সেক্ষেত্রেও বহু মানুষ কিছুই করে উঠতে পারেন না।
ওয়াকিবহল মহলের দাবি, প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে জানতে হবে সকলকে। তবেই, এমন সময় বিপদের বন্ধু হয়ে কারও পাশে সত্যিকারের দাঁড়ানো যাবে। বাড়ির লোককে দেখে কেঁদে ভাসালে চলবে না। পাশের মানুষকে প্রাণ উপহার দেওয়াই তো কর্তব্য! সত্যিই কি ভ্রমণকালে, বাড়ি বা দুর্গম কোনও জায়গায় এমন পরিস্থিতিতে বেসিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোক দরকার? সেই লোক বা শেখার মানসিকতা কি আছে সাধারণ মানুষের? কোথায় শিখবেন এসব!
দ্য ওয়ালের তরফে খুঁটিনাটি জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিল শহরের এক ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার ও নন মেডিক্যাল হয়েও এই ধরনের বেসিক চিকিৎসা দেওয়ার কোর্স করা বিনায়ক চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি ভারতের অন্যতম বিখ্যাত হ্যানিফিল সেন্টার, উডস্টক স্কুল মুসৌরি ল্যান্ডরে এই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং গত এক বছরে প্রাণ বাঁচিয়েছেন বেশ কিছু মানুষের।
কেন দরকার এই বেসিক প্রশিক্ষণ?
বিনায়কের কথায়, '২০২৫-এ দাঁড়িয়ে আজ যেমন সিচুয়েশন, আমরা যে অবস্থায় আছি, সেখানে মেডিক্যাল সংক্রান্ত বিষয়গুলো বেশিই দেখা যাচ্ছে। মানে ধুপধাপ লোকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, বয়সেরও কোনও মাপকাঠি নেই। এছাড়াও কারও খাবার গলায় আটকে গেল বা অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন হচ্ছে, বিষাক্ত পোকার কামড় খেয়েছে, হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, লাইফ থ্রেট রয়েছে এমন কোনও সমস্যাই সাময়িকভাবে খুব ছোট বা তুচ্ছ মনে হলেও এটা আসলে প্রাণঘাতী হতে পারে। প্রথম ১০-১৫ মিনিটেই যা করার করতে হয়। তখন লোকে বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন। সেক্ষেত্রে কারও প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান থাকলে, অবশ্যই নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তিনি সাহায্য করতে পারেন।'
রাস্তায় কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন, বেশিরভাগ মানুষই পালস মাপতে জানেন না বা কী অবস্থা বোঝার উপায় থাকে না। তাঁর কথায়, এক্ষেত্রে বহু এমন দেখেছি, চোখের সামনে প্রিয়জন চলে গেল। বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ। খুব সাপোর্ট করলাম, পাশে থাকলাম কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না। বাঁচানোটাই তো সবচেয়ে বড়। প্রাথমিক চিকিৎসার নলেজ না থাকলে খুবই চাপের। শুধু ট্রাভেল করার সময় নয়, বাড়িতেও।
বিপদ বলে কয়ে আসে না
আট মাসের শিশুর এমন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া ও পালস না পাওয়া। মনে করা হচ্ছে হৃদযন্ত্রে কোনও সমস্যা হয়েছিল। এমন যেকোনও বাচ্চার হতে পারে, বোঝাই যাচ্ছে আজকাল আর এসবের বয়স নেই, আট থেকে আশি সবাই বৃত্তের মধ্যে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকের সংখ্যা গাতে গোনা। তাতে কী হতে পারে, সে চিত্র স্পষ্ট, জানান বিনায়ক। বলেন, 'বেসিক প্রশিক্ষণ আমার মনে হয় সকলের থাকা উচিত। ঘুরতে গেলে বিশেষ করে যেখানে সবসময় চাইলেই কিছু পাওয়া যাবে না, সেখানে কিন্তু বিরাট কাজে আসতে পারে। আপনি যে কাউকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা গিফট করতে পারেন।'
মেডিক্যাল সেক্টরের লোকজন তো এই প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। কিন্তু আমার আপনার মতো যারা সাধারণ মানুষ, তারা কী করবেন। আদৌ কি তাদের পক্ষে এই ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব? কোনও ব্যবস্থা আছে কোথাও প্রশিক্ষণ নেওয়ার? উত্তরে নন মেডিক্যাল পার্সন হয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিনায়ক জানান, দেশের দু জায়গায় এমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফ্রেডারেশন অনুমোদিত, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের গাইডলাইনপ্রাপ্ত হ্যানিফিল সেন্টার, উডস্টক স্কুল, মুসৌরি ল্যান্ডরে। আর উত্তরকাশীর এনওএলএস (NOLS)-তে। এই দুই সংস্থা শেখায় ও সার্টিফিকেট দেয়, যা ২ বছরের জন্য ভ্যালিড।
কী কী কোর্স হয়?
কথোপকথন থেকে উঠে আসে, তিনটি কোর্সের কথা। একটি বেসিক ফাস্টএইড (২দিন), পরেরটা অ্যাডভান্স ফাস্টএইড (৪দিন)। আর তারপরেরটা ওয়াইল্ডারনেস ফার্স্ট রেসপন্ডার (১২দিন)। কিছু কিছু জায়গায় এর নাম হয় WFA বা WAFA। এরপরেও একাধিক কোর্স হয় কিন্তু সেটা প্রাথমিক চিকিৎসা-সহ আরও অন্যান্য বিষয়ের উপর। কারও প্রাণ বাঁচাতে চাইলে এই কোর্স তিনটির একটি করলেই মোটামুটি হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কী কী শেখেন?
সিপিআর দিতে শেখেন ও পারেন, অ্যানাফিল্যাক্টিক শক-এর সময় এপিপেন দিতে পারেন। খাবার আটকে গেলে গলায়, একটা টেকনিক আছে, যাতে খাবারটা বেরিয়ে যেতে পারে, বেঁচে যেতে পারে যে কেউ।
ভ্রমণপিপাসু ও ট্র্যাভেল সংস্থার কর্ণধার হওয়া সূত্রে তিনি মনে করেন, এই ধরনের কোর্স ট্রেকিং বা বহুদিনের দুর্গম এলাকায় ঘুরতে গেলে খুব কাজে লাগে। যিনি ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি যদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন, তাহলে অনেক অসুস্থ বা বয়স্ক মানুষ নির্ভয়ে তাঁর সঙ্গে যেতে পারেন। একটা ট্রেন, বাস বা ফ্লাইটে কেউ একজনও এমন বেসিক চিকিৎসা জানলে অনেকের উপকার হতে পারে।