১৯০টিরও বেশি গবেষণার ফল মিলিয়ে তৈরি এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী শিশুদের মধ্যে খাবারে অ্যালার্জির ঝুঁকি প্রায় ৪.৭ শতাংশ অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে একজন করে আক্রান্ত হতে পারে।

শিশুদের ফুড অ্যালার্জি বাড়ছে
শেষ আপডেট: 19 February 2026 11:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এদেশে ছোটদের মধ্যে খাবার থেকে অ্যালার্জির প্রবণতা বেড়েছে। সম্প্রতি জামা পেডিয়াট্রিক্স (JAMA Pediatrics) জার্নালে একটি গ্লোবাল স্টাডিতে দেখা গিয়েছে যে এদেশে শিশুদের মধ্যে ফুড অ্যালার্জির (Food Allergy) প্রবণতা বেশ ঊর্ধ্বমুখী।
বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতি ২০ জনে ১ জন শিশুর খাবারে অ্যালার্জি থাকতে পারে বলেই দাবি গবেষণায়। তাই বাবা–মা এবং পরিচর্যাকারীদের বেশ কিছু লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে। কারণ অ্যালার্জি শুনতে সহজ মনে হলেও যেকোনও সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ধরুন, পিনাট বাটার (Peanut Butter) খাওয়ার পর হঠাৎ ত্বকে র্যাশ (Skin Rash) বেরোল, বা ক্ষীর খেয়ে পেট খারাপ হল। এগুলোকে অনেক সময় সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এবছর জামা জার্নালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, এমন লক্ষণ খাবারে অ্যালার্জির ইঙ্গিত হতে পারে। গবেষণাটি প্রায় ৩০ লক্ষ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মত, মা-বাবাকে একটু অপেক্ষা করে দেখি’- এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হতে হবে।
চিকিৎসকদের কথায়, খাবারে অ্যালার্জি মানেই শুধু ঠোঁট ফুলে যাওয়া নয়। এটি আসলে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের মধ্যেও একটা গন্ডগোল তৈরি করা, যা শিশুর বৃদ্ধি, পুষ্টি এবং সামগ্রিক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯০টিরও বেশি গবেষণার ফল মিলিয়ে তৈরি এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী শিশুদের মধ্যে খাবারে অ্যালার্জির ঝুঁকি প্রায় ৪.৭ শতাংশ অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে একজন করে আক্রান্ত হতে পারে। তাই অ্যালার্জির সমস্যা গুরুতর হওয়ার আগেই যদি তা ধরা যায়, তাহলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তাই বাবা–মায়েদের উচিত সন্তানের ছোট ছোট পরিবর্তন বা অস্বস্তিগুলি এড়িয়ে না গিয়ে, গুরুত্ব দেওয়া।
কোন কোন বিষয়ে সাবধান হবেন?
১. স্কিন বেরিস সিগন্যাল - ত্বকেই প্রথম অ্যালার্জির প্রভাব প্রকাশ পায়। ত্বকের সঙ্গে অ্যালার্জির সম্পর্ক সরাসরি। “অ্যাটোপিক মার্চ” প্রক্রিয়াতে ধরা পড়েছে এই প্রতিক্রিয়া কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি শিশুর ত্বকের সুরক্ষা স্তর দুর্বল হয়, তাহলে তা অ্যালার্জেন ঢোকার ক্ষেত্রে খোলা দরজার মতো কাজ করে। দীর্ঘদিনের একজিমা, লাল চাকা চাকা দাগ, খাওয়ার পর হঠাৎ অকারণ চুলকানির লক্ষণ থাকলে সাবধান হতে হবে।
জার্নালে প্রকাশিত মেটা-অ্যানালিসিস অনুযায়ী, ত্বক দিয়ে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা (ট্রান্সএপিডার্মাল ওয়াটার লস বা ‘লিকি স্কিন’) থাকলে খাবারে অ্যালার্জির ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। শৈশবে অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস থাকলে ভবিষ্যতে অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই অল্পবয়সিদের মধ্যে অ্যালার্জির লক্ষণ অবহেলা করা যাবে না।
২. শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ (নাকবন্ধ, নাক দিয়ে জল বের হওয়া) - অ্যালার্জি থেকে এমন হচ্ছে কিন্তু বাবা–মা সাধারণ সর্দি বলে ভুল করেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, আগে থেকে হুইজিং (শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় সাঁইসাঁই শব্দ) বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিস (ভাইরাল নয়, অথচ নাক দিয়ে জল পড়া) থাকলে খাবার থেকে অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দু’গুণ। ফলে কিছু খেলে শ্বাসকষ্ট, বারবার কাশি হওয়া বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় সাঁইসাঁই শব্দ (Wheezing) হলে সাবধান হওয়া খুব জরুরি।
৩. কিছু খাবার দেরিতে দিলে ঝুঁকি কম? না। বাবা-মায়েদের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে চিনাবাদাম বা ডিমের মতো অ্যালার্জিপ্রবণ (Allergy-prone) খাবারগুলি দেরিতে দিতে চান, কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে উল্টো ফল হতে পারে। শিশুর এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি এই খাবার ডায়েটে না আসে, তবে প্রথমবার খাওয়ানোর সময় হঠাৎ তীব্র প্রতিক্রিয়ার প্রবণতা বাড়ে। দেখা গেছে, ১২ মাস বয়সের পরে এই খাবারগুলির সঙ্গে পরিচয় করালে অ্যালার্জির সম্ভাবনা দ্বিগুণেরও বেশি, অথচ ৪-৬ মাস বয়সে অল্প করে খাওয়াতে শুরু করলে ইমিউন সিস্টেম সেই খাবারকে সহ্য করতে শেখে, ফলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমে।
৪. শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করে অন্ত্রে উপস্থিত ভাল ব্যাকটেরিয়ার ওপর। তাই জীবনের একেবারে শুরুতে যদি বেশি মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়, এই উপকারী জীবাণুগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে খাবারের সাধারণ প্রোটিনের প্রতিও শরীর অতিসংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ হলে হঠাৎ করেই হজমের সমস্যা শুরু হয় ও ত্বকে র্যাশ বের হতে পারে। গবেষণা বলছে, জন্মের প্রথম মাসে সিস্টেমিক অ্যান্টিবায়োটিক নিলে খাবারে অ্যালার্জির ঝুঁকি চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এমনকি গর্ভাবস্থায় বা প্রথম বছরে নেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বদলে দিয়ে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্জির ঝুঁকি ডেকে আনে।
৫. অ্যালার্জির ইঙ্গিত অনেক সময় লুকিয়ে থাকে পরিবারেই। বাবা-মা, বিশেষ করে মায়ের অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে সন্তানের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়। আবার শিশু গর্ভাবস্থায় যদি পরিবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায় তবে পরিবেশ বদলের ফলে ইমিউন সিস্টেম গন্ডগোল করে। এক্ষেত্রে অ্যালার্জিজনিত ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। এদেশের শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এদেশে আনুমানিক ৩%–৪.৭% শিশুর নিশ্চিত ফুড অ্যালার্জি আছে। শহুরে শিশুদের মধ্যে হার বেশি। যার অন্যতম কারণ হলো, জন্মের প্রথম দিকে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং দুধ, গম, ডালের মতো প্রধান পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে দেওয়ায়। এতে অপুষ্টি বাড়ে ও বৃদ্ধিতে বাধা তৈরি হয়।
তাই পরিশেষে এটাই বলার, ফুড অ্যালার্জির কোনও একক কারণ নেই। অনেক কিছু ফ্যাক্টর রয়েছে। ত্বকের সুরক্ষা, পারিবারিক ইতিহাস, আর জন্মের পর ঠিক সময়ে বিশেষ কিছু খাবার খাওয়া ও বিশেষ ওষুধের ব্যবহার সবকিছুর উপরই নির্ভর করে।