ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আমি নাকি খুব পয়া মেয়ে। বৃহস্পতিবার জন্মেছি। যেন সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী হয়ে মর্ত্যে নেমেছি। আমার জন্মের পরদিনই বাবার চাকরিতে উন্নতি, মাইনে বেড়ে যাওয়া, কিছুদিন পরেই বাড়ি কেনা, সবই নাকি এই পয়া মেয়ের জন্যে। আবার এই আমিই অন্য আত্মীয়স্বজনের কাছে তেমন পয়া নই। অপয়াও বলা যায়। কারণ আমার পদার্পণের পর কারও চাকরিপ্রাপ্তি হয়নি, ঘরবাড়ি হয়নি, এমনকী কারও মাইনেও বাড়েনি। তাহলে আমি কী? পয়া নাকি অপয়া?
পয়া-অপয়া নিয়ে এখন জাতীয় রাজনীতিতে অনেক রকম তরজা চলছে। তাই আমারও দ্বিধা বাড়ছে। কে পয়া আর কে অপয়া?
জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা কোনও মানুষ পয়া, কেউ অপয়া-এটা কি সত্যি?
শিবশংকর বললেন, "যা কিছু পৃথিবীতে ঘটে সব সত্যি। তাই কোনও মানুষ পয়া হতে পারেন। দেখবেন, কারও মুখ দেখে বেরোলে কার্যসিদ্ধি হয়, অনেক বাধাবিপত্তি কেটে যায়। আবার কেউ কেউ এতটাই অপয়া যে তাঁর মুখদর্শন করলে তীরে এসে তরী ডুবে যায়। সাফল্যের দরজায় এসে কাজ ভেস্তে যায়। পরীক্ষার প্রস্তুতি ভাল হওয়া সত্ত্বেও রেজাল্ট খারাপ হয়। আরও ভূরিভূরি উদাহরণ দেওয়া যায়। পয়া-অপয়া বিষয়টা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সেভাবে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে এটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এর মধ্যে কিছুটা হলেও অলৌকিকত্ব আছে। তবে খনার বচনে রয়েছে -
যদি দ্যাখো মাকুন্দ চোপা।
এক পাও বেরিও না বাপা।।
খনা বলে, এরেও ঠেলি।
যদি দ্যাখো মুখ তেলির।।
খনার বচন খণ্ডন না করাই যুক্তিযুক্ত।
খনা যতই বলুন,সমাজের কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে অপয়া বলা কি ঠিক?
ফেস রিড করার অসম্ভব ক্ষমতা শিবশংকরের। তাঁর যুক্তি যে আমার মনে ধরেনি, বেশ বুঝেছেন। মৃদু হেসেবললেন, "কার্যসিদ্ধির ক্ষেত্রে পয়া অপয়ার পাশাপাশি আর একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হল উপযুক্ত সময়। পঞ্জিকা দেখে শুভক্ষণে শুভ কাজে যেতে হয়। অমৃত যোগ ও মাহেন্দ্র যোগ দেখে বেরোলে অপয়া মানুষের মুখও কোনও বিপত্তি ঘটাতে পারবে না। কার্যসিদ্ধি হবেই।"
আরও নিশ্চিত উত্তরের আশায় কথা বললাম জ্যোতিষী কিংবদন্তি গৌতমের সঙ্গে। পয়া অপয়া প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে গৌতম যা বলতে চাইলেন তা হল, জ্যোতিষশাস্ত্র বা গ্রহরত্নর সঙ্গে পয়া অপয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।
কিন্তু তাহলে?
গৌতমের মতে, "এটা কিছুটা অলৌকিক, কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক। কিছুটা কোইনসিডেন্স বলা যায়। একবার কারও মুখ দেখে বেরিয়ে সাফল্য এলে লোকের তাকে পয়া মনে হয়। আবার কারও মুখ দেখে বেরিয়ে কার্যসিদ্ধি না হলে তাকে অপয়া বলে চিহ্নিত করা হয়। শুধু মানুষ কেন, অনেকে দেখবেন এক জামা পরে রোজ পরীক্ষা দেয়। কারণ প্রথম পরীক্ষা ওই জামা পরে দিয়েছিল এবং ভাল হয়েছিল। তাই ওটা পয়া জামা। এইরকম আর কী। খেলাধুলোর ক্ষেত্রেও এই পয়া অপয়া নিয়ে খুব চর্চা হয়। কেউ খেলা দেখতে গেলেই নিজের দল হেরে যায়। আর তিনি অপয়া তকমা পান। ওই জন্যই মনস্তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ এসেছে। আরও একটা ব্যাপার আছে। কারও প্রতি রাগ দ্বেষ থাকলেও মানুষ তাকে অপয়া বলে হেয় করে।'
পয়া অপয়া নিয়ে যুগ যুগ ধরে তর্কবিতর্ক ,যুক্তি সাজানো, অযৌক্তিক বিচার চলে এসেছে । চলতেও থাকবে। জ্যোতিষশাস্ত্র মনস্তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞান অনেক উত্তর খাড়া করবে। কিন্তু কনফিউশন দূর হবে কি?