অ্যানসেলত্তির দলের যেখানে ঘাটতি ছিল, আলনসোর দল সেখানে পরিপূর্ণ। সংগঠিত রক্ষণ, স্পষ্ট ট্রানজিশন, সঠিক সময়ে পাল্টা আক্রমণ—সবই দেখা গেল বের্নাবেউয়ে।

জাবি আলনসো
শেষ আপডেট: 27 October 2025 17:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রথম এল ক্লাসিকোতেই (El Clasico) নিজের জাত চেনালেন জাবি আলনসো (Xabi Alonso)। আপাদমস্তক শান্ত, ঠান্ডা মাথার কোচ। অথচ নিলেন একের পর সাহসী সিদ্ধান্ত। রবিবার বার্সেলোনাকে (Barcelona) ২–১ হারিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের (Real Madrid) ডাগআউটে বসেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, এই দল এখন ঠিক তাঁরই মতো—পরিকল্পিত, ধৈর্যশীল আর যথাসময়ে নির্মম!
গত মরশুমে পাঁচটি ক্লাসিকো হেরেছিল রিয়াল। এবার সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়ের (Santiago Bernabeu) ঝলমলে আলোয় গল্পটা পালটাল। কিলিয়ান এমবাপের (Kylian Mbappe) গোল, জুড বেলিংহামের (Jude Bellingham) অসাধারণ ফিনিশ আর আলনসোর ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে বার্সেলোনার গতি থামল, ধার ভোঁতা হল ঠিক সেখানেই, যেখানে তাদের সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল!
প্রথমার্ধে এমবাপে বেলিংহামের পাসে গোল করে রিয়ালকে এগিয়ে দেন। ৩৮ মিনিটে ফিরমিন লোপেজ (Fermin Lopez) সমতা ফেরালেও বিরতির ঠিক আগে ফের জ্বলে ওঠেন বেলিংহাম—স্কোর ২–১। দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন বার্সা গোলকিপার ভয়চেখ শেজনি (Wojciech Szczesny)। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচ কার্যত রিয়ালের কব্জায়!
ক্যামাভিঙ্গার মাস্টারস্ট্রোক
ম্যাচের আসল চমক আসে দল ঘোষণার সময়। অনভিজ্ঞ ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনোকে (Franco Mastantuono) বাদ দিয়ে শুরু থেকেই মাঠে নামান এদুয়ার্দো ক্যামাভিঙ্গাকে (Eduardo Camavinga)। বিস্ময় ঘনালেও আলনসোর মাথায় ছিল পরিষ্কার পরিকল্পনা—মিডফিল্ডে শক্তি, গতিশীলতা আর নিখুঁত পজিশন সেন্স।
ক্যামাভিঙ্গা সেই আস্থার যোগ্য প্রতিদান দেন। মাঝমাঠে তিনি কার্যত তিনজনের কাজ করেছেন একা হাতে। বল কেড়ে নেওয়া, পাস ঠেকানোয় অপ্রতিহত! বার্সার পাসিং গেমের বিরুদ্ধে অরেলিয়ান চুয়ামেনির (Aurelien Tchouameni) সঙ্গে তাঁর তালমিল সুদৃঢ় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। পেদ্রি (Pedri) আর ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের (Frenkie de Jong) মতো পাস বাড়ানোয় পারদর্শী খেলোয়াড়রাও ছন্দ হারান। ক্যামাভিঙ্গা কখনও সাইডে সরে গিয়ে উইঙ্গারের ভূমিকাও নেন, যাতে বেলিংহাম আরও সামনে উঠে খেলতে পারেন। ম্যাচের পর নিজের এক্স (X) পোস্টে লিখলেন—‘নতুন পজিশন আনলকড: রাইট উইঙ্গার!’ ভুল কিছু বলেননি ফরাসি মিডফিল্ডার!
কারেরাসের দায়িত্বপালন
রক্ষণের দিক থেকে আরেক মাস্টারমুভ—তরুণ আলভারো কারেরাসকে (Alvaro Carreras) দেওয়া হয় ১৮ বছরের লামিন ইয়ামালকে (Lamine Yamal) আটকানোর দায়িত্ব। কাজটা কঠিন ছিল, কিন্তু কারেরাস তা করেছেন নিখুঁতভাবে। ইয়ামালের প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ড্রিবল ঠেকিয়েছেন পরিকল্পিত কৌশলে। পাশে ছিলেন ডিন হুইসেন (Dean Huijsen)। দু’জন মিলে ইয়ামালকে এক ইঞ্চি জায়গা দেননি। এই টাইট, ডিসিপ্লিনড ডিফেন্সেই হারিয়ে যায় বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক গেমপ্ল্যান!
ইয়ামালকে ‘শিক্ষাদান’
ম্যাচের আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রিয়ালকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ইয়ামাল—‘ওরা চুরি করে আর অভিযোগ ছোড়ে!’ বের্নাবেউয়ের দর্শকরা সেই কথার জবাব দিয়েছেন সুরে… আর রিয়ালের ফুটবলাররা খেলায়। ইয়ামালের প্রতিটি টাচেই হুইসেল, প্রতিটি ভুলেই কটাক্ষ। শেষ পর্যন্ত তরুণ উইঙ্গারের হিসেব বলছে—দুটি শট, একটিও অন টার্গেট নয়… বল হারানো? আট-আটবার। আত্মবিশ্বাসের বদলে চাপ। অভিজ্ঞতা বলছে—বার্নাবেউ অহংকার দেখানোর মঞ্চ নয়। গতকাল সেটাই হাতেকলমে শিখলেন ইয়ামাল।
সাহসী সিদ্ধান্তে ট্রেডমার্ক ছাপ
কার্লো অ্যানসেলত্তির (Carlo Ancelotti) ব্যর্থতার পর আলনসোর কাঁধে ছিল দায়িত্ব—শুধু জেতা নয়, দলকে নতুন করে গড়া। সেই প্রথম পরীক্ষায়ই পাস করলেন দৃঢ়তা দেখিয়ে! বেঞ্চে বসিয়ে দিলেন একাধিক জনপ্রিয় মুখ, জোর দিলেন ভারসাম্যে। সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত—৭২ মিনিটে ভিনিসিউস জুনিয়রকে (Vinícius Jr) তুলে নেওয়া। ব্রাজিলিয়ান তারকার বিরক্তি চোখে পড়েছে, মাঠ ছাড়ার সময় ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আলনসো নিজের জায়গায় অটল। তাঁর কাছে আবেগ নয়, কৌশলই আসল। ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘প্রত্যেক ড্রেসিংরুমেই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকে। এখন জয় উপভোগ করছি, পরে কথা হবে!’
এই সংযত অথচ গম্ভীর ভাষাই বুঝিয়ে দিচ্ছে কেন আলনসোকে এতদিনে ‘রিয়ালের নতুন মুখ’ বলা হচ্ছে। তাঁর পরিকল্পনায় স্পষ্ট ভারসাম্য, খেলোয়াড়দের ব্যবহারেও স্পষ্ট যুক্তির ছাপ। তিনি জানেন কখন কাকে ছাড়তে হয়, আর কখন কাকে ধরে রাখতে হয়।
পরিণতি
অ্যানসেলত্তির দলের যেখানে ঘাটতি ছিল, আলনসোর দল সেখানে পরিপূর্ণ। সংগঠিত রক্ষণ, স্পষ্ট ট্রানজিশন, সঠিক সময়ে পাল্টা আক্রমণ—সবই দেখা গেল বের্নাবেউয়ে। এই জয় কেবল তিন পয়েন্ট নয়, এক প্রতীকও বটে। বার্সেলোনার আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরেছে, আর রিয়ালের ডাগআউটে শান্ত অথচ প্রখর মস্তিষ্ক।