ইউরোপে ক্লাব মানে শুধু ব্যবসা নয়—একটা শহর, একটা সম্প্রদায়ের অংশ। আর আমেরিকায় দল মানে মূলত একটি এন্টারটেনমেন্ট প্রোডাক্ট!

বিশ্বকাপ ২০২৬
শেষ আপডেট: 21 December 2025 17:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: খেলা দেখতে গিয়ে এত টাকা খরচ—এ কি সত্যিই স্বাভাবিক? ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে উত্তরটা স্পষ্ট—না। কিন্তু আমেরিকায় বাস্তবটা ঠিক উল্টো। সেখানে স্টেডিয়ামে ঢোকাই এক ধরনের বিলাসিতা। আর এই ফারাক, বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিটের দাম প্রকাশ্যে আসার পর, এখন দুনিয়াজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।
ইউরোপ বনাম আমেরিকা: দামের ফারাকের কারণ কী?
২০১৬ সালে লিভারপুল (Liverpool) যখন অ্যানফিল্ডে (Anfield) একটি ম্যাচের টিকিটের সর্বোচ্চ দাম ৭৭ পাউন্ড ঘোষণা করেছিল, তখনই ইংল্যান্ড ফেটে পড়ে প্রতিবাদে। হাজার হাজার সমর্থক ম্যাচের মাঝপথে স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যান। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্লাব পিছু হটে। আজও লিভারপুলের সবচেয়ে দামী টিকিট ৬১ পাউন্ডের আশেপাশে।
এই ছবির সঙ্গে আমেরিকার তুলনা করলে চমকে উঠতে হয়। সেখানে নিয়মিত এনএফএল (NFL) বা এমএলবি (MLB) ম্যাচে ঢুকতে ১৫০–৩০০ ডলার খরচ হওয়া স্বাভাবিক। বড় ম্যাচে আরও বেশি। অথচ অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এই নিয়ে কোনও মহলেই তেমন কোনও সংগঠিত প্রতিবাদ নেই। বেশির ভাগ দর্শক ধরে নিয়েছেন—‘ভালো ম্যাচ দেখতে চাইলে দাম দিতেই হবে।’
এই মানসিকতার পার্থক্যটাই মূল। ইউরোপে ক্লাব মানে শুধু ব্যবসা নয়—একটা শহর, একটা সম্প্রদায়ের অংশ। আর আমেরিকায় দল মানে মূলত একটি এন্টারটেনমেন্ট প্রোডাক্ট!
কেন আমেরিকায় টিকিটের দাম এত বেড়েছে?
পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, অর্থনীতি। গত কয়েক দশকে আমেরিকায় গড় আয় বেড়েছে, বিশেষ করে ধনী শ্রেণির আয়। ফলে একটি বড় অংশের মানুষের পক্ষে দামী টিকিট কেনা সম্ভব হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, চাহিদা ও জোগানের হিসাব। জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বড় কোনও লিগেই নতুন দলের সংখ্যা বাড়েনি। উল্টে অনেক স্টেডিয়ামে আসনসংখ্যা কমিয়ে ‘প্রিমিয়াম সিট’বাড়ানো হয়েছে। ফলে সস্তা টিকিট কমছে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তি। প্রায় ১৫ বছর আগে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’চালু হয়—যেখানে চাহিদা বাড়লে টিকিটের দামও বাড়ে, একেবারে বিমানের টিকিটের মতো! এতে ক্লাবগুলো বুঝে গেছে, দর্শক যত দিতে রাজি, ততটাই নেওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে ফলটা দাঁড়িয়েছে এমন—খেলা দেখাটা প্রমোদের বিষয় হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে।
ইউরোপে কেন দাম তুলনামূলক কম?
ইউরোপের ফুটবল ক্লাবগুলোর শিকড় আলাদা। বেশির ভাগ দল গড়ে উঠেছে সদস্যভিত্তিক সংগঠন হিসেবে। সমর্থকরাই প্রাণ। তাই হঠাৎ দাম বাড়ালে সরাসরি প্রতিরোধ আসে—প্রতিবাদ, বয়কট, আন্দোলন।
আরও একটি বড় বিষয়—টিকিট পুনর্বিক্রির উপর নিয়ন্ত্রণ। ইউরোপের অনেক দেশে স্ক্যালপিং বা কালোবাজারি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ফলে ক্লাব চাইলে কম দামে টিকিট দিয়ে নিশ্চিত হতে পারে, সেটাই সমর্থকের হাতে যাবে। আমেরিকায় এই নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে ক্লাব যদি দাম কম রাখে, তাতে লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগীরা, ক্লাব নয়। তাই ক্লাব নিজেরাই দাম বাড়ায়।
এই জায়গাতে ২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে ফিফা (FIFA) দেখছে—আমেরিকায় মানুষ কনসার্ট, খেলাধুলোর জন্য হাজার ডলার দিতেও অভ্যস্ত। যে কারণে গ্রুপ ম্যাচে ৭০০ ডলার, নকআউটে হাজার ডলারের বেশি দাম রাখা হয়েছে। ইউরোপীয় সমর্থকদের চোখে এটা ‘লুট’, যদিও আমেরিকার বাজারে ‘স্বাভাবিক’!
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা আর শুধু টিকিটের দাম নিয়ে নয়, দু’টি সংস্কৃতির ফারাক হয়ে উঠেছে। একদিকে ‘খেলা’ মানে জনতার উৎসব, অন্যদিকে ‘খেলা’ মানে প্রিমিয়াম বিনোদন। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই পার্থক্যটাকে আরও স্পষ্ট করে দিল।