অ্যান্সেলোত্তির উত্তর সংযত, কিন্তু পরিষ্কার—‘ফিট থাকলে, পারফর্ম করলে তবেই সুযোগ!’ কোনও নামের দায় নেই। কোনও আবেগের দায় নেই।

নেইমার
শেষ আপডেট: 14 December 2025 16:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চোট সারিয়ে মাঠে ফেরা। আবার চোটের কবলে পড়া। আঘাত নিয়ে এই চক্রবৎ আবর্তন যেন নেইমারের কেরিয়ারের ললাটলিখন হয়ে উঠেছে। প্রত্যাশা জাগিয়ে শুরু। তারপর বার্সেলোনায় মেসি–সুয়ারেজের সঙ্গে পার্টনারশিপ গড়ে সাফল্যের চূড়ায় আরোহন। আর্জেন্টিনীয় তারকার খ্যাতির বলয় থেকে বেরিয়ে নিজের গ্ল্যামারে উজ্জ্বল থাকার উদ্দেশ্যে পিএসজি-তে নাম লেখানো।
অতঃপর সৌদি ঘুরে নিজের দেশে ফিরে আসা। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে নামতে হলে ফর্ম ও ফিটনেস তুঙ্গে থাকা জরুরি। সেই নিরিখে কোথায় দাঁড়িয়ে নেইমার? শুধুমাত্র দেশের জনতার আবেগকে মূলধন করে কি তিনি চূড়ান্ত স্কোয়াডে নাম তুলতে পারবেন? বিশেষ করে কোচ (কার্লো অ্যান্সেলোত্তি) যখন ব্রাজিলীয় নন, ঠাট ইউরোপীয়—তাঁকে সেই জন-আবেগ কতটা স্পর্শ করবে? আদৌ প্রভাবিত হবেন তিনি? বিশ্বকাপের আগে এমনই একগুচ্ছ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এই প্রশ্নগুলো হঠাৎ করে ওঠেনি। ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে ‘খারাপ সময়’ মানেই অনেকের কাছে শুভলক্ষণ। ১৯৭০-এ বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোচ বদল, ১৯৯৪-এ যোগ্যতা অর্জনের শেষ মুহূর্তের নাটক কিংবা ২০০২-এ চার কোচ ঘুরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া—এই স্মৃতিগুলো আজও ব্রাজিলীয়-মননে জীবন্ত। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলের অস্থিরতা, কোচ পরিবর্তন, কোপা আমেরিকায় (Copa America) ব্যর্থতা—সবকিছুর মধ্যেই কেউ কেউ খুঁজে পাচ্ছেন আশার ইশারা।
২০০২-এর সঙ্গে তুলনাটা বিশেষভাবে টানা হচ্ছে বিশেষ কারণে। সেই সময় রোমারিওর (Romario) ‘শেষ বিশ্বকাপে’র গল্প গোটা দেশকে আন্দোলিত করেছিল। ফর্ম, বয়স, শৃঙ্খলা—সব প্রশ্নের মধ্যেও জনমতের চাপে নামটা বারবার ফিরছিল আলোচনায়। শেষ পর্যন্ত দলে সুযোগ পাননি রোমারিও। তবু ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছিল। আজ সেই গল্পের ছায়াতেই দাঁড়িয়ে নেইমার।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শেষবার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে খেলেছিলেন নেইমার। তারপর গুরুতর হাঁটুর চোট। পিএসজি ছেড়ে আল হিলালে (Al Hilal) যোগ দিয়েও কার্যত মাঠের বাইরে। ২০২৫ সালে সান্তোসে (Santos) ফিরে ২৯ ম্যাচে খেলেছেন। গোল ১১টি, অ্যাসিস্ট ৪টি। মন্দ নয়। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তব—১৭টি ম্যাচ মিস করেছেন চোটে। ফেব্রুয়ারিতে ৩৪ বছরে পা দেবেন। রোমারিওর সঙ্গে তুলনায় এই জায়গাতেই ফারাক। ২০০১ সালে প্রাক্তন ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকার ভাস্কোর হয়ে গোলের পর গোল করছিলেন। নেইমারের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা নেই।
হ্যাঁ, ঝলক আছে। কর্নার থেকে সরাসরি গোল। একক নৈপুণ্যে পেনাল্টি আদায়। রেলিগেশন থেকে সান্তোসকে টেনে তোলা। কিন্তু তার ফাঁকেই হ্যামস্ট্রিং, মেনিস্কাস, পুরনো হাঁটু—তালিকা দীর্ঘ। মাঠে নামলেও গতি কমেছে, ছন্দ ভাঙছে। বয়সের ভার আর দীর্ঘ অনুপস্থিতির ছাপ স্পষ্ট।
তার উপর নেইমার মানেই নাটক। প্রতিপক্ষ সমর্থকদের উসকানি, রেফারির সঙ্গে তর্ক, বদলি হওয়ার পর কোচের পাশ দিয়ে ক্ষোভ ঝরিয়ে টানেলে ঢুকে যাওয়া। প্রাক্তন কোচ ভান্ডারলেই লাক্সেমবার্গো (Vanderlei Luxemburgo) স্পষ্ট বলেছেন—‘বড় নাম হওয়া যথেষ্ট নয়, উদাহরণ তৈরি করাটাও জরুরি।’এমার্সন লিয়াওয়ের (Emerson Leao) আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য—‘ব্রাজিল নেইমার অধ্যায় পেরিয়ে এসেছে।’
তবু জাতীয় দল যেন তাঁকে ছাড়তে পারছে না। গোটা সময়পর্বে নতুন করে ২৮ জন খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছে। ভিনিসিয়াস জুনিয়র (Vinicius Junior), রাফিনিয়া (Raphinha), রদ্রিগো (Rodrygo), গাব্রিয়েল মার্টিনেলি (Gabriel Martinelli)—আক্রমণভাগে বিকল্পের অভাব নেই। তবু প্রতিটি সাংবাদিক বৈঠকে কার্লো অ্যান্সেলোত্তির (Carlo Ancelotti) সামনে সেই এক প্রশ্ন—নেইমার? তাঁর কী হবে? পাবেন জায়গা?
অ্যান্সেলোত্তির উত্তর সংযত, কিন্তু পরিষ্কার—‘ফিট থাকলে, পারফর্ম করলে তবেই সুযোগ!’ কোনও নামের দায় নেই। কোনও আবেগের দায় নেই। ইউরোপীয় কোচের এই বাস্তববাদই নেইমারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে জনমত চাপ নয়, চলবে ট্রেনিং গ্রাউন্ডের পারফরম্যান্স। রোমারিও যেমন শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি, নেইমারের সামনেও সেই আশঙ্কা।
আবার উল্টোটাও সম্ভব। যদি চোট সারে, যদি ধারাবাহিক ম্যাচ পান, যদি পুরনো জাদুর খানিকটা ফেরে—তাহলে তাঁকে বাদ দেওয়া কঠিন। কারণ নেইমার শুধু ফুটবলার নন। ব্রাজিলের প্রতীক, বাজার, গল্প—সব একসঙ্গে। দরজা আপাতত বন্ধ। চাবি হাতে তালা খুলতে হবে নেইমারকেই। আগামী ছ’মাস তাই শুধু ফিটনেসের পরীক্ষা নয়, ভবিতব্যের টার্নিং পয়েন্ট।