লা লিগার আসন্ন মরশুমের লড়াই কেবল শক্তি বনাম শক্তি নয়, একাধিক দর্শনেরও লড়াই। বার্সেলোনার যুবনির্ভর পজিশনাল রণকৌশল, রিয়ালের তারকানির্ভর আক্রমণাত্মক স্টাইল, আতলেতিকোর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল—প্রত্যেকের নিজস্ব, বিশিষ্ট ধারা রয়েছে। কিন্তু ফুটবলে কেবল কাগজে-কলমের শক্তি দিয়ে ফলাফল মাপা যায় না।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 August 2025 13:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লা লিগা মানেই ত্রিমুখী শক্তির অধিকার দখলের লড়াই। একদিকে বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ। অন্যদিকে দুই মহাশক্তিধর টিমকে চ্যালেঞ্জ জানাতে রোঁয়া ফুলিয়ে ময়দানে নামে আতলেতিকো মাদ্রিদ। প্রায় প্রতি সিজনে খেতাব নিজেদের দখলে রাখে বার্সা, রিয়াল। তবু এবারের মরশুম যেন দাবার ছকে সাজানো এক অনিশ্চিত লড়াই। একটা ভুল চাল, কয়েক ম্যাচের অফ ফর্ম প্রচুর খরচে বানানো ক্লাবকেও টাইটেলের রেস থেকে ছিটকে দিতে পারে। কাগজে-কলমে স্পেনের ঘরোয়া লিগে প্রতিবার তিনটি নাম আলোচনায় থাকে। কিন্তু আসন্ন সিজনের আগেই দেখা যাচ্ছে, চতুর্থ শক্তির উত্থান হলে তাকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বা ‘বিস্ময়কর’ বলে দেগে দেওয়া যাবে না।
বার্সেলোনা: শিরোপা ধরে রাখার মিশন
জাভির বিদায়ের পর বার্সেলোনার অন্দরে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি লক্ষ করা যায়নি। খুব অল্প সময়ে দল সাজিয়েছেন হান্সি ফ্লিক। গত মরশুমে লা লিগা জিতে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের কাঁধে ভর রেখে তারা প্রমাণ করেছে, দলবদলের বাজারে অতিরিক্ত অর্থ খরচ না করেও সাফল্য পাওয়া সম্ভব। গাভি, পেদ্রি, বালদে—এই তরুণ ত্রয়ী এখন দলের মেরুদণ্ড। সঙ্গে লেওয়ানদস্কির গোলের ধারাবাহিকতা, রাফিনহার গতি। ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার আগে নতুন সাইনিং হিসেবে এক-দু’জন অভিজ্ঞ তারকার সংযোজন ঘটলে বার্সা কাগজে-কলমে সবচাইতে শক্তিশালী টিম।
কিন্তু সমস্যাও রয়েছে। চোট-আঘাত বল গড়ানোর আগেই চোখ রাঙাচ্ছে। গাভির ফেরার সময় অনিশ্চিত। পাশাপাশি, দলের রক্ষণভাগ এখনও পুরোপুরি তৈরি নয়। যা কঠিন ম্যাচে বার্সাকে বিপদে ফেলতে পারে।
রিয়াল মাদ্রিদ: জাবি আলনসোর নতুন যুগ
ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ কার্লো আন্সেলোত্তিকে সরিয়ে জাবি আলনসোর হাতে রাশ তুলে দিয়েছেন। বায়ার লেভারকুজেনকে অপরাজিত মরশুম উপহার দেওয়ার পর স্পেনে ফেরা আলনসোর জন্য একপ্রকার ‘হোমকামিং’। তবে দায়িত্বটা সহজ নয়। রিয়াল মাদ্রিদ এবার আগের মতো ‘গ্যালাক্টিকো’ স্টাইলে কেনাকাটা করেনি। যদিও গেল মরশুমে এমবাপের চূড়ান্ত সংযোজন আক্রমণভাগকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ভিনিসিয়াস–এমবাপ্পে–রদ্রিগো—এই ত্রয়ী যে কোনও দিন, যে কোনও প্রতিপক্ষ রক্ষণের জন্য দুঃস্বপ্ন।
মাঝমাঠে এখন আর লুকা মদ্রিচ ও টনি ক্রুসের অভিজ্ঞতা নেই। ধীরে ধীরে ফেডে ভালভেরদে, চুয়ামেনি, কামাভিঙ্গা দায়িত্ব বুঝে নিতে শিখেছেন। প্রশ্ন একটাই—আলনসো কি তাঁর শৃঙ্খলাবদ্ধ, পজিশনাল ফুটবলের সঙ্গে রিয়ালের তারকাদের ধাতস্থ করাতে পারবেন? যদি সফল হন, তবে শিরোপার প্রধান দাবিদার রিয়ালই।
আতলেতিকো মাদ্রিদ: সিমিওনের অন্তিম চেষ্টা?
দিয়েগো সিমিওনের আতলেতিকো বরাবরই লিগে কালো ঘোড়া। ফি-মরশুম আন্ডারডগ হিসেবে দৌড়ে শামিল হয়। কিন্তু এবারের মরশুম সিমিওনের সামনে চূড়ান্ত পরীক্ষা। দলের ডিফেন্স এখনও মজবুত। আক্রমণে গ্রিজম্যান আগের মতোই ধারাবাহিক। সঙ্গে কিছু নতুন মুখ যোগ হয়েছে। কিন্তু আতলেতিকোর মূল শক্তি আর্জেন্তিনীয় ম্যানেজারের ‘ওল্ড-স্কুল’ ফুটবল, যা এবার হয়তো বদলাতে হতে পারে। কারণ লা লিগায় এখন গতি আর পজিশনাল খেলার তালমিল ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।
চতুর্থ শক্তির উত্থান?
রিয়াল সোসিয়েদাদ ও ভিলারিয়াল—দুটি দলের উপর নজর রাখা জরুরি। সোসিয়েদাদ গত কয়েক মরশুমে ধারাবাহিকভাবে সেরা চারে জায়গা করে নিয়েছে। তরুণ প্রতিভা ব্রায়েস মেন্দেজ আর তাকেফুসা কুবোরা নিয়মিত নজর কাড়ছেন। অন্যদিকে, ভিলারিয়াল ইউরোপা লিগে দুর্দান্ত লড়াই করেছে। নতুন কোচের অধীনে খেলছে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল। এদের মধ্যে কেউ টপ থ্রি-তে ঢুকে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
পরিসংখ্যানের ছবি
গত মরশুমে বার্সেলোনা লিগে সবচেয়ে কম গোল হজম করেছিল (২০)। রিয়াল মাদ্রিদ ঝুলিতে পুরেছিল সবচেয়ে বেশি গোল (৭৫)। আতলেতিকোর ডিফেন্স বার্সার সমমানের হলেও আক্রমণভাগে ধারাবাহিকতা উধাও। এবার এমবাপে তাঁর ফর্ম ধরে রাখলে গতবারের ট্রফিহীন মরশুমের দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে রিয়ালের উত্থান অবশ্যম্ভাবী, বার্সেলোনা টিকিয়ে রাখবে দুর্ভেদ্য রক্ষণ আর আতলেতিকো চেষ্টা করবে ডিফেন্স ও অ্যাটাকে ভারসাম্য আনতে।
তাই সবমিলিয়ে লা লিগার আসন্ন মরশুমের লড়াই কেবল শক্তি বনাম শক্তি নয়, একাধিক দর্শনেরও লড়াই। বার্সেলোনার যুবনির্ভর পজিশনাল রণকৌশল, রিয়ালের তারকানির্ভর আক্রমণাত্মক স্টাইল, আতলেতিকোর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল—প্রত্যেকের নিজস্ব, বিশিষ্ট ধারা রয়েছে। কিন্তু ফুটবলে কেবল কাগজে-কলমের শক্তি দিয়ে ফলাফল মাপা যায় না। চোট-আঘাত, ফর্ম, সূচির চাপ—সব মিলিয়ে মরশুমের মাঝপথে ছবিটা নিমেষে বদলে যেতে পারে।