স্রেফ স্পেন ম্যাচকেই যদি ‘স্যাম্পল’ হিসেবে দেখি, তাহলে মিউনিখের জমিতে দাপটের সঙ্গে শাসন করেছেন যিনি, তিনি একজন ফুলব্যাক। তিনি নুনো মেন্ডেস।

নুনো মেন্ডেস
শেষ আপডেট: 11 June 2025 10:00
নেশনস লিগ ফাইনালে মিউনিখের মাঠে তুবড়ি জ্বালাবেন রোনাল্ডো, রংমশাল লামিল ইয়ামাল!
মরশুমি ফুটবল-ভক্ত থেকে শুরু করে পোড়খাওয়া বিশেষজ্ঞ—সকলের মুখে মুখে ঘুরছিল এই দ্বৈরথের অংক। কে জিতবেন, কে হারবেন—এই নিয়েই মশগুল ছিল তামাম ফুটবলবিশ্ব।
রোনাল্ডো তবু গোল পেয়েছেন। তাঁর দল পর্তুগাল টানটান থ্রিলার জিতে কাপ হাতে তুলেছে। বছর সতেরোর ইয়ামালকে কিন্তু হারের মুখ দেখতে হয়েছে। গোল পাননি, বাড়াননি কোনও অ্যাসিস্ট। ড্রিবলিংয়ের চিরাচরিত ঝলক, মার্কারকে নিখুঁত ভঙ্গিমায় ডজ করে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তুরগ-গতিতে এগিয়ে চলা… উঁহু, রাত্রি জেগে খেলা দেখেছি যাঁরা, কেউই সেই ‘প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি’-মার্কা ফুটবল স্পেনের তরুণ ফুটবলারের পায়ে দেখতে পাইনি!
কার্যত খাঁচাবন্দি ক্রুদ্ধ সিংহের মতো ফুঁসেছেন, ছটফট করেছেন লামিল ইয়ামাল। ৯০ মিনিটও ময়দানে থাকার সুযোগ জোটেনি। কোচ ৮৮ মিনিটেই ডাগ আউটে বসতে বাধ্য করেছেন। বিমর্ষ মুখে সেখান থেকেই পেনাল্টি শুট আউটে দলের হার দেখেছেন উদীয়মান তরুণ প্রতিভা।

আর এই স্বপ্নভঙ্গের নায়ক যিনি, তাঁর নাম নুনো মেন্ডেস। যারা ফুটবলের তত্ত্বতালাশ রাখেন, মনে করেন মেসি-রোনাল্ডো ছাড়াও দুর্দান্ত ফুটবলার বিভিন্ন প্রজন্মে ময়দান দাপিয়ে খেলেছেন, তাঁরা মেন্ডেসকে চেনেন। জানেন, পিএসজির এই ফুলব্যাক চলতি সিজনে ক্লাবের হয়ে ট্রেবল জিতেছেন। তার মধ্যে রয়েছে চ্যাম্পিয়নস লিগ, যা ইতিহাসে প্রথমবার অর্জন করল ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ক্লাব!
অথচ মজার বিষয় হচ্ছে, মরশুমজুড়ে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করার পরেও, একগাদা ট্রফি হাতে তোলা সত্ত্বেও ব্যালন ডি অরঁ নামক সম্মানের জন্য তিনি ‘ফেভারিট’ নন। ‘উপযুক্ত’ বা ‘যোগ্য’ কি না—সেই প্রশ্নেই আমরা যাচ্ছি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন যাবৎ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং লিওনেল মেসির মৌরসিপাট্টা হয়ে ওঠা এই সম্মানলাভের দৌড়ে বেশ কয়েক কদম পিছিয়ে পতুর্গালের ডিফেন্ডার। এগিয়ে মিশরের মহম্মদ সালাহ, ফ্রান্সের উসমান ডেম্বেলে এবং স্পেনের লামিন ইয়ামাল।
লক্ষ্যণীয়, তিনজন ফ্রন্টরানার-ই কিন্তু আক্রমণভাগের ফুটবলার। নজর করার মতো বিষয় এও যে, মেন্ডেস প্রথম নন। এর আগেও কয়েক প্রজন্ম ধরে ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডারদের এই খেতাব থেকে ব্রাত্য রাখা হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, পাওলো মালদিনি ব্যালন ডি অরঁ পাননি। ফ্র্যাঙ্কো বারেসি কিংবা কোস্তাকুর্তার কপালেও জোটেনি এই খেতাব। ফুলব্যাকদের কথা ধরলে ব্রাজিলীয় কাফু, রবার্তো কার্লোস কিংবা জার্মানির ফিলিপ লাম—সকলে উপেক্ষিত!

গল্পটা পদক জেতা-না জেতা নয়। সমস্যা এবং আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকায় একজনও ডিফেন্ডারের ঠাঁই না পাওয়া! যেন ফুটবল মানেই গোল, ফুটবল মাত্রেই আক্রমণ। যেখানে স্ট্রাইকার আর উইঙ্গার ছাড়া আর কেউ মাঠেই নামেন না। যেন ডিফেন্ডিং কোনও শৈলী নয়। ‘কাতানেচ্চিও’ নামক ইতালীয় রক্ষণের প্রস্থান বুঝি কথার কথা!

তথ্য বলছে, ২০১৯ সালেই শেষবার একজন ডিফেন্ডার সেরা তিনে জায়গা করে নেন। তিনি লিভারপুলের ভার্জিল ভ্যান ডাইক। ২০০৬ সালে ফাবিও কানাভারো খেতাব জেতেন। ওই শেষ। তারপর সম্মানলাভের আলোচনায় রক্ষণের কোনও ফুটবলারের নাম পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি!
অথচ স্রেফ স্পেন ম্যাচকেই যদি ‘স্যাম্পল’ হিসেবে দেখি, তাহলে মিউনিখের জমিতে দাপটের সঙ্গে শাসন করেছেন একজন ফুলব্যাক। তিনি নুনো মেন্ডেস। দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল, টাচ, ট্যাকল, ফাইনাল থার্ড পাস, সফল ডুয়েল—সবকিছুর রেকর্ড মেন্ডেসের দখলে। বাড়তি উপার্জন: পকেটবন্দি লামিল ইয়ামাল! যিনি সেদিন এক ইঞ্চি জমি পেলে হেসেখেলে স্পেনের হাতে ট্রফি তুলে দিতে পারতেন।
লিভারপুলের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, অধুনা ধারাভাষ্যকার ও ফুটবল বিশেষজ্ঞ জেমি ক্যারেঘার একদা মন্তব্য করেন, ‘আগামী দিনে কেউ বড় হয়ে গ্যারি নেভিল হতে চাইবেন না!’ খুব ভুল কিছু বলেননি তিনি।
এ বছর মেন্ডেস যদি ব্রাত্য থাকেন, তাহলে জেমির আশঙ্কায় পাকাপাকিভাবে সিলমোহর দেওয়া ছাড়া আর সত্যি উপায় থাকবে না!