মিশরের তারকা ফুটবলার মহম্মদ সালাহ এই অর্ধ-সত্যকে সরাসরি চোখে আঙুল তুলে প্রশ্ন ছুড়লেন: ‘বলুন তো, তিনি কোথায়, কীভাবে, আর কেন মারা গেলেন?’ এই সওয়াল শুধু উয়েফাকে নয়, গোটা খেলার দুনিয়াকে ধাক্কা দিয়েছে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 August 2025 16:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বলুন তো, তিনি কোথায়, কীভাবে, আর কেন মারা গেলেন?’
গাজার রাজপথে ত্রাণের আর্তি নিয়ে দাঁড়ানো প্যালেস্তাইনি ফুটবলার সুলেমাইন আল-ওবেদের মৃত্যুতে উয়েফার শ্রদ্ধা নিবেদনের পোস্টে পালটা প্রশ্ন তুলেছেন মিশরের ফুটবলার, লিভারপুল স্ট্রাইকার মহম্মদ সালাহ। কেন তুলেছেন আর জবাব-ই বা কী--আপাতত সেই নিয়ে সরগরম ফুটবল মহল।
গাজার আকাশে একদিন-প্রতিদিন ধোঁয়ার ঢেউ, বিস্ফোরণের শব্দ, আতঙ্কের আঁচ। যদিও এতকিছুর মধ্যে খাবারের লম্বা লাইনে দাঁড়াবেন এক খেলোয়াড়, এমন ফুটবলার যিনি ‘প্যালেস্তাইনি পেলে’ নামে খ্যাত, সুলেমান আল-ওবেদ তাঁর নাম, ইজরায়েলি সেনার হামলায় প্রাণ হারাবেন—এই মর্মান্তিকতা কেউ-ই যেন মেনে নিতে পারছেন না।
মাঠে তাঁর দৌড় ছিল হরিণের মতো, অব্যর্থ পাসে ছিন্নভিন্ন হত বিপক্ষের মাঝমাঠ, আর রক্ষণকে একা হাতে বোকা বানিয়ে করা একের পর এক গোল যেন দেয়ালে টাঙানো বিমূর্ত ছবি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন প্রতিভা, আস্ত একটা জীবন যুদ্ধের বারুদে মুছে গেল।
১৯৮৪ সালের মার্চে জন্ম। শৈশব কেটেছে গাজার ধুলো-বালিময় কংক্রিটের রাস্তায়, বিদ্যুৎহীন রাতে। কিন্তু ফুটবল নিয়ে সুলেমানের পাগলামি ছিল অদ্ভুত। জার্নির শুরু খাদামাত আল-শাতি-র জার্সিতে। তারপর পশ্চিম তীরের মার্কাজ শাবাব আল-আমারি, গাজা স্পোর্ট—যেখানেই খেলেছেন, দর্শক দেখেছে একই জিনিস: নিখাদ দক্ষতা, নিপাট আনন্দ। গাজার মাঠে তিনি ছিলেন ‘প্যালেস্তিয়ান পেলে’। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ময়দানেও ছাপ রাখেন। জাতীয় দলের জার্সিতে ২৪ ম্যাচ, ২টি গোল। ২০১০ সালে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে বাইসাইকেল কিকে গোল—ভুলে যাওয়া অসম্ভব!
সবুজ গালিচায় মাঠের স্বপ্ন দিব্যি বুনছিলেন। দু’দেশের লড়াই-সংঘর্ষ সবকিছু তছনছ করে দিল। তবু যুদ্ধবিরতির ফাঁকে ফাঁকে ফুটবল খেলতেন সুলেমাইন। কিন্তু ৬ আগস্ট ২০২৫, গাজার দক্ষিণে রিলিফ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন ইজরায়েলি সেনাদের গুলিতে তাঁর জীবন শেষ হয়ে যায়। বয়স মাত্র ৪১। রইল স্ত্রী আর পাঁচ সন্তান। যে মানুষটা মাঠে গোলের পর হাত উঁচিয়ে দাঁড়াতেন, সেই হাত শেষবার উঠল খাবার আর ওষুধের জন্য। এক নির্মম ব্যঙ্গচিত্রের মতো!
এমন মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া, স্বাভাবিকভাবেই, বিশ্বজোড়া। ইউরোপের ফুটবল সংস্থা উয়েফা এক সংক্ষিপ্ত শ্রদ্ধাবার্তায় লিখল: ‘তিনি ছিলেন আশার প্রতীক।’ কিন্তু কোথায় মারা গেলেন? কীভাবে মারা গেলেন? তার উল্লেখ নেই। যেন মৃত্যুর প্রেক্ষাপট মুছে দিলে মৃত্যুও হালকা হয়ে যায়!
মিশরের তারকা ফুটবলার মহম্মদ সালাহ এই অর্ধ-সত্যকে সরাসরি চোখে আঙুল তুলে প্রশ্ন ছুড়লেন: ‘বলুন তো, তিনি কোথায়, কীভাবে, আর কেন মারা গেলেন?’ এই সওয়াল শুধু উয়েফাকে নয়, গোটা খেলার দুনিয়াকে ধাক্কা দিয়েছে। কারণ এতে লুকিয়ে এক গভীর সত্য, শিউরে ওঠা পরিসংখ্যান--প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের হিসেবমতে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখনও পর্যন্ত গাজায় নিহত ৬৬২ জন খেলোয়াড়। এর মধ্যে ফুটবলার ৪২১ জন। শিশু ১০৩ জন।
তিল তিল করে তোলা পরিকাঠামো ক’দিনেই ধ্বংস—স্টেডিয়াম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ক্লাবঘর মিলে ২৮৮টি সংঘ, প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে গিয়েছে। এই হিসেব স্রেফ ক্ষতির সূচক নয়—এ এক সংস্কৃতি ধ্বংসের কাহিনি। গাজায় যে মাঠে শিশুরা একসময় বুট পায়ে দৌড়ত, সেখানে আজ বালির স্তূপ, গর্ত, বিস্ফোরণ আর রক্তের দাগ।