দুজনেই ইতিহাসে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছেন, যা রোসারিওর নামকে বিশেষ এক মিথে পরিণত করেছে। এই শহর যেন দুই বিপরীত মেরুর জন্মস্থল। এক পাশে বিদ্রোহ, অন্য পাশে শিল্প। আর মধ্যিখানে সেই অদৃশ্য সুতো—যা দুজনকেই বেঁধে দেয় অনন্য পরিচয়ে।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 12 December 2025 15:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জন্মস্থান এক। একই দেশের নাগরিক। জীবনদর্শন আর নেতৃত্বের দিক দিয়েও মিল রয়েছে। বার্সেলোনা বোর্ডের বিরুদ্ধে একবার রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলে স্পেনীয় সংবাদপত্র একদা তাঁকে ‘চে মেসি' আখ্যা দেয়।
চে গেভারা (Che Guevara) আর লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। দুজনের ময়দান আলাদা। মঞ্চ আলাদা। কিন্তু বোধের সূত্রে কি কোথাও গিয়ে এক হয়ে যায় না দুটো নাম? লাতিন আমেরিকান স্পিরিট কীভাবে চারিয়ে গিয়েছে দুজনের অন্তরে? রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক এবং দর্শনগত নিক্তিতে কোথায় এক বিন্দুতে বাঁধা পড়েন দুজনে?
রোসারিওর গল্প
আর্জেন্তিনার তৃতীয় বৃহত্তম শহর রোসারিও—প্যারানা নদীর তীরে ব্যস্ত বাণিজ্য-বন্দর, শ্রমিক-নগরী, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেখানেই জন্ম দুই আইকনের। ১৯২৮ সালে আর্নেস্তো চে গেভারা। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া, শৈশবজুড়ে হাঁপানিতে ভোগা। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর স্বচ্ছ, বিপ্লবী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। যা আরও স্বচ্ছ করতে ঘুরে বেড়ান লাতিন আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। দেখেন বৈষম্য, দারিদ্র্য, শোষণ। এগুলোই তাঁকে ঠেলে দেয় বিপ্লবের পথে।
ঠিক প্রায় ছ’দশক পর, ১৯৮৭ সালে রোসারিওয় জন্ম নিলেন লিও মেসি (messi in kolkata)। শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা। তাঁর পথেও ছিল দুঃসহ বাধা। যার নাম: গ্রোথ হরমন ডেফিসিয়েন্সি (Growth Hormone Deficiency)। চিকিৎসার খরচ বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আর সেই টানাপড়েনই তাঁকে ১৩ বছর বয়সে নিয়ে গেল বার্সেলোনায়—এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
দুজনই রোসারিও ছেড়েছিলেন। কিন্তু একজন দুনিয়ার ক্ষমতা কাঠামো ভাঙতে; অন্যজন নিজের শরীর ও প্রতিভাকে পূর্ণতা দিতে।
‘চে মেসি’ কি ‘ফুটবলের বিপ্লবী’?
দুজনের বাস্তব জীবন সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু প্রতীকের জায়গায় আশ্চর্যভাবে এক। চে গেভারার গেরিলা চেহারা—তীক্ষ্ম দৃষ্টির সেই বিখ্যাত ছবি—আজ দ্রোহের সবচেয়ে শক্তিশালী আইকন। আর মেসির মুখ, তাঁর ড্রিবলিং, প্রতিভা—দেয়ালজোড়া বিজ্ঞাপন, মুরাল, শিরোপা—সব মিলিয়ে ফুটবলের সর্বকালের শ্রেষ্ঠদের একজন।
এই প্রতীকের জগতেই ২০২০ সালে ফরাসি ক্রীড়া সংবাদপত্র (L’Équipe) তুলে আনে একটি তুলনা। মেসিকে (messi kolkata)
দেখানো হয় চের আদলে। ক্যাপশনে লেখা:‘Lionel Messi, the Che of Barça’। প্রেক্ষাপট: মেসি বার্সেলোনা বোর্ডের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন। আর সেটাকেই দেখা হয় ‘বিরোধিতা’, ‘প্রতিবাদ’এমনকি ‘বিপ্লবে’র অভিজ্ঞান হিসেবে। যেখানে চে গেভারা রাষ্ট্র ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, সেখানে মেসি সরব হন ফুটবল-শাসনের আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে। দুজনের লড়াইয়ের প্রকৃতি আলাদা, কিন্তু মনোভাবের জায়গায়—অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়ানো—অদ্ভুত মিল!
নায়কত্বের মিল-অমিল
দুজনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আর্জেন্তিনার মুখ হয়ে উঠেছেন—কিন্তু তাঁদের নিয়ে দেশের অন্দরে ভাবনার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। চে-কে অনেকে দেখেন ন্যায়-সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। কেউ বিতর্কিত চরিত্র রূপে—একজন কঠোর বিপ্লবী, যিনি সহিংস পথকেই দিনবদলের পন্থা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
মেসির (goat tour messi) ক্ষেত্রে অন্যরকম টানাপোড়েন। দীর্ঘদিন আর্জেন্তিনার সমর্থকদের একাংশ মনে করত, মেসি নাকি দেশের চেয়ে ক্লাবকে বেশি ভালবাসেন। ‘বার্সেলোনার ছেলে’, ‘দেশে এসে মন খুলে খেলেন না’—এসব অভিযোগ ছায়ার মতো ঘুরপাক খেত। তবে ২০২১-এর কোপা আমেরিকা আর ২০২২-এর বিশ্বকাপ জয়—সব বদলে দেয়। আজ রোসারিও থেকে বুয়েনোস আইরেস—মেসিই জাতীয় গর্বের নতুন মুখ। গ্রহণযোগ্যতার পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে গড়ে উঠেছে। কিন্তু দুজনেই শেষে গিয়ে আর্জেন্তিনার পরিচয়-রাজনীতির বৃহত্তর বয়ানে জায়গা করে নিয়েছেন।
কীভাবে জুড়ে যায় উত্তরাধিকার?
চে গেভারা বিশ্বাস করতেন সশস্ত্র বিপ্লবে। তিনি দুনিয়া বদলাতে চেয়েছিলেন রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা ভেঙে। মারা যান বন্দি অবস্থায়, বুলেটের আঘাতে। মেসি (messi in kolkata date) দুনিয়া পাল্টান নিখুঁত ফুটবলে—কোনও বন্দুক নয়, পায়ের ছোঁয়ায়। তাঁর মঞ্চ ন্যু ক্যাম্প, পার্ক দে প্রিন্স, লুসাইল—বিশ্বের তাবড় স্টেডিয়াম। তবে দুজনকেই এক সূত্রে বেঁধে দেয়—‘প্রভাব’! চে-র বিপ্লব রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। মেসির ফুটবল পাল্টেছে খেলাধুলার নন্দন, প্রতিভার সংজ্ঞা, বিশ্ববাজারের অর্থনীতি। একজন ছিলেন মতাদর্শের যোদ্ধা, আরেকজন শিল্পের সাধক। কিন্তু দুজনেই ইতিহাসে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছেন, যা রোসারিওর নামকে বিশেষ এক মিথে পরিণত করেছে। এই শহর যেন দুই বিপরীত মেরুর জন্মস্থল। এক পাশে বিদ্রোহ, অন্য পাশে শিল্প। আর মধ্যিখানে সেই অদৃশ্য সুতো—যা দুজনকেই বেঁধে দেয় অনন্য পরিচয়ে।