পালমারকে দেখলে মনে হয় না তিনি খুব জটিল কিছু করছেন। অতিরিক্ত নাটকীয়তা নেই। ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর মতো না আছে পেশির জোর, না লিওনেল মেসি-র মতো ছোট রান-আপ। তিনি মাঝামাঝি এক ভারসাম্য তৈরি করেন।

কোল পালমার
শেষ আপডেট: 18 February 2026 17:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেনাল্টি শট টিভির পর্দায় দেখলে সাধারণ দর্শকের মনে হয়—‘এ তো সহজ কাজ, যে কেউ করে দেখাতে পারে!’ বাস্তবে কিন্তু ব্যাপারটা এত সরল নয়। চাপ, প্রত্যাশা, গোলকিপারের মনস্তত্ত্ব—সব মিলিয়ে পেনাল্টি কিক ফুটবলের ময়দানে অন্যতম জটিল মানসিক সংঘাতের মুহূর্ত। আর এই লড়াই অতিসম্প্রতি যিনি বারবার হেলায় জিতেছেন, গোলকিপারকে বোকা বানিয়ে পরাস্ত করে বল জড়িয়েছেন জালে, তাঁর নাম কোল পালমার।
প্রিমিয়ার লিগে চেলসির এই মিডফিল্ডারের ১৯টি পেনাল্টির মধ্যে ১৮টি গোল। সাফল্যের হার ৯৪.৭ শতাংশ। প্রথম ১২টি পেনাল্টি টানা গোল করে রেকর্ডও গড়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ইতিমধ্যে লিগ ইতিহাসের সেরা পেনাল্টি-টেকারদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন পালমার। আর এই সূত্রে জেগেছে প্রশ্ন: কীভাবে তরুণ ফুটবলার পেনাল্টি কিকে এত অদ্ভুত দক্ষতা অর্জন করেছেন? পালমার নিজে অবশ্য খোলসা না করে রহস্য বাড়িয়ে বলেছেন, ‘কিক নেওয়ার সময় মাথায় তেমন কিছুই থাকে না।’কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ব্যাপারটা এত সরল নয়।
বৈচিত্র্যই আসল শক্তি
পেনাল্টি নেওয়ার দু’টি মান্য পদ্ধতি রয়েছে। এক, হয় গোলকিপারের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করো—গোলরক্ষক নড়াচড়া করলেই উল্টোদিকে মারো। দুই, আগেই জায়গা ঠিক করে সজোরে শট নাও। আপাতদৃষ্টিতে পালমার দু’নম্বর পদ্ধতি কাজে লাগান। বিশেষজ্ঞ বেন লিটলটনের চোখে, চেলসি ফিল্ডফিল্ডারের রান-আপ দ্রুত, সাবলীল। তিনি থেমে থেমে এগোন না। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ বা রাউল হিমেনেজের মতো স্টাটার-স্টেপ নেই। তবু গোলকিপারকে প্রায়শই ভুল দিকে ঝাঁপাতে বাধ্য করেন।
কীভাবে?
হিসেব বলছে, পালমার কখনও টানা তিনবারের বেশি একই দিকে শট নেননি। ডানদিক-বামদিক আকছার অদলবদল করেন। মাঝেমধ্যে ‘পানেনকা’-ও বেছে নেন। ফলে গোলকিপারের পক্ষে প্যাটার্ন তৈরি করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর ১৯টি পেনাল্টির মধ্যে ১৪ বার কিপার ভুল বুঝেছেন! এই অনিশ্চয়তাই পালমারের বড় অস্ত্র। গোলরক্ষক জানেন না, এবার কী আসতে চলেছে!
শরীরের ভাষা ও বায়োমেকানিক্স: শেষ মুহূর্তের মোচড়
মাদ্রিদের পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, পামারের সাপোর্ট ফুট—মানে যে পা মাটিতে রাখেন—তার দিকই শটের অভিমুখ ইঙ্গিত করে। শেষ মুহূর্তে তিনি সেই পায়ের কোণ সামান্য ঘোরান। এতে কোমর বেঁকে যায়, শরীরের বিভঙ্গ ও সেই সূত্রে শটের দিক বদলায়। ‘লাস্ট-মিনিট অ্যাডজাস্টমেন্ট’ এলিট মানের পেনাল্টি-টেকারদের বৈশিষ্ট্য। হ্যারি কেন-ও এভাবে শেষ মুহূর্তে অ্যাঙ্কল ঘোরাতে দড়।
তা ছাড়া পালমারের রান-আপ তুলনামূলক লম্বা। পায়ের সুইং বড়। তিনি বলের ঠিক সেন্টারে আঘাত করেন। বল ওঠে না, ভাসে না… সোজা যায়—নিচু ট্র্যাজেক্টরিতে। ফলে গোলকিপারের অনেক সময় ঝাঁপ দিতে দেরি হয়, কারণ অনেকেই আগে সামান্য সামনে এগোন, তারপর ডাইভ দেন। এতেই সময় নষ্ট। বল নিচু ও দ্রুত গেলে এমনিতেও বাঁচানো কঠিন।
নাটক নয়, নিখুঁত আঘাত
পালমারকে দেখলে মনে হয় না তিনি খুব জটিল কিছু করছেন। অতিরিক্ত নাটকীয়তা নেই। ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর মতো না আছে পেশির জোর, না লিওনেল মেসি-র মতো ছোট রান-আপ। তিনি মাঝামাঝি এক ভারসাম্য তৈরি করেন। বল মারার সময় তাঁর শরীর সামান্য বেঁকে যায়। বুক বেরিয়ে আসে, কোমর প্রসারিত হয়। এতে জমে ওঠে অতিরিক্ত শক্তি! গল্ফের সুইং বা ক্রিকেটে ছক্কা মারার মতো—সঠিক দূরত্বে পা রেখে বলের কেন্দ্রে আঘাত। যে কারণে গোলকিপার সঠিক দিক ধরলেও প্রায়ই পৌঁছতে ব্যর্থ। বলের গতি ও অবস্থান—দুটোই নিখুঁত হওয়ায় চ্যালেঞ্জ দুরূহ হয়ে ওঠে।
শুধু একবার, মাডস হারম্যানসেন তাঁকে আটকেছেন। কিন্তু বাকি সময় সঠিক অনুমান করেও গোলকিপাররা ব্যর্থ—যেমন এডারসন বা আলিসন বেকার কেউ সেভ করতে পারেননি।
মনস্তত্ত্ব: চাপের মুহূর্তে ‘কিছুই ভাবি না’
পেনাল্টি আসলে মানসিক যুদ্ধ। ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী ড্যান আব্রাহামসের বক্তব্য, যত বড় ম্যাচ, তত বেশি নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আসে। ‘যদি মিস করি?’—এই ভয়ই অনেক সময় তাবড় খেলোয়াড়কেও আটকে দেয়।
পালমারের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা। অতীতে সফল হওয়ায় আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। মিস করার পরেও তিনি পদ্ধতি বদলাননি। বরং, একই কায়দায় আবার নিয়েছেন। এই ‘ডাবল ডাউন’মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। পালমার ভেঙে পড়েন না। বরং, বিশ্বাস করেন—নিজের টেকনিক পরীক্ষিত, সফল। তাঁর ১১টি পেনাল্টি ম্যাচে দলকে হয় সমতায় ফিরিয়েছে বা এগিয়ে দিয়েছে। স্টপেজ-টাইমেও গোল করেছেন। ২০২৪ সালে টটেনহ্যামের বিরুদ্ধে ম্যাচের শেষে ‘পানেনকা’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত—এও আত্মবিশ্বাসের চরম প্রকাশ। তাঁর নিজের বক্তব্য, ওই ম্যাচের আগের দিনই নাকি বন্ধুদের বলেছিলেন, সুযোগ পেলে চিপ করবেন। কথা রেখেছেন পালমার।
চাপের মুহূর্তেও খেলার আনন্দ ধরে রাখা… এও তো চ্যাম্পিয়নের লক্ষণ!