পিউবালজিয়া শুধু চোট নয়—এটা আধুনিক ফুটবলের সতর্কবার্তা। যা দেখিয়ে দিচ্ছে—ফুটবল যত দ্রুত হচ্ছে, ম্যাচ যত বাড়ছে, তত চোখ রাঙাচ্ছে চোট-আঘাতের ঝুঁকি।

কোল পালমার
শেষ আপডেট: 9 December 2025 14:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লেখার শুরুতেই স্ট্রেটকাট ক্যুইজের প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া যাক: বার্সেলোনার লামিন ইয়ামাল, চেলসির কোল পালমার আর অ্যাথলেটিক ক্লাবের নিকো উইলিয়ামসের মধ্যে মিলের জায়গা কোথায়?
জবাব আসবে একাধিক৷ কেউ বলবেন, তিনজনেই দ্রুতগতির ফুটবলার৷ কারও জবাব হতে পারে, প্রত্যেকে উইংয়ে খেলেন৷ কিন্তু আরেকটু খুঁটিয়ে দেখেন যাঁরা, তাঁরা জানাবেন, উঁহু, এসবের একটাও না। সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে তিন ফুটবলারই এক বিশেষ ধাঁচের চোট-আঘাতের সঙ্গে যুঝে চলেছেন৷ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যার নাম ‘পিউবালজিয়া' (Pubalgia)।
পিউবালজিয়া আসলে কী?
ফুটবল চিকিৎসাবিদ্যায় ‘পিউবালজিয়া’ (Pubalgia) ব্যাপকতর অর্থ বহন করে—এর ভিতরে থাকতে পারে অ্যাডাক্টর টেনডন ইনজুরি, অ্যাবডোমিনাল স্ট্রেন, পিউবিক সিম্ফিসিসে জ্বালা, এমনকি স্পোর্টস হার্নিয়াও! ব্যথা হয় মূলত কুঁচকি, তলপেট, হিপ–জংশনের কাছাকাছি। দৌড়, শট বা হঠাৎ দিক বদল করলে যা তীব্রতর হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা।
সমস্যা হচ্ছে, পিউবালজিয়া (Pubalgia) নিঃশব্দে বাড়ে। খেলোয়াড়রা প্রথমে ভাবেন—‘টান লেগেছে, দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে!’ কিন্তু ফারাক এটাই: এই আঘাত সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়, বিশ্রাম ছাড়া যা থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠা অসম্ভব।
উইঙ্গাররাই কেন সবচেয়ে বেশি শিকার?
১. বারবার তীব্র স্প্রিন্ট
উইঙ্গারদের কাজই হচ্ছে হঠাৎ গতি বাড়ানো, হঠাৎ থেমে যাওয়া, তার পর আবার দৌড়—এই আচমকা পরিবর্তন অ্যাডাক্টর ও অ্যাবডোমিনাল লিঙ্কে প্রচুর চাপ ফেলে।
২. দিক বদলের খেলা
ক্রস দেওয়ার আগে বা কাট-ইন করার সময় শরীরকে একদিকে পুরো ঘোরাতে হয়। এতে হিপ–জয়েন্টে এমন লোড পড়ে যা ওজনের দশ–বারো গুণও হতে পারে।
৩. এক পা–নির্ভরতা
ডান পায়ের উইঙ্গাররা একভাবে কাট করে, বাঁ পায়ের খেলোয়াড়রা অন্যভাবে। এক পা অতিরিক্ত ব্যবহারে পেশিগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়। একদিকে দুর্বলতা, অন্যদিকে অতিরিক্ত কাজ। এই দুইয়ের ফাঁকে ঢুকে পড়ে পিউবালজিয়া!
৪. আধুনিক ফুটবলের রান-লোড
বেশিরভাগ দলের প্রেসিং–স্টাইল এখন এমন, যে উইঙ্গাররা শুধু আক্রমণ নয়। প্রেস, ট্র্যাকব্যাক, কাউন্টার সবকিছুর দায়িত্ব নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে এতে ম্যাচ–ভিত্তিক লোড অনেক বেড়ে গিয়েছে।
লামিন ইয়ামালের বয়স এখন ১৮। পালমারও তরুণ। পেশাদার ফুটবলার হয়ে ওঠার ফাঁকেই তাঁরা এমন জায়গায় খেলছেন, যেখানে শরীরের গ্রোথ প্লেট এবং অ্যাপোফাইসিস পুরোপুরি শক্ত হয়নি। এই বয়সে অতিরিক্ত লোড শরীর সামলানো সম্ভব নয়। টেন্ডন–বোন সংযোগ দ্রুত ইনফ্লেমড হয়ে ওঠে। যে কারণে চিকিৎসকরা প্রায়ই বলেন—‘প্রতিভা দ্রুত আসে, কিন্তু শরীরের প্রস্তুতি একটু ধীরে!’ উইলিয়ামস–পালমার ইয়ামালের তুলনায় বয়সে বড় হলেও ম্যাচের সংখ্যা, প্রতিযোগিতার স্তর তাঁদের শরীরের উপর একই ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
এখন মোটামুটি পরিস্থিতি এমন—কাগজে ১০–১২ দিন বিরতি থাকলেও আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের বাস্তবে বিশ্রাম প্রায় নেই। ক্লাব ম্যাচ, আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্ট, কনফেডারেশন ম্যাচ—সব মিলে ম্যাচের চাপ অস্বাভাবিক রকম চড়া। ইয়ামাল–পালমারের মতো কিশোররা ১৬–১৮ বছর বয়সেই প্রায় অভিজ্ঞ ফুটবলারের চাপ বইছেন। তার উপর পুনরুদ্ধার সেশনের সময় নেই বললেই চলে। যে কারণে বার্সেলোনা–স্পেন বা অ্যাথলেটিক–স্পেনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়—একপক্ষ বলে ‘রেস্ট দাও’। অন্য শিবিরের দাবি ‘আমরা ম্যাচ খেলাব!’
চিকিৎসা কী? কতদিন লাগে ফিরে আসতে?
প্রথম ধাপ—ব্যথা নিয়ন্ত্রণ। ইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ (স্ট্যাটিক স্কুইজ ও হোল্ড) ব্যবহার করা হয় ব্যথা কমিয়ে টেন্ডনকে ‘চলমান’ রাখতে।
দ্বিতীয় ধাপ—রিহ্যাব। অন্তত ৩–৬ সপ্তাহ লাগে, গুরুতর হলে ১০–১২ সপ্তাহও হতে পারে। শকওয়েভ থেরাপি, রেডিওফ্রিকোয়েন্সি স্টিমুলেশন, টার্গেটেড আইসোমেট্রিক প্রোগ্রাম, অ্যাডাক্টর ব্যালান্স ট্রেনিং, (বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রে) স্পোর্টস হার্নিয়া সার্জারি সেরে ওঠার বেশ কিছু কার্যকর পদ্ধতি।
কেন বারবার ফিরে আসে?
বেশিরভাগ ক্লাব–স্টাফ খেলোয়াড়দের মাঠে ফেরাতে তাড়াহুড়ো করেন। পেশির দুই পাশের শক্তির অসমতা (muscle asymmetry) পুরোপুরি না সারলে পিউবালজিয়া ফিরে আসবেই। উইঙ্গারদের ক্ষেত্রে এই তাড়াহুড়ো অনেক বেশি।
এড়ানোর উপায়:
১. নিয়মিত অ্যাডাক্টর-স্ট্রেন্থ টেস্ট
প্রতি মাসে ডান–বাঁ দিকের শক্তির বৈচিত্র্যের পরীক্ষা করতে হয়। ১০%–এর বেশি হলে সতর্কতা প্রয়োজন।
২. মাইক্রোডোজ স্ট্রেন্থ ব্লক
আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ একঘেয়ে। কিন্তু এইটাই সবচেয়ে কার্যকর। সপ্তাহে তিন দিন ১০–১২ মিনিট দিলেই বড় চোট থেকে সেরে ওঠা সম্ভব।
৩. ম্যাচ ডেনসিটি কমানো
এটাই সবচেয়ে কঠিন। কারণ উইঙ্গারদের ওপর ক্লাব–দেশ—দুটো জায়গাতেই ব্যাপক নির্ভরতা।
৪. ধীরে ধীরে লোড বাড়ানো
ইয়ামালের যা বয়স, তাতে ৫০+ ম্যাচ খেলানো অবাস্তব। কিন্তু বর্তমান ফুটবলে এটা নিয়ম হয়ে গেছে।
শেষ কথা: পিউবালজিয়া শুধু চোট নয়—এটা আধুনিক ফুটবলের সতর্কবার্তা। যা দেখিয়ে দিচ্ছে—ফুটবল যত দ্রুত হচ্ছে, ম্যাচ যত বাড়ছে, তত চোখ রাঙাচ্ছে চোট-আঘাতের ঝুঁকি। এই পরিস্থিতিতে ‘ট্যালেন্ট–ম্যানেজমেন্ট’না শিখলে ভবিষ্যৎ বিপজ্জনক।