আর্জেন্টিনার নদীর শহর রোসারিও কীভাবে গড়ে তুলেছিল লিওনেল মেসির শৈশব, স্বপ্ন ও ফুটবল প্রতিভার ভিত?

রোসারিও ও মেসি
শেষ আপডেট: 12 December 2025 23:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আর্জেন্তিনার মানচিত্রে রোসারিও এক শিল্পনগরী, ব্যস্ত বন্দর, আর প্যারানা নদীর দোলায় ভর করে গড়ে ওঠা প্রাণচঞ্চল মহানগর। কিন্তু গোটা পৃথিবীর কাছে রোসারিও মানে একটাই নাম-লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। এই শহর তাঁকে শুধু জন্মই দেয়নি, তৈরি করেছে তাঁর মনের ভিত, শৈশবের স্বপ্ন, আর সেই তীব্র জেদ। যা তাঁকে পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে।
শুরু লা বাজাদা মহল্লায়: রাস্তার ধুলোয় জন্ম প্রতিভার (La Bajada)
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেওয়া লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি বড় হয়েছেন লা বাজাদা অঞ্চলে। রোসারিওর এক শ্রমজীবী, সাধারণ পাড়ায়। এখানে ফুটবল শুধু ‘খেলা’ শেখা শুধু পড়াশোনার বাইরের অ্যাক্টিভিটি নয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভাই–বোন, খুড়তুতো ভাই, পাড়ার বন্ধুরা-সবাই মিলে কংক্রিটের রাস্তায়, ঘষা খাওয়া বল দিয়ে দিনভর খেলত। এই খেলাই এঁকে দেয় ছেলেটির ভবিষ্যৎ।
স্থানীয় ক্লাব গ্রানদোলিতে বাবার, জর্জ মেসি (Jorge Messi) কোচিংয়ে শুরু। তারপর রোসারিওর গর্ব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ (Newell’s Old Boys)–এর অ্যাকাডেমি। এখানে তাঁর দল ছিল কিংবদন্তি ‘মেশিন অব ’৮৭’। যারা নাকি হারতে ভুলেই গিয়েছিল! ছোট্ট শরীর, তবু অবিশ্বাস্য টেকনিক, চোখধাঁধানো ড্রিবল-এই বয়সেই মেসির ভেতরের ফুটবল-দেবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
রোসারিওবাসীর কাছে ঠিক ওই গ্রামেই গড়ে ওঠে মেসির প্রতিভা, স্বভাব, চরিত্র এবং সবটা।
শহর ছাড়ার বেদনা, তবু রয়ে যাওয়া রোসারিও-স্বভাব
দশ বছর বয়সে ধরা পড়ে গ্রোথ–হরমন ডেফিসিয়েন্সি। চিকিৎসা ব্যয় আকাশছোঁয়া। নিউওয়েলস থেকে সাহায্য পাওয়া যায়নি। তখনই ভরসা হয়ে আসে বার্সেলোনা (FC Barcelona)। চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার শর্তে তাঁকে তুলে নেয় লা মাসিয়া।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি পাড়ি দিলেন স্পেনে। বন্ধু, পরিবার, শহর সবকিছু পিছনে ফেলে। তবু তাঁর রোসারিও-স্বভাব কোনও দিন পাল্টায়নি। আজও তিনি কথা বলেন খাস ‘রোসারিনো’ টানে (Lunfardo)। যা শহরের মানুষের কাছে গর্বের বিষয়। ছুটি পেলেই ফেরত আসেন গোপনে, পরিবারের কাছে। রোসারিওর উপকণ্ঠের ওই বাড়ি তাঁর সবচেয়ে কাছের, আপন জায়গা।
শহর যে তাঁকে শুধু গড়ে তোলেইনি, আগলে রেখেছে সারা জীবন
রোসারিও তাঁর ব্যক্তিজীবনেরও একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে। এখানেই ছোটবেলার প্রেম, আন্তোনেলা রোকুজ্জো (Antonela Roccuzzo)। এখানেই তাঁদের বন্ধুত্ব, প্রেম, পরিবার। ২০১৭ সালের তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান রোসারিওকে এনে দিয়েছিল বৈশ্বিক আলো। বিশ্বখ্যাত তারকারা হাজির ছিলেন শহরের বিলাসবহুল হোটেলে—যেন শহরটাই উদ্যাপন করছিল নিজের এক সন্তানের সাফল্য।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর রোসারিওর রাস্তায় যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, তা বুয়েনস আইরেসকেও টেক্কা দিয়েছে। লা বাজাদার বাড়িঘর, নিউওয়েলস স্টেডিয়ামের দেওয়াল, পাড়ার মোড়, এখন সবই মেসির দেওয়ালচিত্রে মোড়া।
ফেরার স্বপ্ন: নিউওয়েলসে শেষবার?
বছরের পর বছর ধরে একটি গুঞ্জন ঘুরে ফিরে আসে, কেরিয়ারের শেষ পর্বে মেসি কি ফিরবেন নিউওয়েলসে? তিনি নিজেও বহুবার বলেছেন, শৈশবের ক্লাবে খেলে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছে আছে। শেষমেশ তিনি গেলেন ইন্টার মায়ামি (Inter Miami)–তে, কিন্তু নিউওয়েলসের লাল-কালো জার্সি মেসির কাছে এক ধরনের শৈশব-স্মৃতি-বন্দনা। রোসারিওবাসীর কাছে এটিই স্বপ্ন- একদিন তাঁদের মাঠে, তাঁদের ছেলের, তাঁদের লিও-র শেষ খেলা দেখা, জাদুটা চোখের সামনে উপলব্ধ করা।
মেসি হয়তো বিশ্বের, কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি গোলের পিছনে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থাকে লা বাজাদার সেই ছোট্ট ছেলে-যার নাম লিওনেল মেসি।