কাল রাতে ইউনাইটেডকে অনেক দিন বাদে ‘নিজেদের মতো’ দেখাল। ফলাফলের জন্য মরিয়া, ধৈর্য ধরে খেলায় উজ্জ্বল রেড ব্রিগেড!

নায়ক ম্যাগুয়ের
শেষ আপডেট: 20 October 2025 13:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখে বড় বড় প্রতিশ্রুতি, মাঠে এলোমেলো খেলা আর ম্যাচ জেতার মুহূর্তে স্নায়ু ভেঙে পড়া—গত কয়েক বছর ধরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হলোগ্রাম একটাই শব্দ: ‘বিপর্যয়’!
গতরাতে এর উলটো ছবির দেখা মিলল। আমোরিমের দল ৮৩ মিনিট এগিয়ে গেল, মাঝপথে ধাক্কা খেল, আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই জিতল। চাপ সামলানোর ক্ষমতা, এক গোলে এগিয়ে থাকা, সমতা ফিরলে গা-ছাড়া ভাব, শেষদিকে ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নেওয়া—ইউনাইটেডের গেলপ্ল্যানে অনেকদিন চোখে পড়েনি। কাল রাতে দেখা দিল পাক্কা নব্বই মিনিট।
কোন কায়দায় কিস্তিমাত করল ইউনাইটেড?
প্রথমত, দলের কাঠামো ছিল পরিষ্কার। বল ছাড়া অবস্থায় তারা পাঁচজন দিয়ে ডিফেন্সিভ লাইন বানিয়েছে, উইং-ব্যাক নামিয়ে লিভারপুলের চওড়া আক্রমণ আটকে দিয়েছে। বল পায়ে আসামাত্র তিনজন দিয়ে দ্রুত সামনে উঠেছেন—ব্রুনো বদলেছেন গতি, সেই সঙ্গে সামনে এমন এক ফরোয়ার্ড, যিনি প্রথম টাচে গোলের মুখ খুলে দিতে পারেন।
এহেন সরল পরিকল্পনা সাম্প্রতিক সময়ে ইউনাইটেডে দেখা গিয়েছে কি? কখনও পাসের জঙ্গলে আটকে যাওয়া, কখনও হাঁফাতে হাঁফাতে ক্রমাগত ব্যাক পাস—এসবের ভিড়ে সহজ ফুটবলটাই হারিয়ে গিয়েছিল। অ্যানফিল্ডে আমোরিম সেই বেসিক জায়গায় ফিরেছেন: জায়গা বুঝে প্রেস, জায়গা না থাকলে ব্লক, সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণ।
ব্রুনো ফার্নান্দেজ খেললেন যোগ্য নেতার মতো। অনেকবারই অভিযোগ উঠেছে—পর্তুগিজ তারকা একাই সবকিছু করতে চান। যে কারণে ছন্দ ভাঙে। লিভারপুল ম্যাচে তিনি পরিমিত। কখন দৌড় থামাতে হবে, কখন ফাউল আদায় করে চাপ ভাঙতে হবে, কখন ক্রস দিতে হবে—প্রতি মুহূর্তে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শেষ মুহূর্তে তাঁর বাড়ানো বলেই ম্যাচ মুঠোয় এল।
হ্যারি ম্যাগুয়েরের কথাও আলাদা করে বলা জরুরি। একসময় নেতৃত্ব হারিয়েছেন, সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছেন, ট্রান্সফারের দোরগোড়ায় গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে—তিনিই আজ সাফল্যের নায়ক। এটা কেবল জয়সূচক গোলের গল্প নয়; এক ডিফেন্ডারের ব্যক্তিগত জয়ও বটে! সঠিক সময়ে বল ক্লিয়ার করা, বডি-শেপ ঠিক রাখা, লাইন টেনে দলকে ওপরে তোলা—সবেতেই সেই লেস্টার সিটির ভিন্টেজ ম্যাগুয়ের। আমোরিমকে যাঁরা ‘ড্রেসিংরুমের আস্থা হারানো কোচ’ বলে ধরে নিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য ম্যাগুয়েরের পারফরম্যান্সই যোগ্য উত্তর—কোচের পরিকল্পনা বিশ্বাস করতে চাইলে, দলে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়া যায়।
আমোরিম বড়সড় বদল আনতে ভয় পাননি। লিভারপুল যখন দ্বিতীয়ার্ধে গতি বাড়াল, তিনি ব্যাকলাইন আরও ঘন করেছেন, উইং-প্রটেকশনে বাড়িয়েছেন, আর কাউন্টার আক্রমণে ট্রিগার বেঁধেছেন—বল কাড়লেই দু’পাশে ছুট, মাঝখানে ব্রুনোর ‘থার্ড ম্যান রান’। এর আগে ইউনাইটেডে মাঝপথে এমন গেম-ম্যানেজমেন্ট বহুবার গোলমাল করেছে—কেউ জানত না কাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে। গতকাল খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর! এবার সামনে ব্রাইটন, ফরেস্ট, টটেনহ্যাম—গত দুই সিজনে এই তিন ম্যাচে ইউনাইটেড একটাও পয়েন্ট জেতেনি। তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
কিন্তু কী করলে ধারাবাহিকতা আসবে?
এক, একই ‘আউট-অফ-পজেশন’ ডিসিপ্লিন ধরে রাখা। অ্যানফিল্ডে যে ২০-২৫ মিটারের কম্প্যাক্টনেস দেখা গেছে, সেটাই ইউনাইটেডের নোঙর। ব্রাইটনের মতো বল-প্রধান দলকে আটকানোর এটাই প্রথম শর্ত। লাইন ভাঙলে বিপদ। তাই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মধ্যে দূরত্ব কম, ফুল-ব্যাক ও সেন্টার-ব্যাকের যোগাযোগ টানটান—এই মন্ত্র জপে যেতে হবে।
দুই, আক্রমণে ‘ট্রান্সিশন’ধারালো থাকা প্রয়োজন। বল কাড়ার পর তিন পাসে বক্সে—এটাই আমোরিমের খেলার প্রাণ। এর জন্য ব্রুনোর পাশে আরও এক ‘রানার’ লাগবে, যে ডিফেন্সের পেছনে গিয়ে জায়গা বানাবে। অ্যানফিল্ডে সেটা কাজ দারুণভাবে হয়েছে। তবে প্রতিপক্ষ যদি নিচে বসে থাকে, তখন ধৈর্য নিয়ে থার্ড-ম্যান কম্বিনেশন, ফ্ল্যাট ক্রস, কট-ব্যাক—এই বেসিকগুলো অনুশীলনে বারবার রিহার্স করা দরকার।
তিন, স্কোয়াড-ম্যানেজমেন্ট। ৩৫ ম্যাচের চাপ, চোট, সাসপেনশন—সব মিলিয়ে একাদশ অপরিবর্তিত রাখা যাবে না। কিন্তু নীতি স্পষ্ট হলে পরিবর্তনে ক্ষতি নেই। কে ‘বিল্ড-আপ’-এ নামবে, কে ‘প্রেস ট্রিগার’-এ প্রথম ছুটবে, কে শেষ দশ মিনিটে সেট-পিসের লক্ষ্য হবে—এই সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে স্পষ্টতা থাকলে রোটেশন সফল হয়। অ্যানফিল্ডে সেট-পিস থেকেই গোল এসেছে—যা আমোরিমের পরিকল্পনাকে আত্মবিশ্বাস নিশ্চিতভাবে দেবে।
চার, অযথা কথার লড়াই নয়, মাঠের কাজে ফেরা। ম্যানেজারের মুখে ‘স্টর্ম ইজ কামিং’—এই ধরনের চটুল স্টেটমেন্ট এক-আধবার ভালো শোনায়, কিন্তু বারবার বললে বুমেরাং হতে পারে। অ্যানফিল্ডের পর আমোরিম যে নীরব অবস্থান নিয়েছেন… ‘আজ ভালো খেলছ ঠিকই, কিন্তু কাল কাজে ফিরতে হবে!’—এটাই জারি থাকা উচিত। কারণ এই ড্রেসিংরুমই অনেক বছর ধরে বৃথা আশা দেখেছে। এবার অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি নয়, নিয়মিত কাজ চাই।
পাঁচ, সিনিয়রদের মানসিকতা কাজে লাগানো। তাঁরা যদি মাঠে শান্ত থাকে, তরুণরাও রাস্তা খুঁজে নেয়। ম্যাগুয়েরের গল্পটা এমনই—ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় সামলে আজ দলের ঢাল। ব্রুনো বিতর্কিত কথা কমিয়ে ফুটবলে বেশি মন দিয়েছেন।
ছয়, সমর্থকদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক। ইউনাইটেডের গ্যালারি গত ক’বছর অগুনতি বিপর্যয়ের সাক্ষী—অলীক প্রতিশ্রুতি, টুর্নামেন্টের মাঝপথে ভেঙে পড়া, হঠাৎ লিগ-টু দলের কাছে অপমানজনক হার… বাদ নেই কিছুই। অ্যানফিল্ডের জয় তাদের পায়ের তলার হারানো জমি ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পূর্ণ আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। এখানে ক্লাবের নতুন মালিকদের রূপরেখাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা স্পষ্ট হলে মাঠের সিদ্ধান্তও ঠিক পথে এগোয়।
কাল রাতে ইউনাইটেডকে অনেক দিন বাদে ‘নিজেদের মতো’ দেখাল। ফলাফলের জন্য মরিয়া, ধৈর্য ধরে খেলায় উজ্জ্বল রেড ব্রিগেড! এই দল আগে এক গোল খেলে এলোমেলো হয়ে যেত। লিভারপুল গত রাতে সমতা ফিরিয়েছে। তবু ব্রুনোরা গুটিয়ে যাননি। এটাই পরিণতি। তাই অ্যানফিল্ড-জয়কে ‘অলৌকিক রাত’ বললে ভুল হবে। এটা পরিকল্পিত, শ্রমসাধ্য, ছোট ছোট সিদ্ধান্তে গড়া সাফল্য। ভাগ্য সাহায্য করেছে, ঠিক; কিন্তু ভাগ্য সাধারণত সেই দলের পাশেই থাকে যারা নিজের কাজ ঠিকঠাক করে।