নস্টালজিয়া মানেই পিছনে তাকানো—এটা নিয়ে চালু বিতর্ক ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু পৃথিবী যখন ধ্বংসের মুখোমুখি, তখন খাতার পাতায় লুকনো ফুলের পাপড়িটুকু আলতো করে হাতের তালুতে মেলে যদি কেউ মুচকি হেসে ওঠে… উঠুক না… তাতে দোষ কী?

ট্রেফয়েল জার্সি
শেষ আপডেট: 20 March 2026 14:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,/ চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য/ কাঠাফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’
‘মে-দিনের কবিতা’র শুরুতেই এমন কিছু পঙক্তি লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সেই ১৯৪০ সালে। ২০২৬-এ এসেও কথাগুলো বদলেছে কি এতটুকু? দেশ দেশ দখল করছে, রাষ্ট্রনায়কের তর্জনিতে পুড়ে ছাই ইমারত। মাঠে হাত মেলাতে অস্বীকার করছে পড়শি দেশের খেলোয়াড়, ‘প্রাণের ভয় থাকলে খেলতে এসো না’—ইশারায় হুমকি ছুড়ে দিচ্ছেন অধিপতি কেউ কেউ!
এতকিছুর পরেও ফুল ফোটে, হাতে হাতে ঘোরে, মাঠে জমে ওঠে খেলা… উজ্জ্বল ড্রিবলিং কিংবা চতুর ইনসাইড-ডজে বুদ্ধিদীপ্ত মুভ… সেও তো শতপুষ্পের বিকশিত হয়ে ওঠা!
ময়দানের সপ্রাণ-সতেজ এই লড়াইকে যুদ্ধদীর্ণ অসুখী সময়েও কুর্নিশ জানাতেই হয়তো অ্যাডিডাস সামনে আনল বিশেষ লোগো। যার মোটিফে উজ্জ্বল তিন পাপড়ির ফুল! পোশাকি নাম ‘ট্রেফয়েল’। অ্যাডিডাসের (Adidas) ঘোষণা, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) তাদের বিখ্যাত লোগো কিঞ্চিৎ নস্টালজিয়া উসকেই কামব্যাক করছে… পাক্কা ৩৬ বছর পর! শেষবার বিশ্বমঞ্চে একে দেখা গিয়েছিল ১৯৯০ সালে, ইতালিতে।

ট্রেফয়েল কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যাডিডাসের তিন পাপড়িওয়ালা ফুলের এই লোগোটি ১৯৭০-৮০-এর দশকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শুধু খেলাধুলো নয়—রাজনীতির ক্যাম্পেন থেকে শুরু করে পপ সংস্কৃতি… সর্বত্র জড়িয়ে ট্রেফয়েল। ১৯৯০-এর শুরুতে অ্যাডিডাস নকশা বদলে তির্যক তিনটি ডোরার দিকে চলে যায়। সেই থেকে পূর্বজ লোগো মূলত রেট্রো পণ্যে সীমাবদ্ধ।
এবার বিশ্বকাপের ২৫টি দেশের অ্যাওয়ে জার্সিতে ট্রেফয়েল—যার মধ্যে ১২টি টিম ইতিমধ্যে বিশ্বকাপে জায়গা পেয়েছে, আরও কেউ কেউ প্লে-অফের মাধ্যমে আসতে পারে।

১৯৯০ বিশ্বকাপের স্মৃতি
১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপ (1990 Italy World Cup) ফুটবলের ইতিহাসে একটু আলাদা। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে কম গোলের বিশ্বকাপ। খেলার মান নিয়েও যথেচ্ছ সমালোচিত। এমনকি এই টুর্নামেন্টের পরেই ফিফাকে একগুচ্ছ নিয়ম বদলাতে হয়। যার অন্যতম: গোলকিপারের ব্যাক পাস ধরার অনুমতি বাতিল, দু’পয়েন্টের বদলে ম্যাচ জিতলে তিন পয়েন্ট চালু করা।
এমনতরো সমালোচনা আর নিন্দাবাদ সত্ত্বেও নব্বইয়ের বিশ্বকাপের স্মৃতি অমলিন তার অনুপম, অপরূপ উপস্থাপনার জন্য। ইতালির বর্ণোচ্ছ্বল, রোদেলা স্টেডিয়াম, টেলিভিশনের গ্রাফিক্স, ট্রফির আকৃতিতে তৈরি ওয়াইনের বোতল… সব মিলিয়ে জমে ফুটবল যুদ্ধে মিশে যায় কার্নিভালের সুর। বিশ্বকাপের জার্সিগুলোও রংদার। এখনও ডিজাইনের মাস্টারপিস হিসেবে বাজারে চড়া দামে বিকোয়। পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্তিনা (Argentina), কলম্বিয়া, ক্যামেরুন, আয়ারল্যান্ড, সুইডেনের জার্সির মার্কেটে একচ্ছত্র আধিপত্য। যেখানে লক্ষ্যণীয়, দল যাই হোক, খেলোয়াড় বদলে যাক, পালটে যাক ডিজাইন… তবু প্রতিটিতে শোভমান সেই ছোট্ট ট্রেফয়েল! ঠিক যেন রাতের আকাশে উজ্জ্বলতম শুকতারা!
এবারের জার্সিগুলো কেমন?
২০২৬ বিশ্বকাপের অ্যাওয়ে জার্সিগুলো মোটের উপর চমৎকার। জাপানের বহুরঙা সরু ডোরা, চিলির চেরি ফুলের অনুপ্রেরণায় তৈরি নকশা, বেলজিয়ামের রেনে ম্যাগ্রিত অনুপ্রাণিত গোলাপি-নীলের মিশেল—প্রত্যেকটি আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

ফুটবলের দৃশ্যগত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনও পুরনো বিশ্বকাপের একটা ছবি দেখালে অভিজ্ঞ ভক্ত বলে দিতে পারবেন কোন বছরের—স্রেফ স্টেডিয়াম, বল, ক্যামেরার কোণ বা জার্সি দেখে! সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে সেই বৈচিত্র্য কমে গিয়েছিল। ট্রেফয়েলের কামব্যাক সেই একঘেয়েমিতে এক আঁজলা টাটকা বাতাস।
সবাই যে আপ্লুত এমন নয়। নস্টালজিয়া মানেই পিছনে তাকানো—এটা নিয়ে চালু বিতর্ক ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু পৃথিবী যখন ধ্বংসের মুখোমুখি, তখন খাতার পাতায় লুকনো ফুলের পাপড়িটুকু আলতো করে হাতের তালুতে মেলে যদি কেউ মুচকি হেসে ওঠে… উঠুক না… তাতে দোষ কী?