নিয়ম কি সত্যিই তরুণ ফুটবলারদের দেশে ধরে রাখতে পারবে? নাকি ইউরোপের বড় ক্লাবের মোটা চুক্তির সামনে জাতীয় দলের স্বপ্নই তুচ্ছ হয়ে যাবে?

লিও মেসি
শেষ আপডেট: 9 February 2026 13:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভাবুন তো—আজকের লিওনেল মেসি (Lionel Messi) যদি কিশোর বয়সে স্পেন না যেতেন, তাহলে কী হত? আবার উল্টো করেও চিন্তা করুন—আর্জেন্তিনা ফুটবল সংস্থার নতুন নিয়ম যদি তখন বলবৎ থাকত, তাহলে কি জাতীয় দলে খেলতে পারতেন মেসি? এই দুই প্রশ্নই এখন বিশ্বফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রে।
সম্প্রতি আর্জেন্তিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (Argentine Football Association), সংক্ষেপে এএফএ (AFA) একটি নয়া নীতি অনুমোদন করেছে। নিয়মটা শুনতে সহজ, কিন্তু প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এই নিয়ম মোতাবেক: যে ফুটবলার আর্জেন্তিনার কোনও ক্লাবে পেশাদার চুক্তি সই না করে বিদেশে চলে যাবে, সে আর জাতীয় দলে ডাক পাবে না।
নতুন নিয়ম কী বলছে?
আর্জেন্তিনায় একজন ফুটবলার ১৬ বছর বয়সে পেশাদার চুক্তি করতে পারে। কিন্তু দেশের আইনে রয়েছে একটি বিশেষ ধারা—‘পাত্রিয়া পোতেস্তাদ’ (patria potestad)। যার সারমর্ম: ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের কেরিয়ার সংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে একমাত্র অভিভাবকদের হাতে। কোনও ফুটবলার যদি নিজের ক্লাবের সঙ্গে পেশাদার চুক্তি না করে বিদেশে চলে যায়, তাহলে ক্লাবের জোটে সামান্য ট্রেনিং কম্পেনসেশন। বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফি আসে না। ফলে বছরের পর বছর একজন প্রতিভাকে গড়ে তোলার পর ক্লাবের কপালে স্রেফ লোকসান।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই এএফএ বলছে—
👉 আগে দেশের ক্লাবে পেশাদার চুক্তি সই করো।
👉 তারপর বিদেশে যাও।
👉 না হলে জাতীয় দলে সুযোগ নেই।
সাফ বক্তব্য, ‘দলগুলির স্বার্থ রক্ষার জন্য সর্বসম্মতভাবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে!’
কেন এই সিদ্ধান্ত?
নিয়মের পেছনে রয়েছে একাধিক ঘটনা। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ লুকাস স্কারলাতো (Lucas Scarlato)। ১৬ বছরের এই মিডফিল্ডার রিভার প্লেট (River Plate) ছেড়ে ইতালির পার্মা (Parma) ক্লাবে যোগ দেন, কোনও পেশাদার চুক্তি না করেই। এরপর রিভারের যুব ফুটবলের ডিরেক্টর গাব্রিয়েল রদ্রিগেজ (Gabriel Rodriguez) প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেন। অভিযোগ, এজেন্টরা নিজেদের লাভের কথা ভেবে ক্লাবের ক্ষতি করছেন।
এখানেই পুরনো ক্ষত উসকে উঠেছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে—১৩ বছর বয়সে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ (Newell’s Old Boys) ছেড়ে বার্সেলোনা (Barcelona)-তে যোগ দেন লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। তখনও কোনও পেশাদার চুক্তি ছিল না। আজকের নিয়ম থাকলে, মেসিও আর্জেন্তিনার জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা হারাতেন! সমস্যায় পড়তেন বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজও (Emiliano Martinez), যিনি কিশোর বয়সে ইনডিপেন্ডিয়েন্তে (Independiente) ছেড়ে আর্সেনালে (Arsenal) পা বাড়ান।
নিয়ম আইনসিদ্ধ? ভবিষ্যৎ কী?
আইনি দিক থেকে বিষয়টি বেশ জটিল হলেও অবৈধ নয়। ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞ স্যামুয়েল কাথবার্টের (Samuel Cuthbert) ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফিফা (FIFA) জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতার মৌলিক নিয়ম ঠিক করে দেয়, কিন্তু কোনও দেশের ফুটবল সংস্থা কাকে ডাকবে বা ডাকবে না—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরই। অর্থাৎ, এএফএ চাইলে এই নীতি চালু রাখতে পারে। ইংল্যান্ড রাগবিতে (England Rugby) এমন নীতি বহু বছর ধরে চালু।
তবে বড় প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—নিয়ম কি সত্যিই তরুণ ফুটবলারদের দেশে ধরে রাখতে পারবে? নাকি ইউরোপের বড় ক্লাবের মোটা চুক্তির সামনে জাতীয় দলের স্বপ্নই তুচ্ছ হয়ে যাবে? জবাব যাই হোক, একটা বিষয় নিশ্চিত—এই সিদ্ধান্ত শুধু আর্জেন্তিনার নয়, গোটা বিশ্ব ফুটবলের নজর কাড়ছে। কারণ, যদি এই মডেল সফল হয়, সেক্ষেত্রে অন্য দেশও একই পথে হাঁটতে পারে। তখন হয়তো ভবিষ্যতের কোনও ‘মেসি’-কে আগে দেশের মাঠে নিজেকে প্রমাণ করে তারপর বিশ্বমঞ্চে পা রাখতে হবে।