দোষ শুধু আঘাতের নয়। নেইমারের অসংযমী জীবনযাপনকেও অনেকে আতসকাচের তলায় রাখতে চান। জন্মদিনের পার্টি, অফ-সিজনের উৎসব, শৃঙ্খলার অভাব—পেশাদারিত্বের দিক থেকে তিনি কখনওই রোনাল্ডো বা মেসির ধারেকাছে নন।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 19 August 2025 16:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেই যবে ব্রাজিলকে ঘরের মাঠে চুরমার করল জার্মানি, তাও বিশ্বকাপের মঞ্চে, নেইমার জানতেন, এটা বিপর্যয়। কিন্তু হাতে সময় আছে। ঈশ্বর খালি হাতে, রিক্ত বেশে ফেরাবেন না। মঞ্চ যাই হোক, কোনও না কোনও দিন বদলা নেওয়ার সুযোগ মিলবে।
সুযোগ এসেছিল। বিশ্বকাপে নয়। অলিম্পিক্সে। ফাইনালে সামনে সেই জার্মানি। যাদের হাতে সাত গোল হজম করতে হয়েছিল। আর ভুল করেননি নেইমার। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মাঠে ছিলেন না। কিন্তু সেবার শুরু থেকে ময়দানে। শেষ কিকটাও তিনিই নেন। জয়সূচক গোল। আর তাতেই খেতাব ওঠে ব্রাজিলের হাতে! ফের কান্না। হাঁটুমুড়ে বসে পড়েন নেইমার। চোখের কোণ ছাপিয়ে ঝরে পড়ে জল। এ কান্না আনন্দের, বিজয়ের, প্রতিশোধের!
গত পরশু ফের একবার নেইমারের চোখে জল। ব্রাজিল জাতীয় দলের নয়, তিনি কেরিয়ারের প্রান্তবেলায় খেলছেন ছেলেবেলার ক্লাব স্যান্টোসের হয়ে। সেই সাদা জার্সি। যা গায়ে গলিয়ে কৈশোরে দুনিয়ার নজর কেড়েছিলেন। তাঁর ড্রিবলিং গ্যারিঞ্চার মতো, ফিনিশিংয়ে পেলের স্পষ্ট ছাপ—আওয়াজটা জোরদার হচ্ছিল ক্রমশ! তারপরই তো বার্সেলোনায় চলে যাওয়া, স্পেন বিজয়, ইউরোপ শাসন।
সেই নেইমারই কিনা এখন খেলছেন এমন ক্লাবে, যারা অবনমন ঠেকাতে লড়ে যাচ্ছে, নামছেন এমন সতীর্থদের সঙ্গে, যারা নির্বিকারে ছ’গোল হজম করছে। ভাস্কো-দা-গামার বিরুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর যখন কেঁদে ভাসালেন নেইমার, তাঁর কি মনে পড়ছিল লিওনেল মেসির কথা? উসকে উঠছিল বার্সেলোনা জার্সির গন্ধ? ব্রাজিলের জয়ে বিশ্বশাসনের অদম্য স্বপ্নটাও কি জেগে উঠছিল থেকে থেকে?
জার্মানির হাতে বিধ্বস্ত হওয়ার পর নেইমার জানতেন, তিনি সময় পাবেন। গত পরশু হারের ধাক্কা সামলাতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমার জানেন, এবার হাতে সময় নেই। তিনি চাইলেও কামব্যাক করতে পারবেন না। কোনও ক্লাব তাঁর জন্য ব্ল্যাঙ্ক চেক সাজিয়ে বসে নেই। কোনও দলের ম্যানেজার আর তাঁকে ‘টপ ট্রান্সফার টার্গেট’ ভাবেন না!
ড্রেসিং রুমে নয়, খাস ময়দানে, ভরা গ্যালারির সামনে চোখের জলে বিস্রস্ত নেইমার, মাঠেই বসে পড়লেন--দৃশ্যটা প্রতীকী। এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নায়কের পতনের প্রতীক। একদা ইউরোপ শাসন করা বার্সেলোনার মহাতারকা, আজ ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে দিশেহারা। কেন এমন হল? এই পরিণতিই কি অবধারিত ছিল?
নেইমারের গল্পের শুরুটা রূপকথার মতো। কিশোর বয়সেই আলো ছড়ানো। ২০১১ সালে স্যান্টোসকে এনে দিলেন কোপা লিবার্তাদোরেস। কারও চোখে গ্যারিঞ্চা, কারও নজরে মারাদোনার ড্রিবলিং, রোনাল্ডিনহোর ঝলক আর পেলের উত্তরসূরি হিসেবে নতুন নক্ষত্র জন্ম নিল সেই দিন। ইউরোপ ডাক পাঠাল। বার্সেলোনায় গিয়ে মেসি-সুয়ারেজের সঙ্গে গড়লেন ‘এমএসএন’—বিগত প্রজন্মের সেরা আক্রমণত্রয়ী। ২০১৫ সালে বার্সার ট্রেবল জয়, নেইমারের দুরন্ত গোল, অপ্রতিরোধ্য গতি—সবই জানান দিচ্ছিল, মেসি-রোনাল্ডোর পর ফুটবলের নয়া সম্রাট উঠে আসেছেন।
কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল অন্য পথে। ২০১৭-তে রেকর্ড ভেঙে ২২২ মিলিয়ন ইউরোয় পিএসজিতে যোগ দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ‘মেসির ছায়া’থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সাম্রাজ্য গড়া। কাগজে-কলমে নেতা বটে। কিন্তু বাস্তবে পিএসজির জৌলুস হয়ে দাঁড়াল ‘তারকা প্রদর্শনী’। ফরাসি লিগ জিতলেন, গোল করলেন, কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ অধরা। ২০২০-এর ফাইনালে হোঁচট। ইউরোপ জিততে না পারার ক্ষত ক্রমশ গভীর হতে থাকল।
ঠিক তখনই হানা দিল চোটের অভিশাপ। হাঁটু, গোড়ালি, পেশি—প্রায় প্রতি মরশুমেই অন্তত তিন মাস সাইডলাইনে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। সাত বছরে পিএসজির হয়ে ১৭৩ ম্যাচ খেললেন, অথচ সম্ভাব্য ম্যাচ ছিল তিনশোরও বেশি। যার অর্থ: অর্ধেক সময়ই মাঠে অনুপস্থিত নেইমার। শুয়ে রইলেন চিকিৎসকের টেবিলে।
কিন্তু দোষ শুধু আঘাতের নয়। নেইমারের অসংযমী জীবনযাপনকেও অনেকে আতসকাচের তলায় রাখতে চান। জন্মদিনের পার্টি, অফ-সিজনের উৎসব, শৃঙ্খলার অভাব—পেশাদারিত্বের দিক থেকে তিনি কখনওই রোনাল্ডো বা মেসির ধারেকাছে নন। প্রতিভা ছিল, কিন্তু তা শান দিতে হলে যে কঠিন তপস্যা দরকার, নেইমার সেটা বেছে নেননি। ফলে রয়ে গেছেন এক ‘অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি’ হয়ে।
২০২৩ সালে শুরু সৌদি অধ্যায়। নতুন জার্নি, ছবিটা সেই একই! আল-হিলালের হয়ে নামেমাত্র কয়েকটি ম্যাচ, বাকিটা চোটে কেটে গেল। টাকা পেলেন। কিন্তু মর্যাদা? হয়তো তারই খোঁজে ঘরে ফেরা। নাম লেখালেন স্যান্টোসে। সমর্থকেরা ভেবেছিল, হয়তো সেই পুরোনো নেইমার ফিরে আসবেন। কিন্তু ততদিনে তাঁর পায়ের আগুন উধাও! ভাস্কো-দা-মারের বিরুদ্ধে ছ’গোল হজম করার পর নেইমারের চোখের জল তাই কেবল এক পরাজয় নয়, এক করুণ ভাগ্যবঞ্চনার প্রতীক।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—এমনই কি হওয়ার ছিল? যদি বার্সেলোনায় রয়ে যেতেন? যদি পিএসজিতে চোটমুক্ত থাকতেন? আরও পেশাদার হয়ে উঠতেন? হয়তো ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত। হয়তো আজও তিনি ইউরোপের সেরা দশে জায়গা পেতেন।
পরিসংখ্যান কিন্তু এখনও উজ্জ্বল। ব্রাজিল জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। বিশ্বকাপে গোল করেছেন, অলিম্পিক সোনা এনেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ—সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাঁর হাত শূন্য। ফুটবলের ইতিহাস বড় নির্দয়। বড় মঞ্চে পারফরম্যান্স দিয়েই মহাতারকাদের বিচার করে। আর সেখানেই নেইমার পিছিয়ে।
তাঁর কাহিনি আধুনিক ফুটবলের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। অসীম প্রতিভা, দৃষ্টিনন্দন শৈলী সত্ত্বেও পরিণতি অসমাপ্ত। অসম্পূর্ণ এক মহাকাব্যের চরিত্র নেইমার। ভাগ্যবিড়ম্বিত রাজপুত্র, যিনি চাইলেও আর রাজা হতে পারবেন না।