মুসোলিনি ফিরলেন। তবে নায়কের বেশে নয়। ফুটবলারের জার্সিতে!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 30 June 2025 15:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুসোলিনি ফিরলেন। তবে নায়কের বেশে নয়। ফুটবলারের জার্সিতে!
ফ্লোরিয়ানি মুসোলিনি, ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনির প্রপৌত্রকে ফিরিয়ে আনল সিরি আ ক্লাব লাজিও। গত বছর লোনে সিরি বি ক্লাব জুভে স্টাবিয়ায় যোগ দেন। রাইট ব্যাক পজিশনে ভাল পারফরম্যান্স দেখানোয় ফ্লোরিয়ানিকে স্কোয়াডে রাখার চিন্তাভাবনা শুরু হয়। আগামী মরশুম শুরু হতে এখনও কয়েক মাস বাকি। কিন্তু প্রস্তুতি ম্যাচ ও ট্রেনিং সেশনে সড়গড় করে রাখার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকদিন আগেই ডেকে পাঠাল রোমের শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে লাজিওতে যোগ দেন মুসোলিনি। কিন্তু সে বছর একটি ম্যাচেও মাঠে নামেননি। পরের সিজনে চলে যান পেস্কারায়। খেলেন ৩২টি ম্যাচ। তারপর লাজিওয় ফিরলেও ফের একবার লোনে পাঠানো হয়।
জুভে স্টাবিয়ায় প্রথম একাদশে নিজের জায়গা পাকা করেন মুসোলিনি। ঘরোয়া ও নক আউট প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সাকুল্যে ৩৭টি ম্যাচ খেলেন। রাইট ব্যাক হলেও একটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন। এই পারফরম্যান্সের সুবাদে জুভে পাকাপাকিভাবে সই করানোর চেষ্টা চালালেও লাজিও সায় দেয়নি। মরশুম আরম্ভ হওয়ার আগেই ডেকে পাঠিয়েছে। যার অর্থ, আগামী মরশুমে রোমা ডার্বিতে মাঠে নামবেন মুসোলিনি, খেলবেন জুভেন্তাস, মিলান, আটালান্টার মতো হেভিওয়েট ক্লাবের বিরুদ্ধে!
প্রসঙ্গত, এই খবর চাউর হওয়ামাত্র ফুটবলের সঙ্গে বেনিতো মুসোলিনির প্রছন্ন যোগ ফের নতুন করে সামনে এসেছে। সেই মুসোলিনি, যিনি ফুটবলকে শুধু একটি জনপ্রিয় খেলা হিসেবে দেখেননি, বরং একে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করেছেন। মুসোলিনি বুঝেছিলেন—এই খেলার সঙ্গে সাধারণ মানুষের আবেগ জড়িয়ে। তাই ফুটবলকে নিজের ফ্যাসিবাদী আদর্শ প্রচারের একটি সূক্ষ্ম কৌশল হিসেবে কাজে লাগান।
তাঁর শাসনকালে ইতালি ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করে, চ্যাম্পিয়ন হয়। এই স্বীকৃতি কেবল ‘ময়দানি যুদ্ধজয়’ নয়, হয়ে ওঠে কূটনৈতিক সাফল্য। অনেকের মতে, বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্তটাই ছিল আদ্যন্ত ‘রাজনৈতিক’। ইতালির সমস্ত ম্যাচে সরাসরি সরাসরি নাক গলান মুসোলিনি। ফাইনালে রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক আজও মোছেনি। জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও কোচের উদ্দেশে কট্টর একনায়ক মুসোলিনির বার্তা ছিল সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট: যে কোনও মূল্যে জিততেই হবে।
শুধু চৌত্রিশের বিশ্বকাপ নয়, ইতালির ক্লাব ফুটবলেও আকছার হস্তক্ষেপ করতেন ইতালির সর্বাধিনায়ক! খেলাধুলোর মধ্যে বিশেষ করে ফুটবলকে ‘নতুন ইতালির প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। রাজনৈতিক বক্তৃতায় হামেশাই খেলোয়াড়দের ‘শৃঙ্খলা, শক্তি এবং দেশপ্রেমে’র প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতেন। জাতীয় ফুটবল দলের সাফল্য হয়ে ওঠে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম এজেন্ডা!
ঐতিহাসিকদের মতে, ইন্টার মিলান বা Internazionale ক্লাবের নাম মুসোলিনির নির্দেশেই একসময় বদলে রাখা হয় ‘Ambrosiana’। ‘ইন্টারনেশনাল’ শব্দটি ছিল নাপসন্দ। একে ফ্যাসিবাদী আদর্শের পরিপন্থী বলে মনে করতেন। শুধু তাই নয়। মুসোলিনির অঙ্গুলিহেলনেই ফ্যাসিবাদী ভাবধারা প্রচারের উদ্দেশ্যে ইতালির সমস্ত প্রধান দলে সরকার-সমর্থিত কেষ্টুবিষ্টুদের বসানো হত।
আর এই আবহে বিশ ও তিরিশের দশকে, মুসোলিনির ভাবাদর্শে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ফুটবল ক্লাব লাজিওর মাখামাখি শুরু। ১৯০০ সালে গোড়াপত্তন। আর এর ২৭ বছর বাদে কার্যত মুসোলিনির নির্দেশেই রোমের সমস্ত ছোট ছোট ক্লাবকে একত্র করে একটি বড় দল গড়ে তোলা হয়। জন্ম নেয় এএস রোমা! লাজিও এই সংযুক্তিকরণে অংশ না নিলেও প্রতীক হিসেবে বেছে নেয় ‘ইগল’ (Aquila)। যা তাত্ত্বিকদের চোখে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সামরিক প্রতীক, পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট ইতালির স্মারকচিহ্ন।
মুসোলিনি ও তাঁর দল জাতীয় ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্লাবের গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষের বিষবৃক্ষ আজও ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে। নয়ের দশক থেকেই লাজিওর কিছু সমর্থকগোষ্ঠী (বিশেষ করে Irriducibili) প্রকাশ্যে মুসোলিনির ছবি, নাৎসি প্রতীক নিয়ে স্টেডিয়ামে হাজির হতে শুরু করে। ২০১৭ সালে হলকাস্টে বেঁচে যাওয়া কিশোরী আনা ফ্র্যাঙ্কের ছবি বিকৃত করে বিদ্রূপের মোড়কে রোমের স্টেডিয়ামে উড়িয়েছিল লাজিওর ডানপন্থী সমর্থক সংগঠন। ২০০৫-এ পাওলো ডি কানিও একটি ম্যাচে গোল করে মুসোলিনির সম্মানসূচক ‘রোমান স্যালুট’ দেন।
ফ্লোরিয়ানও কি লাজিওয় ফিরে বেনিতোর রক্তবীজ হয়ে উঠবেন? উত্তরটা আসন্ন মরশুমেই মিলতে চলেছে।