রোনাল্ডোর অহং আসলে জ্বালানি। বিতর্কই তাঁর ব্যাটারি। তিনি বুঝে গেছেন, চাপকে ভয় পেলে জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যায়, আর তাকেই আলিঙ্গন করলে লঞ্চপ্যাড!
.jpeg.webp)
রোনাল্ডো
শেষ আপডেট: 7 November 2025 18:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যেন আজব কোনও কারখানায় তৈরি জৈবপ্রযুক্তি প্রকল্প—যেখানে অহং, পরিশ্রম আর আত্মপ্রচার মিলেমিশে গিয়ে তৈরি করেছে এক ‘অ-ভূতপূর্ব’ মেশিন! যিনি পোশাকি ভাষায় খেলোয়াড়। কিন্তু স্রেফ বল পায়ে রেকর্ড গড়ে নয়, নিজের সীমাকে বারবার প্রসারিত করেন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে!
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এক আশ্চর্য বস্তু! তার কারণ, কথায় যেমন বাঘ মারেন, তেমনই মাঠে নেমে প্রতিপক্ষকে ঘোল খাওয়ান৷ দুইয়ে মিলে ধরা দেয় খেতাব জেতার অদ্ভুত খিদে, রেকর্ড গড়ার অদম্য নেশা!
প্রতিভাবান খেলুড়ের অভাব নেই৷ তাঁদের সিংহভাগ পর্দার আড়ালে থেকে তির মারেন। লিপ্ত থাকেন কঠোর ট্রেনিংয়ে। বয়সকে বশ মানিয়ে খেলে যান৷ জিদান থেকে মেসি হয়ে নাদাল, ফেডেরার, সচিন তেন্ডুলকর। সব্বাই চ্যাম্পিয়ন৷ সব্বাই প্রতিভাবান৷ সব্বাই পরিশ্রমী৷
কিন্তু রোনাল্ডো আলাদা হয়ে যান তাঁর বাচনে, বয়ানে৷ অদ্ভুতভাবে নিজেকে সুউচ্চে তুলে ধরেন। বাকিদের থেকে নিজেকে আলাদা করে নেন। স্বঘোষিত দম্ভে! মেসি ভাল, কিন্তু আমার মতো নয়৷ বেকহ্যাম সুশ্রী, কিন্তু সেটা মুখশ্রীটুকু। আমি সর্বাঙ্গসুন্দর৷
কিন্তু এভাবে বিতর্ক ঘনিয়ে তোলা, বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে জেনেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য—এগুলো তো চাপ সৃষ্টি করে! আর সবাই যখন নিজেকে পারলে মিডিয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখেন, সেখানে রোনাল্ডো কেন নিজেকে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে দেন? আড়ালে কোন মনস্তত্ত্ব? এভাবে আগুন জ্বালিয়ে কি অ্যাড্রিনাল ক্ষরণ হয়? নিজেকে আরও চাগাড় দিয়ে তুলতে পারেন? আরেকটু প্রাণিত, উজ্জীবিত হন? কোন ছক কষে এ পথে হাঁটেন রোনাল্ডো?
আসলে পর্তুগিজ তারকা বিলক্ষণ জানেন, তিনি দর্শকের চোখে শুধু ফুটবলার নন—একটা আস্ত ব্র্যান্ড। তাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি এমনভাবে পরিকল্পিত, যেন তা একটা বার্তা বয়ে আনে। মোদ্দা সারাৎসার হচ্ছে: ‘আমি এখনও এখানে আছি, আমি এখনও সেরা!’
যে কারণে অনেকের নজরে, রোনাল্ডো অতিরিক্ত আত্মম্ভরী। তিনি নিজের প্রশংসা করেন, সর্বকালের সেরা বলে দাবি করেন আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বসান উচ্চ আসনে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায়, এই আচরণ অহং নয়, এক ‘অচেতন ড্রাইভ’—নিজেকে চাপের মধ্যে রেখে উদ্দীপিত করার সুচতুর কৌশল।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে রোনাল্ডো ‘সেলফ-স্টিমুলেশন মেকানিজম’ (‘self-stimulation mechanism’)-এর চূড়ান্ত উদাহরণ। প্রতিবার যখন বলেন ‘আমি সেরা’, তখন সেই বক্তব্যই তাঁর শরীরে অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নিজেকে এমন উচ্চতার দাবিতে বেঁধে রাখলে, ব্যর্থ হওয়ার ভয় আরও বাড়ে। আর সেই আতঙ্কই চালনা করে তাঁকে।
যেখানে অনেক তারকা চাপের মুহূর্তে মুখ বন্ধ রাখেন, রোনাল্ডো সেখানে কথা বলেন। তা আক্রমণাত্মক হোক বা বিতর্কিত, নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করতে ভয় পান না এতটুকু। এটাই তাঁর থেরাপি। মনোবিজ্ঞান বলে, নিজের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসকে প্রকাশ করা মানুষকে বাস্তবতাকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করে। রোনাল্ডোও ঠিক তাই করেন—যখন বলেন ‘আমি অমুকের চেয়ে এগিয়ে’, আসলে তিনি নিজের মস্তিষ্ককেই পুনরায় প্রোগ্রাম করেন, আত্মবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেন।
কখনও মেসির নাম সরাসরি না বললেও, রোনাল্ডোর কথার প্রতিটি ছত্রে আর্জেন্তিনীয় তারকার প্রচ্ছন্ন ছায়া। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক নাটক, যা দুজনকেই আরও শানিত হতে সাহায্য করেছে। কিন্তু মেসি যেখানে নীরব, রোনাল্ডো সেখানে উচ্চকিত। তিনি জানেন, জনতার মধ্যে ‘হিরো’ হতে গেলে নিজেকে ‘বিতর্কে’র কেন্দ্রে রাখতে হয়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটা ‘competitive ego-reinforcement’—নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীর অস্তিত্বকে স্বীকার করে তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যবহার করা। মেসি তাঁর আয়না। আর সেই আয়নাতে প্রতিবিম্ব দেখে প্রতিদিন নিজেকে আরও ধারালো করতে থাকেন রোনাল্ডো।
তিনি চাপ থেকে পালান না। বরং চাপকেই ব্যবহার করেন ফিটনেস রেজিমের মতো। প্রতিটি সমালোচনা যেন নতুন প্রোটিন শট! মনস্তত্ত্বে ‘reverse motivation’। অনেকের কাছে সমালোচনা মানে হতাশা, রোনাল্ডোর কাছে তা-ই প্রমাণের সুযোগ। তিনি মানসিকভাবে নিজেকে প্রোগ্রাম করেছেন এমনভাবে, যাতে প্রত্যেকটি ‘নেগেটিভ স্টিমুলাস’ আরও শক্তি জোগায়! এ কারণেই মাঝেমাঝে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে দেখা যায়—সাংবাদিকের সামনে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, এমনকি সতীর্থদের দিকেও। এটা নিছক অহংকার নয়। বরং, চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের শরীর ও মনকে ফোকাসে নিয়ে আসার পদ্ধতি।
রোনাল্ডোর ট্রেনিং রুটিন, খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের প্যাটার্ন—সবই বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে মানসিক শৃঙ্খলা। অনেক সময় তাঁর শরীর নয়, মনটাই অনুশীলন করে। প্রতিদিন একই রুটিন, একই পরিমাণ ঘুম, একই মেনু—এই মেকানিক্যাল জীবনযাপন রোনাল্ডোকে একধরনের সুরক্ষিত বৃত্তে রেখেছে। এতে অনিশ্চয়তা কমে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এ একরকম ‘self-affirmation ritual’, যা তাঁকে অগোচরে প্রস্তুত করে দেয় জয়ের জন্য!
রোনাল্ডোর অহং আসলে জ্বালানি। বিতর্কই তাঁর ব্যাটারি। তিনি বুঝে গেছেন, চাপকে ভয় পেলে জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যায়, আর তাকেই আলিঙ্গন করলে লঞ্চপ্যাড!