সবই সাময়িক হবে না তো? কয়েকদিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠে মিলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? উঠতি ফুটবলাররা অনুপ্রাণিত হবে। কিন্তু কর্মকর্তাদের বিবেক? দায়বদ্ধতা? পেশাদারিত্ব? সেটা কতটুকু বদলাবে? আদৌ বদলাবে তো?

লিওনেল মেসি
শেষ আপডেট: 6 August 2025 15:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত সফরে আসছেন লিওনেল মেসি। বছরশেষে কলকাতায় পা রাখবেন। সেখান থেকে আমদাবাদ, মুম্বই ঘুরে অন্তিম গন্তব্য দিল্লি। আয়োজিত হবে গ্র্যান্ড কার্নিভাল, বসবে ঝাঁ-চকচকে অনুষ্ঠান। সেই সঙ্গে প্রদর্শনী ম্যাচ। এমনকী ছোট ছেলেমেয়েদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণও দেবেন আর্জেন্তিনীয় মহাতারকা।
এই প্রস্তাব ও খবরের অনুপুঙ্খ বিবরণ দেহে শিহরণ জাগায়, মনে পুলক ধরায়। খবরে চাউর: কোথাও বসবে ৭০ ফুট মেসি-মূর্তি—দুনিয়ায় সম্ভবত প্রথম, নিশ্চিতভাবে বৃহত্তম। তারকারা ভিড় জমাবেন। সেলফি উঠবে। প্রধানমন্ত্রীও নাকি আলোচনায় অংশ নেবেন (বিষয়বস্তু অজানা!)। কলকাতা থেকে মুম্বই, দিল্লি থেকে আহমেদাবাদ—রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যানার উঠবে, ইনস্টাগ্রামে রিলের বন্যা বইবে, টিভি চ্যানেলগুলো দিনরাত কাউন্টডাউন চালাবে।
কিন্তু আসল প্রশ্নটা হয়তো এবারও অনালোচিত রয়ে যাবে। এই সফরে, এত বর্ণাঢ্য আয়োজনে কি ভারতীয় ফুটবলের বাস্তব ছবি সামান্য হলেও বদলাবে? নাকি কয়েকদিনের উচ্ছ্বাসশেষে আবারও সেই আগের তিমিরে সরে যেতে হবে? বোধনের উন্মাদনাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রাস করবে বিসর্জনের অবসাদ?
যে দেশে ঘরোয়া টুর্নামেন্টে স্টেডিয়াম ফাঁকা, অধিকাংশ ক্লাব নিয়ত অনিশ্চয়তায় ভোগে আর জাতীয় দল আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে শিবরাত্রির সলতের মতো জ্বলতে থাকে—সেখানে এই ঝটিকা সফর কি আদৌ পুরনো জঞ্জাল সাফ করতে পারে?
লিগের অস্থিরতা: ফুটবলের নড়বড়ে ভিত
ভারতীয় ফুটবল আজ এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL)—যা একসময় দেশের ফুটবলের ‘মুখ’ ছিল—এই মুহূর্তে কার্যত স্থগিত। ফেডারেশন আর বেসরকারি অংশীদারদের চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় সিজন শুরু করা যায়নি। ক্লাবগুলোতে বেতন বন্ধ, বিদেশি খেলোয়াড়রা চুক্তি নবীকরণ না করেই দেশ ছাড়ছেন।
আইএসএলকে ঘিরে একসময় যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল—আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো, স্পনসরশিপ, দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি, বিদেশি খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা—সবই এখন এক দমকে চুপ! এই অভাব, এই ফাঁকটা পূরণ করার মতো শক্তি আইলিগের নেই। যা একসময় ভারতীয় ফুটবলের প্রধান প্রতিযোগিতা ছিল, এখন তা দ্বিতীয় স্তরে গড়াগড়ি খায়। গড় দর্শকসংখ্যা দু-তিন হাজারের বেশি নয়। বেশিরভাগ ম্যাচের সম্প্রচার টিভি বা অনলাইনে, আয়োজন দর্শকহীন গ্যালারিতে। ক্লাবগুলোও অর্থকষ্টে হাঁসফাঁস করছে।
যেখানে ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকায় লিগ মানেই জাতীয় দলের প্রাণশক্তি, সেখানে ভারতে লিগ কাঠামোর পালেস্তারা ঝুরঝুর করে খসে পড়ছে। লিগ আয়োজন বন্ধ, ক্লাবের অস্তিত্ব অনিশ্চিত—এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওঠার স্বপ্ন অধরা থাকবে, এটাই তো বাস্তব!
কাঠামোগত সমস্যা: প্রতিভা কানাগলিতে পথ হারায়
ফুটবল শুধুই সমর্থকদের উচ্ছ্বাস নয়, এটি এক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের খেলা। খেলোয়াড় তৈরি হয় মাঠের রোদে-জলে-ঘামে, ড্রেসিংরুমের পরিকল্পনায়, তুখোড় প্রশিক্ষণে। ভারতে সেই কাঠামোই পঙ্গু, দুর্বল।
একদিকে ইউরোপে সাত-আট বছর বয়স থেকে অ্যাকাডেমিতে প্রতিভা তুলে আনা হয়। এ দেশে এমন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার কাঠামোই নেই। কিছু কর্পোরেট একাডেমি বা রাজ্যভিত্তিক উদ্যোগ থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। আজ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ছাপিয়ে ইউরোপে দাপট দেখাচ্ছেন কোল পালমার, লামিন ইয়ামালরা। তাঁরা প্রত্যেকে কেউ ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, কেউ বার্সেলোনার অ্যাকাডেমি গ্রাজুয়েট।
পাশপাশি চোখ রাঙাচ্ছে প্রশিক্ষণ অদক্ষতা। এআইএফএফের ডেটা অনুযায়ী, দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। বেশিরভাগ স্কুল বা স্থানীয় ক্লাবে প্রশিক্ষণ অপ্রাতিষ্ঠানিক।
শুধু তাই নয়। ক্যালেন্ডার বেঁধে সিজন চালু করা, চালিয়ে নিয়ে যাওয়া ও সময়ে সিজন শেষের উদ্যোগ কটা জায়গায় হয়? স্রেফ গোয়া, কেরালা বা কলকাতায় এখনও টিমটিম করে স্থানীয় লিগ চলছে। অন্যত্র, অধিকাংশ শহরে মোটামুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ম্যাচের জন্য নির্দিষ্ট স্টেডিয়ামই নেই! ফলে যেসব প্রতিভা হঠাৎ জ্বলে ওঠে, আশা জাগায়, তাদের অনেকেই বিকশিত হতে না পেরে অন্ধকারে পথ হারায়। ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা ছাড়া ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা হাসিল করাটা মূর্খ বিলাসিতা!
ফেডারেশনের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা:
ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন বরাবর প্রশাসনিক ব্যস্ততায় জড়ানো একটি নিষ্ফলা প্রতিষ্ঠান। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি, আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ আয়োজন—এসবের বদলে সংস্থার কেষ্টুবিষ্টুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, চুক্তি এবং আইন-আদালতের জটিলতা। কখনও লিগ চুক্তি নিয়ে টানাপড়েন, কখনও নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক। জাতীয় দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা গঠনমূলক রোডম্যাপ প্রায় উধাও। ফেডারেশন কাগজে কলমে ‘ভিশন ডকুমেন্ট’ প্রকাশ করে। কিন্তু খেলোয়াড়রা মাঠে নামতে নামতেই তা গতি হারায়।
ইতিহাসের শিক্ষা: উচ্ছ্বাস ক্ষণস্থায়ী:
২০০৮ সালে কলকাতা এসেছিলেন দিয়েগো মারাদোনা। সল্টলেক স্টেডিয়ামে ভিড়, রাস্তায় হইচই, ব্যানার-পোস্টারে রাস্তাঘাট ছয়লাপ। সেই সফরের প্রভাব নিয়ে বিপুল চর্চা হলেও তা ভারতীয় ফুটবলের কাঠামোয় কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি।
এর ঠিক ন’বছর বাদে, ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ আয়োজন করে ভারত। বিশ্বমানের স্টেডিয়াম তৈরি হলো, ফিফাও প্রশংসা করল। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষে ন যযৌ ন তস্থৌ! ঘরোয়া ফুটবল ফিরে আসে চেনা চেহারায়, পরিচিত মেজাজে… ফাঁকা গ্যালারি, বুড়ি ছোঁয়ার মতো সম্প্রচার, ফুটবলারদের অনিয়মিত বেতন!
মেসির সফরও অনেকটা সেই ধারাই বজায় রাখতে চলেছে, যদি না আমরা গোছানো, বাস্তব প্রস্তুতি নিই। এলএমটেন একটি ব্র্যান্ড। শক্তিশালী, নিঃসন্দেহে। তাঁর প্রতীকী আবেদনও অমোঘ, দুর্দমনীয়। মেসির মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতের মাটিতে পা রাখলে তা মনোবল জোগাবে। ফুটবলের জনপ্রিয়তা সাময়িকভাবে বাড়বে। কিছু বাচ্চা হয়তো প্রথমবারের মতো বল হাতে মাঠে নামবে।
কিন্তু এসবই সাময়িক হবে না তো? কয়েকদিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠে মিলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? উঠতি ফুটবলাররা অনুপ্রাণিত হবে। কিন্তু কর্মকর্তাদের বিবেক? দায়বদ্ধতা? পেশাদারিত্ব? সেটা কতটুকু বদলাবে? আদৌ বদলাবে তো?
‘অনুপ্রেরণা’ আর ‘উন্নয়ন’ সমার্থক নয়। ঘরপোড়া বঙ্গবাসীদের চাইতে এই বাস্তব সত্য ভালভাবে কারাই বা জানে?