সিএফজি-র প্রস্থান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভয়ানক বার্তা দিচ্ছে—ভারত ফুটবলের জন্য অনির্ভরযোগ্য বাজার। যদি দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি না হয়, তাহলে আইএসএলের আরও ক্লাব বিনিয়োগ তুলে নিতে পারে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 December 2025 15:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘদিনের অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা আর প্রশাসনিক জটিলতার গল্পে এবার নয়া মোড়। ম্যানচেস্টার সিটির (Manchester City) মালিকানা সংস্থা সিটি ফুটবল গ্রুপ (City Football Group) ভারত থেকে পাট চুকনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৬ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে তারা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করছে মুম্বই সিটিকে (Mumbai City FC)। এই প্রস্থান নিছক একটি ক্লাব-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়—ভারতীয় ফুটবলের গভীর অসুখের প্রথম বড় লক্ষণ বলেই মনে করছেন অনেকে।
আশা থেকে অনিশ্চয়তার খাদে
২০১৯ সালের শেষদিকে যখন সিএফজি (CFG) মুম্বই সিটিতে বিনিয়োগ করেছিল, তখন পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। ভারতীয় দল সদ্য এশিয়ান কাপে সম্মানজনক পারফরম্যান্স করেছে। কাতারের মাঠে গিয়ে ড্র আদায়, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম একশোর কাছাকাছি পৌঁছনোর স্বপ্ন—সেই সময়ই আইএসএল (ISL) দেশের একমাত্র শীর্ষ লিগ হিসেবে মর্যাদা পায়।
এই প্রেক্ষাপটে ম্যান সিটির আগমন ছিল বড় বার্তা—বিশ্ব ফুটবলের কর্পোরেট শক্তি এবার ভারতকে গুরুত্বের নজরে দেখছে! মুম্বইয়ের মতো তুলনায় ছোট ফ্যানবেস আর সীমিত পরিকাঠামোর ক্লাব হঠাৎই ঢুকে পড়ে এক গ্লোবাল ফুটবল নেটওয়ার্কে।
কেন বেরিয়ে যাচ্ছে সিএফজি?
কোনও কূটনৈতিক ভাষা চলে না। এই মুহূর্তে ভারত কার্যত ফুটবলই নেই! শেষ আইএসএল ম্যাচ হয়েছিল ১২ এপ্রিল। তারপর আট মাস কেটে গেলেও নতুন মরসুম শুরু হয়নি। এআইএফএফ (All India Football Federation) ও লিগ পরিচালনাকারী সংস্থার মধ্যে চুক্তি শেষ। নতুন চুক্তি নিয়ে কোনও সমাধান হয়নি। ২০১০ সালে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর একটি সংস্থার সঙ্গে এআইএফএফ যে চুক্তি করেছিল, তার মেয়াদ খতম হয়েছে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর। নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজতে গিয়ে ফেডারেশন বুঝেছে—ভারতীয় ফুটবলে এখন কেউ টাকা ঢালতে নারাজ। তার উপর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিনিয়োগকারীদের হাতে অপারেশনাল ক্ষমতা কম। ফলে ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। এই অচলাবস্থায় সিএফজির স্পষ্ট বার্তা—লিগ নেই মানে ব্যবসাও নেই।
মুম্বই সিটি: ৬ বছরে কী কী বদল?
সিএফজি-র হাত ধরে মুম্বই সিটির চেহারা আমূল বদলে গিয়েছিল। মাঝারি মানের দল থেকে তারা হয়ে ওঠে আইএসএলের পাওয়ারহাউস। দুটি আইএসএল খেতাব (২০২০–২১, ২০২৩–২৪), একটি লিগ শিল্ড (২০২২–২৩)—সবই এসেছে এই সময়ে। কোচ নিয়োগ, স্কোয়াড গঠন, খেলার ধরণ—সবেতেই ছিল সিএফজি-র স্পষ্ট ভূমিকা। পেপ গুয়ার্দিওলার দর্শন অনুযায়ী বল দখল, প্রেসিং, পজিশনাল ফুটবল—দেখা গিয়েছে মুম্বইয়ের খেলায়। ইউরোপীয় স্তরের ফুটবল ম্যানেজমেন্ট প্রথমবার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছিল ভারতীয় ক্লাবে।
আর ঠিক এখানেই দানা বাঁধে সমস্যা। আসলে ভারতীয় ফুটবলের দরকার ছিল সিএফজি-র মতো সংস্থা। সিএফজি-র ভারতকে দরকার ছিল না।
প্রভাব কতটা গভীর?
সিএফজি-র প্রস্থান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভয়ানক বার্তা দিচ্ছে—ভারত ফুটবলের জন্য অনির্ভরযোগ্য বাজার। যদি দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি না হয়, তাহলে আইএসএলের আরও ক্লাব বিনিয়োগ তুলে নিতে পারে। মুম্বই সিটির ৬৫ শতাংশ শেয়ার এবার ফিরছে মূল মালিক সংস্থার হাতে, যেখানে আছেন রণবীর কাপুর (Ranbir Kapoor)। প্রশ্নটা এখন শুধু মুম্বই নয়। প্রশ্নটা গোটা ভারতীয় ফুটবলকে নিয়ে—এই প্রস্থান কি শুরু মাত্র? সামনে একাধিক ‘এক্সিট ডোর’ খুলতে চলেছে?
একটা কথা পরিষ্কার—লিগ ছাড়া, পরিকল্পনা ছাড়া, বিশ্বাসযোগ্যতা ছাড়া বিশ্ব ফুটবল পুঁজি ভারতে থামবে না। ম্যান সিটি-র বিদায় সেই নির্মম সত্যটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।