২৫ জুন ভারত ও আর্জেন্তিনাকে মিলিয়ে দিয়েছে। দুই দেশের ক্রীড়া ইতিহাসেই এই দিনটি লেখা রয়েছে সোনার অক্ষরে। আজকের দিনেই এই দুই দেশ পেয়েছিল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। যা তাদের বসিয়ে দেয় বিশ্ব ক্রীড়ামঞ্চের শীর্ষস্থানে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 June 2025 16:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২৫ জুন (25 June) তারিখটি ভারত (India) ও আর্জেন্তিনাকে (Argentina) মিলিয়ে দিয়েছে। দুই দেশের ক্রীড়া ইতিহাসেই এই দিনটি লেখা রয়েছে সোনার অক্ষরে। আজকের দিনেই এই দুই দেশ পেয়েছিল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। যা তাদের বসিয়ে দেয় বিশ্ব ক্রীড়ামঞ্চের শীর্ষস্থানে।
২৫ জুনেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্তিনা (World Cup Football Champion Argentina)। সালটা ছিল ১৯৭৮। দানিয়েল পাসারেলা, মেরিও কেম্পেসদের আর্জেন্তিনায় সেবার বসেছিল বিশ্বকাপের আসর। নিজেদের মাঠ বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। এরপর ৪৭ বছরের মধ্যে অবশ্য আরও দু’টি বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্তিনা দিয়াগো মারাদোনা ও লিওনেল মেসির নেতৃত্বে। তবে প্রথম বিশ্বকাপের স্বাদই আলাদা। যা এখনও চেটেপুটে উপভোগ করছে দেশটি।
৪২ বছর আগের সেই দিনটাও ছিল ২৫ জুন। সাল ১৯৮৩। লর্ডসে হচ্ছে ১৯৮৩ ওডিআই ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল। তখন অবশ্য নাম ছিল প্রুডেনশিয়াল কাপ। দুই প্রতিপক্ষ ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও কপিল দেবের ভারত। এর আগের দু’টি বিশ্বকাপই জিতে সেদিন ফাইনাল খেলতে নেমেছিল ক্যারিবায়ানরা। ভারত যে ফাইনালে উঠতে পারবে, সেটাই ছিল ক্রিকেট-বিশ্বের কাছে সবথেকে বড় চমক। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ২৫ জুন, লর্ডসের মাঠে ঘটে গেল ঐতিহাসিক ঘটনা। মহাপরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪৩ রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হল ভারত (1983 ODI World Cup Champion India)। যারা কি না প্রথম দুই বিশ্বকাপ (১৯৭৫ ও ১৯৭৯) মিলিয়ে জিতেছিল মাত্র একটি ম্যাচ।
ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়
লর্ডসের ফাইনালে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড। তাঁর দলে রয়েছেন বিশ্বত্রাস চার ফাস্টবোলার- জোয়েল গার্নার, অ্যান্ডি রবার্টস, মাইকেল হোল্ডিং ও অ্যান্ডি রবার্টস। ভেবেছিলেন ফুৎকারে উড়ে যাবে ভারত। বাস্তবে হলও তাই। মাত্র দুই রান করে ফিরে গেলেন সুনীল গাভাসকর। এরপর অবশ্য কিছুটা হলেও প্রতিরোধ গড়ে তুললেন কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত (৫৭ বলে ৩৮) ও সহ-অধিনায়ক মহিন্দর অমরনাথ (৮০ বলে ২৬)। দু’জনের জুটিতে উঠল ৫৭ রান। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের চার পেসারের দাপটে ভারতের তখন নাজেহাল অবস্থা। একে একে ফিরে গেলেন যশপাল শর্মা (১১), সন্দীপ পাতিল (২৭), অধিনায়ক কপিল দেব (১৫)। কীর্তি আজাদ আউট হলেন শূন্য রানে আর রজার বিনি করলেন ২। ১৩০ রানে তখন ভারতের পড়ে গিয়েছে সাত উইকেট।
তখন ছিল সাদা-কালো ‘বোকা বাক্সের’ যুগ। সব বাড়িতে টিভিও নেই। পাড়ার বা মহল্লার একটি বা দুই-তিনটি বাড়িতে রয়েছে টিভি। সেই খানেই জড়ো হয়ে সবাই খেলা দেখছেন। সামনের বাটিতে রাখা মুড়ি-চানাচুর। বয়স্কদের সামনে রয়েছে চায়ের কাপ। দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সবার মনে, সঙ্গে দমবন্ধকর টেনশন। এত কাছে এসেও কি মোক্ষলাভ হবে না।
তবে ভারতের লোয়ার অর্ডার তখন এখনকার মতো ভঙ্গুর ছিল না। মদনলাল, কিরমানি, বলবিন্দর সিং সান্ধুরা ছিলেন অকুতোভয়। মার্শাল, হোল্ডিংদের বল সামলাতে শুরু করলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যাটারদের মতোই। তখন একদিনের ম্যাচ হতো ষাট ওভারের। পুরো ওভার অবশ্য খেলতে পারেনি ভারত। ৫৪.৪ ওভারে ১৮৩ রানে শেষ হল ভারতের ইনিংস।
কমেন্ট্রি বক্সে বসে তখন ধারাভাষ্যকাররা বলতে শুরু করে দিয়েছেন, এই রান কত ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলতে পারে, সেটাই এখন দেখার। দলে রয়েছেন, ডেসমন্ড হেইনস, গর্ডন গ্রিনিজ, ভিভিয়ান রিচার্ডস, ক্লাইভ লয়েড, ল্যারি গোমস, ফাউদ বাক্কাসের মতো ব্যাটসম্যান (তখনও ক্রিকেট-বিশ্বে ‘ব্যাটার’ শব্দটির জন্ম হয়নি)। উইকেটরক্ষক জেফ ডুজনেরও ব্যাটের হাত যথেষ্ট ভাল।
কিন্তু হার না মানা মনোভাব নিয়ে অধিনায়ক কপিল দলবল নিয়ে নামলেন মাঠে। হয়তো বলেছিলেন, “চলো দেখিয়ে দেই, আমরাও পারি।”
পাঁচ রানে পড়ল ক্যারিবিয়ানদের প্রথম উইকেট। বলবিন্দর সিংয়ের বল অফস্টাম্পের বাইরে পড়েছিল। জাজমেন্ট করে ছেড়ে দিয়েছিলেন বিশ্বত্রাস ওপেনার গ্রিনিজ। বল গোঁত্তা খেয়ে উড়িয়ে দিল বেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না গ্রিনিজের। ফের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিল ৭৩.৭৪ কোটি ভারতবাসী (তখনকার জনগণনা অনুযায়ী)।
এরপর হেইনসকে ফেরালেন মদনলাল। ভিভ নেমেই চালিয়ে খেলতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু তাঁর যখন ২৮ বলে ৩৩ রান, তখনই ঘটে গেল অকল্পনীয় ঘটনা। চিউয়িংগাম চিবোতে চিবোতে কভারের ওপর দিয়ে মদনলালকে সপাটে হাঁকালেন ভিভ। পিছন দিকে অনেকটা দৌড়ে গিয়ে অবিশ্বাস্য ক্যাচ নিলেন কপিল।
ভিভের আউটের পরই জয়ের গন্ধ পেয়ে যায় ভারত। মাত্র আট রান করে বিনির শিকার হলেন লয়েড। গোমস ও বাক্কাসকে আউট করলেন যথাক্রমে মদনলাল ও সান্ধু।
কিন্তু সপ্তম উইকেটের জুটিতে মার্শালকে নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘোরাতে শুরু করলেন ডুজন। জুটিতে উঠল ৪৩ রান। এবার খেল দেখালেন বোলার অমরনাথ। ব্যাট হাতে মূল্যবান ২৬ রান করার পর এবার বোলার মহিন্দর হয়ে উঠলেন দলের ত্রাতা। পরপর তুলে নিলেন ডুজন ও মার্শালকে। রবার্টস ফিরলেন কপিলের বলে। আর হোল্ডিংকে আউট করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কফিনে শেষ পেরেকটি পুতলেন সেই অমরনাথ। ৫২ ওভারে ১৪০ রানেই শেষ ক্যারিবিয়ানদের ইনিংস। ৪৩ রানে জিতে ইতিহাস রচনা করল ভারত। অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করে ম্যাচ সেরা মহিন্দর অমরনাথ। ক্যারিবায়ান সূর্য সেই যে অস্তমিত হল ভারতের দাপটে, আর তাদের ওডিআই বিশ্বকাপ জেতা হয়নি।
সেই বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যরা এখনও ২৫ জুন নিয়ে স্মৃতিমেদুর। তাঁদের শয়নে, স্বপনে, জাগরেণ এখনও সেই লর্ডসের ব্যালকনিতে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মুহূর্ত। কয়েক বছর আগে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলবিন্দর সিং সান্ধু বলেছিলেন, “এটা আমার জন্য এক মায়াবী মুহূর্ত ছিল। আমি এখনও সেই মুহূর্ত অনুভব করি। সেই মুহূর্ত মনে পড়লে এখনও আমার গা শিউরে ওঠে।”
১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবের মতে, ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। স্টার স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কপিল একবার বলেছিলেন, “আমরা যেভাবে বিশ্বকাপ জয় করে দেখিয়েছিলাম, তা সত্যিই বিস্ময় জাগিয়েছিল। এটা ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট। এটা ভারতীয় ক্রিকেটের চেহারাও পাল্টে দিয়েছিল। তখন থেকে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম আমরাও একদিনের ম্যাচে ভাল করতে পারি।” পাশাপাশি সেই সাক্ষাৎকারেই হরিয়ানা হ্যারিকেন বলেছিলেন, “ফাইনালের আগে স্বপ্নে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলারদের মুখ দেখে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সজাগ হওয়ার পর দেখি আমার পুরো শরীর ঘামে ভেজা। তবে মনে বিশ্বাস ছিল আমরা পারব। আমরা উপভোগের মন্ত্র নিয়েই খেলতে গিয়েছিলাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ধরেই নিয়েছিল, ওরা ফাইনাল জিতবে।”
জানা যায়, কপিল দেব বিশ্বকাপ জয়ের ব্যাপারে এতটাই আশাবাদী ছিলেন যে, পার্টি করার জন্য নিজের ব্যাগে এক বোতল শ্যাম্পেন রেখেছিলেন। তবে উৎসব করার জন্য ভারতীয় দলের বাকিদের কাছে কিছুই ছিল না। এ কারণে তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন ক্লাইভ লয়েড-ভিভ রিচার্ডসদের কাছ থেকে শ্যাম্পেন আনতে।
রেডিফ ডট কমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য কীর্তি আজাদ। তিনি বলেছিলেন, “ফাইনাল শেষে আমরা কয়েকজন শ্যাম্পেন আনতে গিয়েছিলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্রেসিংরুমে। ওরা খুব রেগে গিয়েছিল। একজন বলল, এটা নিয়ে এখান থেকে দূর হও। আমরা ম্যাগনাম শ্যাম্পেনের বিশাল বোতলগুলি ফ্রি পেয়ে গেলাম। সেগুলো দিয়েই উৎসব করলাম।”
ভারতের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী সেই দলের ১৪ সদস্যের মধ্যে আজ একমাত্র নেই যশপাল শর্মা। প্রতি বছর ২৫ জুন মুম্বইয়ের বিসিসিআই কার্যালয়ে তাঁরা একত্র হন। তাঁদের জেতা ট্রফিটা যে সেখানেই রাখা আছে। আজও নিশ্চয় তাঁরা মুম্বাইয়ে মিলিত হয়ে ৪২ বছর আগের স্মৃতি রোমন্থন করবেন।
আর্জেন্টির প্রথম বিশ্বকাপ জয়
কাট টু ২৫ জুন ১৯৭৮, অধরা স্বপ্ন সফল হল আর্জেন্তিনার। অবশেষে বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্তিনা। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপেই ফাইনালে উঠেছিল লাতিন আমেরিকার দেশটি। কিন্তু ফাইনালে তাদের হারিয়ে দেয় আয়োজকউরুগুয়ে। এরপর চার দশকের বেশি সময়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা দূরে থাক, শেষ চারেও উঠতে পারেনি তারা।
অবশেষে ১৯৭৮ সালে এল সেই মহার্ঘ মুহূর্ত। সেবার বিশ্বকাপের আসর দেশের মাটিতে, এর আগে যা কখনও হয়নি। সিজার লুইস মেনোত্তির দল নকআউট পর্বে ওঠার পর তাদের আর আটকে রাখা যায়নি।
৪৭ বছর আগে আজকের এই দিনে ফাইনাল হয়েছিল রিভার প্লেটের মাঠ এস্তাদিও মনুমেন্তালে। আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় টোটাল ফুটবলের জনক নেদারল্যান্ডস। ৩৮ মিনিটে আর্জেন্তিনাকে এগিয়ে দেন মারিও কেম্পেস। ৮২ মিনিটে ডাচদের সমতায় ফেরান ডিক নান্নিঙ্গা। এর পর আর কোনও গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে আরও দুই গোল করে আর্জেন্তিনা। ১০৫ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন কেম্পেস ও ১১৫ মিনিটে ব্যবধান ৩-১ করেন দানিয়েল বেরতনি।
৬ গোল করে সেবার গোল্ডেন বুট জেতেন ফাইনালে দুই গোল করা কেম্পেস। বিশ্বকাপের পাশাপাশি আর্জেন্তিনা সেবার জিতে নিয়েছিল ফিফা ফেয়ার প্লে ট্রফিও।