ময়দান নয়… এই লড়াকু দলের আসল গল্প মাঠের বাইরে। যুদ্ধ, উদ্বাস্তু জীবন, ভিন্ন দেশে শিকড় গজানো, তবু নিজের মাটিকে ভুলে না যাওয়ার অদম্য সংগ্রামের কাহিনি লিখেছে ইরাক।

ইরাক ফুটবল টিম
শেষ আপডেট: 2 April 2026 16:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মালমো থেকে লিভারপুল, নরওয়ে থেকে জার্মানি—প্লে-অফ ফাইনাল জিতে ইরাকের বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের খবর (Iraq qualifies for World Cup 2026) পৌঁছতেই ইউরোপের বিভিন্ন শহরে উৎসব। কিন্তু কেন? কারণটা কি নিছক ফুটবল? নাকি রাজনৈতিক? অথবা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক? ঘোরতরভাবে সৌহার্দ্যের?
নথি-পরিসংখ্যান-ইতিহাস বলবে, ইরাকের এখনকার টিমের অর্ধেক খেলোয়াড়ই হয় ইউরোপে জন্মেছেন বা নয়তো বড় হয়েছেন। প্রায় সকলেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পালিয়ে আসা পরিবারের সন্তান। ৪০ বছর পর ইরাক (Iraq FIFA World Cup 2026) বিশ্বকাপে ফিরল—এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি দেশের নয়, লক্ষাধিক উদ্বাস্তু মানুষের আত্মগৌরব হয়ে উঠেছে।
কারাগার থেকে বিশ্বকাপ—আলি আল-আহমাদির গল্প
বলিভিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম গোল আলি আল-আহমাদির (Ali Al-Ahmadi)। ২৪ বছরের এই ফরোয়ার্ড এখন লুটন টাউনের হয়ে খেলছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের শুরুতেই নিকষ আঁধার! বাবা ছিলেন আইনজীবী। সাদ্দাম হুসেইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার অপরাধে গ্রেফতার। কোনওভাবে মুক্তি পেলেন ঠিকই। কিন্তু ভবিষ্যৎ অন্ধকার জেনে প্রথমে জর্ডান, তারপর ব্রিটেনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
মায়ের ইংরেজিজ্ঞান নেই। বাবারও আর কাজ জুটল না। যার অনিবার্য ফল: দারিদ্র্য, অনাহার। অনেক দিন একবেলারও খাবার থাকত না। ঘেটো এলাকায় বড় হওয়া—অসদসঙ্গে জড়িয়ে পড়ার বিপদও ছিল। তারপর আচমকা একদিন স্কুলের একটি টুর্নামেন্টে ট্রান্সমেয়ার রোভার্সের নজরে পড়লেন। ১৩ বছর বয়সে একাডেমিতে সুযোগ। বাকিটা ইতিহাস।
ইউরোপের মাটিতে বড় হয়েও ইরাকের শার্ট
মিডফিল্ডার মার্কো ফারজি (Marko Farji) কুর্দি পরিবারের ছেলে। মা-বাবা সুলাইমানিয়া থেকে শুধু একটা ব্যাগ নিয়ে পালিয়েছিলেন—প্রথমে জর্ডান, পরে নরওয়ে। ভেনেজিয়ার হয়ে সেরি বি-তে খেলেন তিনি। বলিভিয়ার বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলে অ্যাসিস্ট তো তাঁরই!
লেফট ব্যাক মের্চাস দোস্কির (Merchas Doski) পরিবারের উত্তর ইরাকের জাখো থেকে নব্বইয়ের দশকে হানোভারে চলে আসা। ছেলেবেলা থেকেই ফুটবলে নেশা— কিন্তু বাবা-মা-র সাফ নির্দেশ, যদি কোনওদিন কোনও দেশের হয়ে খেলো, সেটা যেন একমাত্র ইরাক হয়। ম্যাচের আগে ফিফাকে একটি সাক্ষাৎকারে দোস্কির আবেগঘন মন্তব্য, ‘আমি ৪ কোটি ৬০ লক্ষ ইরাকিদের জন্য খেলতে নামব!’
রাজনীতি নয়, ফুটবলই পরিচয়
ফুলব্যাক হুসেইন আলি বড় হয়েছেন মালমোতে। বাবা ইরাকি, মা সিরীয়। বাবা গালফ যুদ্ধের সময় দেশ ছেড়েছিলেন, সিরিয়ায় গিয়ে মায়ের সঙ্গে পরিচয়। সেখানে বিয়ে, তারপর সুইডেনে আশ্রয়। মিডফিল্ডার আইমার শের নামটাই বলে দেয় পরিবারের ফুটবলপ্রেম—বাবা আর্জেন্তাইন মিডফিল্ডার পাবলো আইমারের ভক্ত, তাই ছেলের নাম রেখেছিলেন আইমার। সুইডেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন ইরাককে। একই গল্প উইঙ্গার ইউসুফ আমিনের। জার্মানির এসেনে বড় হওয়া। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের যুব একাডেমিতে ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালের পর ইরাক এই প্রথম বিশ্বকাপে। গ্রুপ আই-তে তাদের সামনে ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগাল। কিন্তু ময়দান নয়… এই লড়াকু দলের আসল গল্প মাঠের বাইরে। যুদ্ধ, উদ্বাস্তু জীবন, ভিন্ন দেশে শিকড় গজানো, তবু নিজের মাটিকে ভুলে না যাওয়ার অদম্য সংগ্রামের কাহিনি লিখেছে ইরাক।