ঘোতবি বলেন, ‘ইরান না খেললে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যাব। খেলোয়াড়দের স্বপ্ন ছিল এই বিশ্বকাপ। লস অ্যাঞ্জেলেসে এত ইরানি থাকেন—নিজের জন্মভূমির দলকে নিজের দেশে খেলতে দেখা… কল্পনাও করা যায় না কতটা আবেগের!’

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 March 2026 16:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জাতীয় সংগীত গাইবেন কি গাইবেন না—এই একটা প্রশ্ন আর তজ্জনিত বিতর্ক ইরানের মহিলা ফুটবল দলের জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে। মাঠে নামার আগে কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত। যার কড়া মাশুল দিতে হচ্ছে হাড়ে হাড়ে!
এমন পরিস্থিতিতে গোটা ঘটনা নিয়ে সরব হলেন ইরানের ফুটবল দলের প্রাক্তন কোচ আফশিন ঘোতবি (Afshin Ghotbi)। বিবিসি স্পোর্টকে দেওয়া আবেগঘন সাক্ষাৎকারে তিনি বলে উঠলেন, ‘এই মেয়েরা প্রতীক হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে বীরাঙ্গনা!’
কীভাবে ঘনিয়ে এল বিপদ?
এশিয়া কাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীতের সময় নীরব ছিলেন ইরানের মেয়েরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিমান হামলার পর দেশে তখন আগুন জ্বলছে। সেই আবহে এই নীরবতা ছিল স্পষ্ট বার্তা। কিন্তু পরের দুটি ম্যাচে—অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপিন্সের বিরুদ্ধে—আবার গান গেয়ে ওঠেন তাঁরা। আর ঠিক এরপরই অভিযোগ ঘনায়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে নয়… দলের সঙ্গে থাকা সরকারি প্রতিনিধিরা চাপ দিয়ে এই কাজ করিয়েছেন।
মাঠের লড়াইয়ে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় ইরান। এরপর ঘরে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন উপস্থাপক তাঁদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে শাস্তির দাবি তোলেন। নিরাপত্তার ভয়ে স্বদেশে ফেরা আটকে যায়। পাঁচজন খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ায় মানবিক ভিসার আবেদন জানান, পেয়েও যান। বাকিদের ফিরে আসতে হয়।
ঘোতবির চোখে জল: ‘এটা অন্যায়’
২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ইরানের কোচ ছিলেন ঘোতবি। ১৩ বছর বয়সে আমেরিকায় বাবার সঙ্গে আমেরিকায় চলে যান। এখন দু’দেশের টান বুকে নিয়ে বাঁচেন। ‘বিবিসি’-র সামনে গোটা ইস্যু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখ ভিজে আসে। ঘোতবির কথায়, ‘একটু ভাবো—তুমি সেরা পারফরম্যান্স দিতে মাঠে নামতে চাইছ। কিন্তু খেলা শুরুর আগেই ভাবতে হচ্ছে, কীভাবে দাঁড়াব, কোথায় তাকাব, কী করব। এটা কতটা অন্যায়!’
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পুরুষ দলও একই ধাঁধায় পড়েছিল। প্রাক্তন কোচের সাফ বক্তব্য, ‘সরকারের সঙ্গে থাকলে দেশের মানুষ ঘৃণা করবে। আর মানুষের সঙ্গে থাকলে সরকারের রোষ। এই ফাঁদে পড়া খেলোয়াড়দের কথা ভাবলে বুকটা ভারী হয়ে আসে!’ আর মেয়েদের নিয়ে? ঘোতবির কথায়—‘এরা বীর। সারা পৃথিবী এখন এদের দিকে তাকিয়ে। রাজনীতিকরা সব পক্ষ থেকে একটু ছেড়ে দিক। নিজেদের মতো বাঁচতে দিক!’
বিশ্বকাপে ইরান না খেললে ‘বিধ্বস্ত’ হবেন
চলতি রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে ছেলেদের দলের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়েও গভীর উদ্বেগ ঘোতবির। ইরান টানা চতুর্থবার বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) কোয়ালিফাই করেছে। কিন্তু দেশের ক্রীড়ামন্ত্রীর বক্তব্য, চলতি পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বলেছেন ‘স্বাগত, তবে না আসাই ভাল!’ ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর (Gianni Infantino) আশ্বাসেও ধোঁয়াশা কাটেনি।
সবকিছু দেখে ঘোতবি বলেন, ‘ইরান না খেললে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যাব। খেলোয়াড়দের স্বপ্ন ছিল এই বিশ্বকাপ। লস অ্যাঞ্জেলেসে এত ইরানি থাকেন—নিজের জন্মভূমির দলকে নিজের দেশে খেলতে দেখা… কল্পনাও করা যায় না কতটা আবেগের!’
২০০০ সালে পাসাদেনা রোজ বোলে ইরান বনাম আমেরিকার একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজিত হয়। ৫০ হাজারের বেশি দর্শকের মধ্যে ৮৫ ভাগই ছিলেন ইরানি। দুই দেশের পতাকা নিয়ে বসেছিলেন তাঁরা, এনেছিলেন গোলাপ—শান্তির প্রতীক হিসেবে। ঘোতবি সেদিন গ্যালারির দর্শক। পুরনো স্মৃতি মনে করতে বসে বলেন, ‘গায়ে কাঁটা দিয়েছিল, চোখে জল এসেছিল। ফুটবলের এই শক্তি দেখে গর্বিত হয়েছিলাম!’
ইরানের প্রাক্তন কোচ জানেন, সেই শক্তিই এখন পরীক্ষার মুখে।