ফুটবলে মাঝেসাঝে এমন গল্পই স্কোরলাইনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। আনাতোলি ট্রুবিন আপাতত সেই গল্পের নায়ক।

আনাতোলি ট্রুবিন
শেষ আপডেট: 30 January 2026 16:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফুটবলে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কেবল স্কোরলাইনে আটকে না থেকে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের বিচূর্ণ গল্পে। লিসবনের আলোঝলমলে রাত, স্টেডিও দা লুজে (Estádio da Luz) দম বন্ধ করে রাখা অন্তিম প্রহর, আর সেই পরিসরেই, রিয়াল মাদ্রিদের (Real Madrid) জালে হেডে বল জড়িয়ে ইতিহাস রচনা করলেন এক গোলকিপার—আনাতোলি ট্রুবিন (Anatoliy Trubin)।
চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ-ফেজে বাঁচা-মরার ম্যাচ। বেনফিকা (Benfica) তখন ৩–২ স্কোরলাইনে এগিয়ে। কিন্তু প্লে-অফে উঠতে হলে দরকার আরও একটি গোল। এমন সময় ৯৮ মিনিটে কর্নারের জন্য প্রতিপক্ষ বক্সে উঠে এলেন গোলকিপার নিজেই। ‘এলেন’ বলা হয়তো ভুল। তাঁকে পাঠানো হল। পাঠালেন যিনি, তিনি আধুনিক ফুটবলের চাণক্য, বেনফিকা ম্যানেজার জোসে মোরিনহো! হলুদ জার্সিতে ৬ ফুট ৬ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী কিপার সেঁধিয়ে গেলেন খেলোয়াড়দের জঙ্গলে।
কাট টু। পরের দৃশ্য। আর সে দৃশ্যেই বল জালে। গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ আর মাটিতে স্লাইড করে ছুটে চলা ট্রুবিন। বিপক্ষ গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়া (Thibaut Courtois) হতভম্ব মুখে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে। ফুটবলের নিষ্ঠুর সৌন্দর্য… এ ছাড়া পরিস্থিতিকে বর্ণনা করার আরও কোনও বিকল্প শব্দবন্ধ আছে কি?
৯৮ মিনিটের লাফ: বদলে গেল ম্যাচের গল্প
লিসবনে চোখ ছিল একটাই ম্যাচে। অন্য সব মাঠের খেলা শেষ। বেনফিকা জানত, এক গোল মানে ইউরোপে টিকে থাকা। শেষ আক্রমণে যখন ট্রুবিন আগুয়ান, তখন সেটাকে অনেকেই ‘মরিয়া চেষ্টা’ ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি তো আকাশে ওড়ার মানুষ! ফলে কর্নার থেকে আসা বলটা ঠিক জায়গায় পেলেন যেই, জোরালো হেডে কুর্তোয়াকে পরাস্ত করতে সমস্যা হল না এতটুকু!
এই গোল শুধু ম্যাচ জেতায়নি, বেনফিকাকে টেনে তুলেছে প্লে-অফে। কোচ জোসে মোরিনহো (Jose Mourinho) ম্যাচের পর বলেছেন, ‘ও আগেও এমন চেষ্টা করেছে। আমরা জানতাম, বড় ছেলেটা এটা করে দেখাবে!’
মজার ব্যাপার, ভিনিদের ক্লাবের বিরুদ্ধে ট্রুবিনের স্মৃতি নতুন নয়। ২০২০ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে শাখতার দোনেৎস্কের (Shakhtar Donetsk হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক। প্রতিপক্ষ তখনও রিয়াল মাদ্রিদ। বার্নাবেউয়ে (Santiago Bernabéu) ৩–২ জিতে সবাইকে চমকে দেয় শাখতার। সেই রাতেই ইউরোপ চিনেছিল ট্রুবিনকে। এবার, পাঁচ বছর পরে, নিজের নামটাই লিখে দিলেন স্কোরশিটে।
যুদ্ধ, বিচ্ছেদ আর স্বপ্ন: ট্রুবিনের বেড়ে ওঠার লড়াই
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অন্যরকম এক শৈশব। ট্রুবিনের জন্ম ইউক্রেনে (Ukraine)। ১৩ বছর বয়সে ঘরছাড়া হন, ফুটবলের জন্য। ২০১৪ সালে ডনবাস অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলে শাখতার তাদের ট্রেনিং বেস সরিয়ে নেয় কিয়েভে (Kyiv)। পরিবারের কাছ থেকে দূরে, একা থাকার শুরু। এক সাক্ষাৎকারে ট্রুবিন বলেছিলেন, ‘হঠাৎ করে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। বাবা-মায়ের সঙ্গে ছ’মাস দেখা হয়নি কখনও কখনও। কিন্তু ফুটবলই ছিল স্বপ্ন।’
২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু। আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে স্বপ্ন। ট্রুবিন তখনও শাখতারের খেলোয়াড়। অনেক বিদেশি ফুটবলার দেশ ছেড়ে চলে গেলেও তিনি পরিবার নিয়ে ইউক্রেনেই রয়ে যান। পরে নিরাপত্তার কারণে আশ্রয় নেন লুৎস্কে (Lutsk)। যুদ্ধের বাস্তবতা তাঁকে মানসিক দৃঢ়তার পাঠ দেয়—যা গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে দরকারি অস্ত্র।
ইউক্রেনের ভরসা, ইউরোপের নায়ক
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ট্রুবিন যোগ দেন বেনফিকায়। ডনবাস অ্যারেনায় (Donbas Arena) খেলার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ না হলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর উত্থান থামেনি। ইউক্রেনের হয়ে ২৬টি ম্যাচ খেলেছেন। অভিষেক কিংবদন্তি আন্দ্রেই শেভচেঙ্কোর (Andriy Shevchenko) হাতে। ইউরো ২০২৪-এ খেলেছেন দু’টি ম্যাচ।
এখন সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—বিশ্বকাপ (World Cup) প্লে-অফ। সুইডেনের (Sweden) বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল, জিতলে পোল্যান্ড (Poland) বা আলবেনিয়া (Albania)। ইউক্রেন মাত্র একবারই বিশ্বকাপ খেলেছে, ২০০৬ সালে। ট্রুবিনের মতো গোলকিপার থাকলে স্বপ্ন দেখতেই পারে তারা।
নিজের প্রথম কেরিয়ার গোল নিয়ে ট্রুবিনের মন্তব্য, ‘আমি জানতামই না কী দরকার। সবাই ইশারা করল উঠে যেতে। কোচকেও দেখলাম। তারপর কীভাবে যেন হয়ে গেল। আমি গোল করতে অভ্যস্ত নই। অবিশ্বাস্য!’
অবিশ্বাস্যই বটে। কারণ এই গোল কেবল ম্যাচের ফল বদলায়নি। হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের এক তরুণের লড়াইয়ের প্রতীক। ফুটবলে মাঝেসাঝে এমন গল্পই স্কোরলাইনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। আনাতোলি ট্রুবিন আপাতত সেই গল্পের নায়ক।