অবতরণে উচ্ছ্বাস ছিল। প্রস্থানে রয়ে গেল প্রশ্ন, ক্ষোভ আর তদন্তের প্রতিশ্রুতি।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 13 December 2025 15:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোররাতের কলকাতা। কুয়াশা, শীত আর উত্তেজনা মিলিয়ে-মিশিয়ে শনিবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (Netaji Subhas Chandra Bose International Airport) বাইরে হাজির কাতারে কাতারে সমর্থক। ভোর আড়াইটে নাগাদ বিলাসবহুল পার্সোনাল জেট থেকে বাইরে পা রাখলেন লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। সঙ্গে লুইস সুয়ারেস (Luis Suarez), রদ্রিগো দি পল (Rodrigo De Paul)। তিনদিনের ‘গোট ট্যুর ইন্ডিয়া’-র (GOAT Tour India) সূচনা কলকাতা থেকে। শহর জুড়ে উন্মাদনার আবহ তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। বাস্তবেও তার কমতি ছিল না।
ভোরের উন্মাদনা, প্রথম হতাশা
কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে সেই উচ্ছ্বাস কীভাবে ধীরে ধীরে অস্বস্তি, ক্ষোভ আর শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলায় বদলে গেল—তার সাক্ষী রইল শনিবারের কলকাতা। ভোরের দৃশ্যটা ছিল চেনা। বিমানবন্দরের বাইরে রাতভর অপেক্ষা। কেউ পতাকা হাতে, কেউ আকাশি-সাদা জার্সিতে। কেউ বা শুধু মোবাইল ক্যামেরা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে—এক ঝলক মেসিকে (Lionel Messi in Kolkata) দেখার আশায়। কিন্তু কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ব্যাক এন্ট্রি দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যান আর্জেন্তিনীয় ফুটবল তারকা। অপেক্ষারত অধিকাংশ সমর্থকই তাঁকে চোখে দেখার সুযোগ পাননি। হতাশা গ্রাস করলেও কুলভাঙা নয়। নিয়ন্ত্রিত। কারণ সামনে দিনভর কর্মসূচি।
ভার্চুয়াল উদ্বোধন, প্রশ্নের শুরু
সকাল গড়াতেই কাজের বেগ বাড়ল। লেক টাউনের শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবে তৈরি ৭০ ফুটের মূর্তি (Messi Statue) হোটেল থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন মেসি। শহরের একাংশে উল্লাস, একাংশে প্রশ্ন—মাঠে না এসে মূর্তি উদ্বোধন কেন? তবে তখনও পরিস্থিতি শান্ত।
যুবভারতীতে প্রত্যাশা বনাম বাস্তব
এরপর নজর ঘুরল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের (Vivekananda Yuba Bharati Krirangan) দিকে। হাজার হাজার দর্শক টিকিট কেটে ঢুকেছেন। অনেকের পকেট থেকে বেরিয়েছে হাজার হাজার টাকা। প্রত্যাশা স্পষ্ট—মেসিকে অন্তত একবার চোখে দেখা। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী স্টেডিয়াম ল্যাপ, মঞ্চে উপস্থিতি, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly), শাহরুখ খান (Shah Rukh Khan) এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সঙ্গে সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টার অনুষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে যা হল, তার সঙ্গে সেই প্রত্যাশার মিল নেই বললেই চলে।
বিশ মিনিটের উপস্থিতি, মুহূর্তে বিস্ফোরণ
বেলা ১১টার কিছু পরে মেসি স্টেডিয়ামে ঢুকলেন। কিন্তু চারপাশে ঘন নিরাপত্তা, ‘বিশিষ্ট ব্যক্তি’দের বলয়। গ্যালারির বড় অংশ থেকে ‘তাঁকে’ কার্যত দেখা যাচ্ছিল না। এনডিটিভি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, মাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল মাত্র ২০ মিনিটের মতো। নির্ধারিত ল্যাপ সম্পূর্ণ হয়নি। কোনও আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎও নেই। আচমকাই মেসিকে বলা নেই, কওয়া নেই স্টেডিয়াম থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এই এক মুহূর্তে বদলে যায় পরিস্থিতি!
প্রথমে গ্যালারি থেকে আছড়ে পড়ে ক্ষোভ। তারপর মাঠে নামার চেষ্টা। চেয়ার, বোতল ভাঙা। ব্যানার ছেঁড়া। নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। চকিতে অনুষ্ঠান ভেস্তে যায়। যে যুবভারতী একসময় গর্জে উঠত ফুটবলে, সেখানে চরম বিশৃঙ্খলার ছবি।
দায় কার?
গোটা ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে মেসির কাছে ক্ষমা চান। ‘মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কথা স্বীকার করেন। তদন্তের ঘোষণা করেন।
বিকেলে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার (Rajeev Kumar) সাফ জানান—ঘটনার দায় অর্গানাইজারদের। মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে (Satadru Dutta) আটক করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। ভিড়ের অনুমান, টিকিট বিক্রি আর স্টেডিয়ামের সক্ষমতার মধ্যে বড় ফারাক ছিল বলেই উঠে এসেছে প্রাথমিক তদন্তে।
প্ল্যাকার্ডে লেখা এক লাইনের সত্য
কিন্তু এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও গোটা দিনের টুকরো টুকরো কিছু দৃশ্য আলাদা করে মনে থেকে যায়। যেমন, বিমানবন্দরে এক তরুণীর হাতে ধরা প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা—‘ভারতীয় ফুটবলকে বাঁচান’ (Save Indian Football)। কোনও চিৎকার নেই। অযথা নাটক নেই। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ যেন গোটা দিনের সারকথা বলে দেয়। মেসির সফর জৌলুসে ভরা। অথচ ভারতীয় ফুটবলের বাস্তবতা আলাদা।
এই মুহূর্তে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (Indian Super League) অনিশ্চিত। সম্প্রচারকারী নেই। সূচি নেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা। সেই সময় মেসির সফর মূলত প্রমোশনাল। রাজনৈতিক বৈঠক, সেলিব্রিটি ইভেন্ট, প্রদর্শনী ম্যাচ। মাঠের ফুটবল, কাঠামোগত আলোচনা—সেগুলোর জায়গা কোথায়?
দিনের শেষে কলকাতার প্রাপ্তি
দিনের শেষে কলকাতার প্রাপ্তি-ই বা কী? মূর্তি উদ্বোধন, ২০ মিনিটের উপস্থিতি আর বিশৃঙ্খলার কলঙ্ক? অবতরণে উচ্ছ্বাস ছিল। প্রস্থানে রয়ে গেল প্রশ্ন, ক্ষোভ আর তদন্তের প্রতিশ্রুতি। মেসি চলে যাবেন হায়দরাবাদ, দিল্লি। কিন্তু কলকাতার শনিবার ফুটবলের ইতিহাসে থাকবে এক ব্যর্থ আয়োজনের দিন হিসেবে।