সম্ভবত, ফুলব্যাক পজিশন একদিন ‘হাইব্রিড মিডফিল্ডারে’র নতুন পরিচয় পাবে। কোচরা এমন খেলোয়াড় চাইবেন যারা একই সঙ্গে বল কাড়তে, রাখতে আর বিলি করতে সক্ষম।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 8 October 2025 16:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক সময় ফুলব্যাকদের বলা হত ‘উইংয়ের সৈনিক’। ডিফেন্সে স্লাইড ট্যাকল, আক্রমণে ক্রস—এই দুইয়ের মধ্যিখানে লম্বা দৌড়ই ছিল তাঁদের ট্রেডমার্ক স্টাইল, পরিচিত ধর্ম। গ্যারি নেভিলের ঠাণ্ডা মাথা, কাফুর ফ্লেয়ার, রবার্তো কার্লোসের বজ্রগতির লং শট—সব মিলিয়ে ফুলব্যাকরা হয়ে ওঠেন ময়দানের দু’প্রান্তের নীরব যোদ্ধা।
কিন্তু সময় বদলেছে। আর সেই বদলের স্পষ্ট প্রমাণ ফুটবলের এক নতুন পজিশন, নয়া দায়িত্ব—‘ইনভার্টেড ফুলব্যাক’। নামটাই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে—ডানদিকের খেলোয়াড় হঠাৎ মাঝমাঠে সরে আসছেন, বামদিকের উইঙ্গার-ডিফেন্ডার মাঝখানে পাস বিলি করছেন! আর এভাবেই তাঁরা হয়ে উঠেছেন এক নতুন কৌশলের প্রতিনিধি!
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে পেপ গোয়ার্দিওলা। বার্সেলোনায় তিনি শুরু করেছিলেন ‘ফলস নাইন’ বিপ্লব। এখন ম্যানচেস্টার সিটিতে এনেছেন ইনভার্টেড ফুলব্যাকের জমানা। তাঁর যুক্তিতে: ফুলব্যাকরা যদি মিডফিল্ডে আসে, তাহলে পজেশন রাখা সহজ হয়, আক্রমণের সময় সংখ্যাগত বাড়তি সুবিধা মেলে, আবার প্রতিপক্ষের কাউন্টারও আটকানো যায়। পেপের এই তত্ত্বকে হাতিয়ার করেছেন আরও অনেক কোচ—মিকেল আর্তেতা, জুলিয়ান নাগেলসম্যান কিংবা য়ুর্গেন ক্লপ। তাঁদের দলের রাইট ব্যাক বা লেফট ব্যাক এখন কেবল ডিফেন্সের দেয়াল নয়, বরং আক্রমণের সূত্রধর।
আগে ফুলব্যাকরা থাকতেন মাঠের সাইডলাইন ঘেঁষে। এখন সরে আসেন কেন্দ্রের দিকে। বল যখন নিজেদের দখলে, তখন ডিফেন্স থেকে উঠে আসায় মাঝমাঠের অতিরিক্ত এক স্তর তৈরি হয়। ফলে ফর্মেশন বা ছক বদলে দাঁড়ায় ৩–২–২–৩ কিংবা ৩–২–৫। এই ‘ওভারলোড’কৌশল প্রতিপক্ষের প্রেসিংকে সহজেই বানচাল করে।
কিন্তু কেন এই বদল দরকার পড়ল? আসলে, আধুনিক ফুটবল এখন পুরোপুরি পজিশনাল গেম। অর্থাৎ, কে কোথায় দাঁড়াবে, কখন বল নেবে, কীভাবে জায়গা তৈরি করবে—সবই অঙ্ক কষে সাজানো। সাইডলাইন ধরে ছুটে যাওয়া ফুলব্যাকদের জায়গায় এখন দরকার এমন খেলোয়াড়, যারা টাইট স্পেসে বল কন্ট্রোল করতে পারে, প্রেসিংয়ের মধ্যে থেকেও পাস বিলিতে দড়। ডিফেন্স থেকে বিল্ড-আপে ফুলব্যাকরা যখন ভেতরে ঢোকে, তখন সেন্টার ব্যাকরা ছড়িয়ে পড়ে দুই পাশে, মিডফিল্ডাররা একটু উপরে উঠে আসে। ফলে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের প্রেস করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, ইনভার্টেড ফুলব্যাক এখন শুধু রক্ষণে নয়, দলের বল দখলের গোড়াতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
সিটিতে যখন কাইল ওয়াকার খেলতেন কিংবা ইদানীং রিকো লুইস—তাঁদের দেখলেই দেখলেই রণকৌশলের খুঁটিনাটি সাফ সাফ বোঝা যায়। একসময়ের স্পিডস্টার ওয়াকার পেপের সিস্টেমে মাঝখানে সরে এসে পাস রিসিভ করতেন, প্রেস ভঙতেন, আক্রমণ গড়ে তুলতেন। একইভাবে আর্তেতার আর্সেনালে দায়িত্ব নেন অলিভার জিঞ্চেঙ্কো। মিডফিল্ডার হয়েও তিনি ফুলব্যাক হয়ে খেলতেন, কারণ তাঁর পায়ের কাজ আর স্পেস রিডিং দুটোই দলে ভারসাম্য এনে দেয়।
আসলে এই কৌশলের সবচেয়ে বড় সুফল—সংখ্যাগত আধিপত্য। ধরুন, প্রতিপক্ষ ৪–৩–৩ ফর্মেশনে খেলছে। আপনি যদি কোচ হয়ে ইনভার্টেড ফুলব্যাক ব্যবহার করেন, তাহলে হঠাৎই মাঝমাঠে খেলোয়াড় সংখ্যা ৫ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের প্রেসিংয়ের মধ্যে থেকেও আপনি বল রাখতে পারবেন, আক্রমণ গড়তে পারবেন, এবং পাসিং লেন তৈরি করতে পারবেন।
তবে সবকিছুই ঝকঝকে নয়। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—স্পেস ফাঁকা পড়ে যাওয়া। যখন ফুলব্যাক ভেতরে আসে, তখন সাইডলাইন খালি হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের দ্রুত উইঙ্গাররা সেই জায়গা কাজে লাগিয়ে কাউন্টার আক্রমণ করতে পারে। তাই ইনভার্টেড ফুলব্যাক কৌশল সফল করতে গেলে দরকার প্রচুর যোগাযোগ, ব্যাকলাইন সমন্বয় আর মিডফিল্ডারদের ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধি।
ডেটা বিশ্লেষণ বলছে, ম্যানচেস্টার সিটি যখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে, তখন তাদের বল দখলের হার গড়ে ৬৮ শতাংশের উপরে। বিপরীতে, ঐ সময় প্রতিপক্ষের শট সংখ্যা কমে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ, ইনভার্টেড ফুলব্যাক কেবল আক্রমণ বাড়ায় না, রক্ষণেও প্রভাব ফেলে।
এখন প্রশ্ন—এই পজিশনাল বিবর্তন ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
সম্ভবত, ফুলব্যাক পজিশন একদিন ‘হাইব্রিড মিডফিল্ডারে’র নতুন পরিচয় পাবে। কোচরা এমন খেলোয়াড় চাইবেন যারা একই সঙ্গে বল কাড়তে, রাখতে আর বিলি করতে সক্ষম। ফুটবলের নতুন প্রজন্মের ট্রেনিংয়েও তাই ফুলব্যাকদের মিডফিল্ড স্কিল শেখানো হচ্ছে।
তবে দিনের শেষে একটা বিষয় মেনে নিতেই হবে—এই রূপান্তর ফুটবলকে আরও বুদ্ধিদীপ্ত করেছে। এখন আর ফুলব্যাক মানে কেবল দৌড় নয়, কেবল পাস বণ্টন নয়। বরং, তারাই ছন্দ বদলায়, টেম্পো গড়ে তোলে, পুরো টিমের স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে।