অনেকে বিশ্বাসঘাতক বলেছে, কেউ বিদ্রুপ ছুড়েছে: ‘অবশেষে পায়ের জোর খুঁজে পেয়েছে’। কিন্তু ব্যঙ্গ যত খরশান, দেম্বেলের উত্থানের গ্রাফ যেন ততই প্রকট!

খেতাব হাতে দেম্বেলে
শেষ আপডেট: 23 September 2025 18:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একসময় যাঁকে নিয়ে বার্সেলোনার (Barcelona) গ্যালারিতে শিস উঠত, মিম বানত সারা দুনিয়া—আজ তাঁর হাতেই ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান। উসমান দেম্বেলে (Ousmane Dembélé)। যাবতীয় ‘তু-তু ম্যা-ম্যা’ থামিয়ে এবারের ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) জিতে নিয়েছেন তিনি। এই সাফল্য নিছক এক মরশুমে ভাল খেলার পুরস্কার নয়। এই অর্জন আদতে একটা প্রতীক… আঘাতের, হতাশার, বিদ্রুপের ধুলো থেকে উঠে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞান! এবং সবচেয়ে বড় শিক্ষা, এক অর্থে জীবনের নীতিপাঠ: অপমানকে পাথেয় করলে সেখান থেকেই শুরু হতে পারে সফলতার জয়যাত্রা।
খানিক লঘু শোনালেও, দেম্বেলের গল্প আসলে তিরস্কার থেকে পুরস্কারের কাহিনি। বার্সায় যখন নাম লেখান, প্রত্যাশার ভার ছিল পাহাড়সম। ১০০ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তি তাঁকে আচমকা বানিয়ে দেয় ইউরোপের অন্যতম দামি ফুটবলার। ‘প্রতিশ্রুতিমান’ তো বরাবরই। কিন্তু বিপুল অঙ্কের ট্যাগের চাপে হঠাৎ করেই হয়ে যান কোণঠাসা।
এহেন পরিস্থিতিতে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন যখন, ঠিক তখনই তাড়া করে চোট-আঘাতের দু:স্বপ্ন। একের পর এক চোট, লম্বা সময় বাইরে বসে থাকা… যার ফল, সমর্থকদের বিরক্তি, ক্লাবের অসিহষ্ণুতা। মাঠে নামলেই দর্শকদের বিদ্রুপ। এমনকি বার্সেলোনার ২০২২ সালের লা লিগা জয়ের পর মজা করে সতীর্থ আন্দ্রে টের স্টেগেন দেম্বেলেকে ট্রফির কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া—ছবি ভাইরাল হয় মুহূর্তে! সমর্থকরা তুলনা শুরু করে অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে। এ যেন চেনা দেম্বেলে নন, এক ‘আঘাতপ্রবণ’ তারকা। বিপুল অঙ্কের ‘ভুল বিনিয়োগ’!
অপমানে থামেননি দেম্বেলে। অপেক্ষা করেছেন। ধৈর্য ধরে নিজের শরীর, মন, খেলায় পরিবর্তন এনেছেন। আর তারপর—পাশা পালটে গিয়েছে। ট্রান্সফার মার্কেটে দল বদলে সই করেছেন পিএসজি-তে (PSG)। যেখানে তিনি শুধু দলের মূল স্তম্ভই নন, ইউরোপের মঞ্চে কোচ লুইস এনরিকের ভয়ঙ্কর অস্ত্রও বটে! ২০২৪–২৫ মরশুমে ৪৯ ম্যাচে ৩৩ গোল, ১৫ অ্যাসিস্ট—পরিসংখ্যান নিজেই কথা বলে! পিএসজি জিতেছে ঐতিহাসিক ‘কোয়াড্রুপল’—চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ ওয়ান, কুপ দ্য ফ্রঁস, ট্রফি দে চ্যাম্পিয়ঁ। সবেতেই কাণ্ডারী দেম্বেলে। ইউসিএলের ফাইনালে ইন্টার মিলানের বিরুদ্ধে পাঁচ গোলে ঐতিহাসিক জয়ের নায়কও তিনি।
গল্প কেবল সংখ্যার নয়। আড়ালে রয়েছে ব্যর্থতা থেকে শেখার পাঠ। একটা উদাহরণ দিই। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালের প্রথম লেগে আর্সেনালের বিরুদ্ধে তাঁকে শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগ তুলে বসিয়ে দেন কোচ লুইস এনরিকে। এতে আগের দেম্বেলে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নাইট ক্লাবে চলে যেতেন, ট্রেনিংয়ে হাজির হতেন। কিন্তু বদলে যাওয়া দেম্বেলে কী করলেন? সমস্ত ব্যথাকে রাগে, রাগকে শক্তিতে পরিণত করলেন। দ্বিতীয় লেগে একাহাতে বদলে দিলেন খেলা। গোল, অ্যাসিস্ট, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ—সব মিলিয়ে ইউরোপীয় মঞ্চে সেরার তকমা ছিনিয়ে নিল পিএসজি!
আর কী অদ্ভুতভাবে এই ‘পুনরুত্থানে'র সেরা প্রতীক হয়ে দাঁড়াল তাঁর পুরনো ক্লাব বার্সেলোনা। ২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে পিএসজি–র হয়ে পুরনো ডেরায় পা রাখেন দেম্বেলে। আর দর্শকদের চিরচেনা শিসকে পাত্তা না দিয়ে ন্যু ক্যাম্পকে নীরব করে বল জড়ালেন জালে, আদায় করলেন পেনাল্টি, ৪-১ ব্যবধানে হারালেন প্রাক্তন ক্লাবকে। একদা অনুরাগীরা ক্ষিপ্ত, সামাজিক মাধ্যমে আছড়ে পড়ল সুনামি: ‘এতদিন আমাদের হয়ে কিছু করল না, অথচ চলে যেতেই গোলমেশিন বনে গেল!’
অনেকে বিশ্বাসঘাতক বলেছে, কেউ বিদ্রুপ ছুড়েছে: ‘অবশেষে পায়ের জোর খুঁজে পেয়েছে’। কিন্তু ব্যঙ্গ যত খরশান, দেম্বেলের উত্থানের গ্রাফ যেন ততই প্রকট!
দেম্বেলে বদলে গেছেন। সেই ঔদ্ধত্য উধাও। ফ্রান্সের তরুণ তারকা এখন অনেক বেশি সংযত এবং আশ্চর্যজনক বিনয়ী। নইলে কেউ খেতাব জিতে বলতে পারে, ‘আমি যেসব ক্লাবে খেলেছি—স্টাদ রেঁ, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড আর আমার স্বপ্নের ক্লাব বার্সেলোনা—সবাইকে ধন্যবাদ। ওখানে আমি অনেক শিখেছি, মেসি–ইনিয়েস্তার সঙ্গে খেলার সুযোগ পেয়েছি। আজ এই ট্রফি আমার হাতে—অবিশ্বাস্য লাগছে!’ এই বক্তব্য কেবল প্রথাগত সৌজন্য নয়… দুর্গম উপত্যকা পেরোনো এক চ্যালেঞ্জিং অভিযাত্রার পূর্ণতা।
দেম্বেলের কেরিয়ার সর্বার্থে এক দোলাচলের গল্প। বার্সায় এক সিজনে ২১ ম্যাচে ১৩ অ্যাসিস্ট দিয়েও দুলতে থাকেন ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’র পেন্ডুলামে। চোট, সুযোগ হাতছাড়া, সমর্থকদের অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে ‘হারানো প্রতিভা’র লেবেল সেঁটে দেয় ফুটবল মহল। অথচ সেই একই খেলোয়াড় আজ ইউরোপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রফি তুলে ধরছেন। তাঁর এই যাত্রা আমাদের শেখায়—সাফল্য কেবল প্রতিভার উপর নির্ভর করে না। দরকার অধ্যবসায়, দরকার নিজের সীমা ছাপিয়ে নিরন্তর লড়াই। যে মানুষকে একসময় ‘দলছুট’, ‘স্বার্থপর’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হয়েছিল, তিনিই আজ ‘বিশ্বসেরা’। বিদ্রুপের পাহাড় ডিঙিয়ে উঠে দাঁড়ানোর নামই দেম্বেলে। কাব্যিক শোনালেও এটাই নিখাদ বাস্তব!