আজ লিভারপুল শুধু খেতাব রক্ষা নয়, ইউরোপ জিততে চায়। তারাই এই মুহূর্তের ‘টিম টু বিট’। কিন্তু বড় খরচে আসে বড় প্রত্যাশা। মাঠে সেই দাপট দেখানোই একমাত্র পরীক্ষা।

আলেকজান্ডার ইসাক
শেষ আপডেট: 2 September 2025 13:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কয়েক বছর আগেও ছবিটা একদম অন্যরকম ছিল। য়ুর্গেন ক্লপের ছত্রচ্ছায়ায় লিভারপুল মানেই ‘আন্ডারডগ স্পিরিট’… যেন বক্সিং রিংয়ে রকি বালবোয়া। ধনীদের বীরপুত্র ইভান দ্রাগোকে হারানোর মরণপণ জেদ নিয়ে যে হাতে গ্লাভস গলিয়ে নেয়!
জার্মান কোচ কখনও গোপন করেননি তাঁর দর্শন। যার ভিত্তিতে দলের ফুটবলারদের তৈরি করেন তিনি। দেন যুদ্ধজয়ের মন্ত্র! ক্লপ বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সেরা দল হতে চাই না, চাই বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন দল হতে!’
অথচ তিনি স্বেচ্ছায় মসনদ ছাড়তেই কী আশ্চর্যজনকভাবে বদলে গিয়েছে লিভারপুল! পালটে গিয়েছে বাণিজ্যের অঙ্ক, খেলোয়াড় কেনাবেচার বিন্যাস! অ্যাকাডেমি-নির্ভরতার প্রজন্মবাহিত ট্র্যাডিশন ভেঙে আর্নে স্লটের টিম এখন আর আন্ডারডগ ‘রকি’ নয়, হাড়েমজ্জায় বিলাসী চ্যাম্পিয়ন! যারা নিছক লড়ে যেতে, টিকে থাকতে নয়… জেতার জন্য ময়দানে নামছে!
একসময় রিয়াল মাদ্রিদের নাম শুনলেই মনে পড়ত ‘গ্যালাকটিকোসে’র কথা। ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের হাত ধরে জিনেদিন জিদান, লুইস ফিগো, রোনাল্ডো, বেকহ্যাম—তারকা সমাবেশে ভরে ওঠে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। আর আজ সেই তকমাটা অক্লেশে, অনায়াসেই জুড়ে দেওয়া যায় লিভারপুলের সঙ্গে। কারণ, আলেকজান্ডার ইসাকের (Alexander Isak) রেকর্ড-ভাঙা চুক্তিতে আনফিল্ডে শুরু হয়ে গেল নতুন অধ্যায়। যার বুনিয়াদ নিছক কৌলিন্য নয়। বদলে: অর্থ, বিত্ত, জৌলুস!
চলতি গ্রীষ্মে ইসাক, তার আগে ফ্লোরিয়ান ভিরৎস (Florian Wirtz), হুগো একিতিকে (Hugo Ekitike)—সব মিলিয়ে ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ডের কেনাকাটা সেরেছে লিভারপুল। ব্রিটিশ ফুটবল ইতিহাসের এক মরশুমে দু’বার রেকর্ড ভেঙেছে তারা—প্রথমে ভিরৎস, পরে ইসাক। এতদিন লিভারপুল মানে ছিল ভবিষ্যতের তারকা তৈরি… এখন সরাসরি প্রতিষ্ঠিত তারকাদের কিনে আনা। ফলাফল? ইউরোপীয় বাজারে ইংল্যান্ডের ক্লাব বায়ার্ন, রিয়াল বা ম্যান সিটির তালিকায় নিজেদের টেনে তুলেছে। এককালে ট্রান্সফার মার্কেটে চাতুর্যই ছিল শক্তি, এবার বস্তাভরা টাকা খরচই আসল ফ্যাক্টর।
য়ুর্গন ক্লপ কাউকে সই করাননি—ভাবা ভুল। কিন্তু ভার্জিল ভ্যান ডাইক বা অ্যালিসনকে কিনেছিলেন যখন, সেগুলো ছিল ব্যতিক্রমী ‘বড়মাপের ডিল’। সীমিত বাজেটে রত্ন খুঁজে বের করার যে স্ট্র্যাটেজি মেনে এসেছে লিভারপুল, তাকেই অনুসরণ করেন ক্লপ। আজ সেই ব্যতিক্রমই নিয়মে পরিণত হয়েছে। যে কারণে বোঝা যাচ্ছে স্লটের তত্ত্বাবধানে লিভারপুল আর ‘আন্ডারডগ’ নয়—তাদের নজর স্রেফ ট্রফির দিকে।
এতে ভুল কিছু নেই। সমর্থকরাও বড়সড় সাফল্যের আশায় বুক বাঁধতেই পারেন। কারণ, ভিরৎস ও ইসাক—দু’জনই কেরিয়ারের সেরা সময়ে আনফিল্ডে পা রাখছেন। তাই ভক্তদের আবেগ তুঙ্গে। যদিও এই প্রিমিয়াম প্রাইস ট্যাগ নতুন খেলোয়াড়দের কাঁধে বিপুল চাপের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে। ব্রিটিশ রেকর্ড ভেঙে কোনও ফুটবলারকে আনলে প্রত্যাশাও আকাশছোঁয়া হয়। সাফল্য না পেলে সমালোচনার ঝড় বইবে। ইতিহাস এর সাক্ষী। ১৯৮৮ সালে ইয়ান রাশকে ফিরিয়ে আনার পর লিভারপুল মনে করেছিল শিরোপা জয় সহজ হবে, কিন্তু সব হিসেব ওলটপালট করে দেয় আর্সেনাল।
মালিক গোষ্ঠী ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ (FSG) কিন্তু অবিবেচকের মতো খরচ করার পাত্র নয়। তারা বিক্রি করে তুলেছে ২০০ মিলিয়নেরও বেশি। তাই নিট ব্যালান্স নিয়ন্ত্রণে। আসলে বড় বিনিয়োগটা কেবল সময়ের খেলা। ভ্যান ডাইক–সালাহর কনট্রাক্ট শেষ হবে ২০২৭ সালে। তার আগেই উত্তরসূরি গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। ইসাক, একিতিকে, জিওভান্নি লেয়োনি—সবই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
দলের স্তম্ভ, এত তারকার ভিড়েও সমুজ্জ্বল যিনি, সেই মো সালাহ স্বীকার করেছেন, বড় কেনাকাটার ইঙ্গিত তিনি আগেই পেয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠছে: ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের কানেও কি সেই তথ্য গেছিল?
আজ লিভারপুল শুধু খেতাব রক্ষা নয়, ইউরোপ জিততে চায়। তারাই এই মুহূর্তের ‘টিম টু বিট’। কিন্তু বড় খরচে আসে বড় প্রত্যাশা। মাঠে সেই দাপট দেখানোই একমাত্র পরীক্ষা। কাগজে-কলমে আনফিল্ডের নতুন ‘গ্যালাকটিকোস’ তৈরি। কিন্তু এই তারারাজি ঝলমল করবে ট্রফি জিতে, নাকি চাপের ভারেই নিভে যাবে?—সেটা স্পষ্ট হবে সিজন শেষে।