লিভারপুল তাঁকে স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের কাছে পাঠায়। এতে দ্বিধা ছিল বিস্তর—যদি অতিরিক্ত শান্ত হয়ে যান? যদি মাঠের আগুন মিইয়ে যায়?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 September 2025 16:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরিয়ারজুড়ে যেমন গোলের বন্যা, তেমনই বিতর্কের ছড়াছড়ি। লুইস সুয়ারেজের (Luis Suárez) নাম উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে একের পর এক ‘কামড়-কাণ্ড’! ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচ থেকে জর্জিও কিয়েল্লিনি—তালিকা কম লম্বা নয়।
আগে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কাঁধে-ঘাড়ে কামড় বসাতেন। আজকাল থুতু ছিটিয়ে খবরের শিরোনামে। সম্প্রতি লিগস কাপ ফাইনাল হেরে যাওয়ার পর বিপক্ষ শিবিরের কোচকে লক্ষ্য করে নিষ্ঠীবন নিক্ষেপ করেন সুয়ারেজ!
যে কারণে ফুটবল দুনিয়ার একটাই প্রশ্ন: কেন এমনটা করেন উরুগুয়ের মহাতারকা? এর জবাব অবশ্য দিয়েছিলেন সুয়ারেজ নিজে। গত বছর। একটি সাক্ষাৎকারে। মেলে ধরেছিলেন মানসিক দোলাচল… লজ্জা আর আত্মসমর্পণের গল্প।
২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে কুখ্যাত কামড়ের পর ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সুয়ারেজের স্মৃতিচারণ, ‘ড্রেসিংরুমে মাথা তুলতে পারছিলাম না। সতীর্থদের চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না। এল মাস্ত্রো (অস্কার তাবারেজ) বলেন, ‘সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছে। জানিয়েছি, আমি কিছু দেখিনি… সব অস্বীকার করেছি!’ তখন আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—আমি দলকে ডুবিয়েছি!’
শাস্তি ঘোষণার মুহূর্তটাও যেন মুছে যায়নি তাঁর মনে থেকে। ন’টি ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন, অনেক স্টেডিয়ামে ঢোকা আটকে যায়। সুয়ারেজের স্বীকারোক্তি, ‘অপরাধীর চাইতেও খারাপ ব্যবহার করা হয়েছিল। একজন খেলোয়াড় শাস্তি পেতে পারেন। কিন্তু কি করে তাঁকে সতীর্থদের পাশে দাঁড়ানো থেকে বঞ্চিত করা যায়?’
পাশাপাশি ফিফাকে একহাত নিয়ে চ্যালেঞ্জের সুরে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। বলেন, ‘কারও পা ভেঙেছে, নাক ভেঙেছে—এমন ঘটনার পরও কখনও এমন শাস্তি হয়নি। জিদান ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে মাথা দিয়ে মাতেরাজ্জিকে ঢুঁসো মেরেছিলেন। মাত্র তিন ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা। অথচ আমাকে সব স্টেডিয়াম থেকে নির্বাসিত করা হল!’
কিন্তু অভিযোগ সত্ত্বেও আত্মসমালোচনায় কুন্ঠিত নয় সুয়ারেজ। কেন কামড়াতেন তিনি? স্পষ্ট প্রশ্নের জবাবে তাঁর স্পষ্ট উত্তর: ম্যাচের কঠিন মুহূর্তে তাঁর শরীর আর মাথা একসঙ্গে কাজ করত না। রক্তচাপ চড়ত, অ্যাড্রেনালিন ছুটত, মাথার ভিতর ‘রিলিজ ভাল্ব’ বন্ধ হয়ে যেত। তখন ছোট ভুল থেকে বড় ভুল।
যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা শুধু ব্যক্তিগত প্রবণতা নয়, আধুনিক ক্রীড়া মনস্তত্ত্বে বহুল চর্চিত ইস্যু। অনেক খেলোয়াড় চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন, কারও প্রতিক্রিয়া হয় রাগ, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কারও বা একেবারে ছকভাঙা, বিদ্ঘুটে রিঅ্যাকশন—সুয়ারেজের ক্ষেত্রে সেটাই দাঁত বসানো!
আগ্রাসন ফুটবলের অংশ। যে কোনও স্ট্রাইকার জানেন, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার তাঁকে উত্যক্ত করবে, আঘাত করবে। কেউ উত্তর দেন লড়াই করে, কেউ উপেক্ষায়! সুয়ারেজ বেছে নেন আত্মধ্বংসী পথ। ঘুষি মারলে হয়তো কয়েকদিনেই ভুলে যাওয়া যেত। কিন্তু কামড় তাঁকে বিশ্বমঞ্চে হাসির খোরাক বানিয়ে তুলেছে। এখানেই ফুটে ওঠে তাঁর অস্থিরতা—সর্বদা অহেতুক দায়িত্ব নেওয়া, সবকিছু নিজের কাঁধে টেনে নেওয়া আর সবমিলিয়ে ব্যর্থতার চাপা ভয়।
প্রথম কামড়ের ঘটনার পর বাড়ি ফিরে টিভি দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়ের চোখে বাবাকে কীভাবে দেখা হবে—সেটাই তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। স্ত্রী সোফি সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কী ভেবেছিলে?’
তখনই সুয়ারেজ বুঝেছিলেন, মনোবিদের সাহায্য ছাড়া পথ নেই। লিভারপুল তাঁকে স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের কাছে পাঠায়। এতে দ্বিধা ছিল বিস্তর—যদি অতিরিক্ত শান্ত হয়ে যান? যদি মাঠে তাঁর আগুন মিইয়ে যায়? এই দ্বন্দ্ব খেলার দুনিয়ার বহু আগ্রাসী প্রতিভারই চেনা সমস্যা। প্রতিযোগিতার তীব্রতা আর ব্যক্তিত্বের উচ্ছ্বাস—দুটোকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর।
সুয়ারেজ এখন কেরিয়ারের প্রান্তলগ্নে। শিখেছেন, চাপ জমিয়ে রাখলে ফল ভয়াবহ। জানেন, টেনশন ভাগ করে নিলে হালকা হয়। খেলার মাঠে আগ্রাসন চাই, কিন্তু সেটা যেন অনিয়ন্ত্রিত না হয়ে ওঠে!