২০১৬ সালে লেস্টার পৃথিবীকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। ২০২৬ সালে তারাই মনে করিয়ে দিচ্ছে—ফুটবলে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। উত্থান যত বেশি, পতনের বেদনাও ঠিক ততটাই গভীর।

হামজা চৌধুরি
শেষ আপডেট: 12 March 2026 18:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠিক দশ বছর আগের কথা। ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পটা লিখেছিল লেস্টার সিটি (Leicester City)। সিজনের শুরুতে প্রিমিয়ার লিগে শিরোপা জেতার সম্ভাবনা ছিল পাঁচ হাজারে এক। কার্যত কেউ-ই সেভাবে বাজি ধরেননি। কিন্তু ক্লদিও রানিয়েরির দল অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামে এসেছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের রাত, আতলেতিকো মাদ্রিদের মতো দলের বিরুদ্ধে লড়াই জমেছিল! গোটা ফুটবল দুনিয়া তখন লেস্টারের দিকে চেয়ে।
২০২৬ সালে সেই স্মৃতি ধূসর, যেন অন্য জগতের বস্তু! আজ লেস্টার লড়ছে থার্ড ডিভিশনে না নামার জন্য। স্বপ্নের পতন এতটাই প্রবল, এতখানি মর্মান্তিক!
ব্রিস্টলকে হারিয়ে অক্সিজেন জুটলেও চাপ কমেনি
টানা ১০ ম্যাচে জয় আসেনি। সেই রাহুর দশা মুছে ব্রিস্টল সিটিকে ২-০ গোলে হারিয়েছে লেস্টার। বেন নেলসনের হেড ও আব্দুল ফাতাউয়ের ভলিতে তিন পয়েন্ট এলেও ম্যাচের সেরা গোলকিপার জাকুব স্তোলার্চিক। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি বাঁচিয়ে ক্লিনশিট নিশ্চিত করলেন তিনি—৩১ ম্যাচের পর প্রথমবার। এই পরিসংখ্যানটাই বলে দেয়, অবস্থা কতটা শোচনীয়!
কোচ গ্যারি রাউয়েটের অধীনে দল তিনটে পয়েন্ট পেল, রেলিগেশন জোন থেকে বেরোল। কিন্তু মাথার উপর আরেক বিপদ—ঐতিহাসিক আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে ছয় পয়েন্ট কাটা যেতে পারে। সেটা হলে অবনমন প্রায় নিশ্চিত!
হামজা চৌধুরি—আস্থার মুখ
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরি (Hamza Choudhury) এই টিমের অন্যতম ভরসা। লেস্টারের সাফল্যের দিনগুলোয় উঠে এসেছিলেন, ঘরোয়া কাপও জিতেছেন। এখন স্রেফ টিকে থাকার লড়াই। চ্যাম্পিয়নশিপের মতো শারীরিক লিগে তাঁর রণং দেহী মানসিকতা জরুরি, দল সেটা পাচ্ছেও। কিন্তু একা হামজার পক্ষে যাবতীয় সমস্যার ভার বয়ে চলা সম্ভব নয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশীয় সমর্থকদের কাছে হামজা শুধু একজন খেলোয়াড় নন, প্রতিনিধিও বটে। তাই লেস্টারের এই পতন সবার কাছে বেদনার।
এই অবস্থার জন্য দায়ী কে?
প্রশ্নটা সহজ, উত্তর জটিল।
আসলে লেস্টারের পতন হঠাৎ নয়, এসেছে ধীরে। একসময় এনগোলো কান্তে, রিয়াদ মাহরেজের মতো অসাধারণ খেলোয়াড় খুঁজে এনেছিল যে ক্লাব, তাদের সেই স্কাউটিং জিনিয়াস কোথায় হারিয়ে গেল কেউ জানে না। দামি ট্রান্সফারে টাকা ঢালা হয়েছে, ফল আসেনি। ইউরোপিয়ান ফুটবল ছাড়াই ‘বিগ সিক্সে’র মতো বেতন কাঠামো বজায় রাখা হয়েছে। ফলে ক্রমশ বেড়েছে আর্থিক ঘাটতি। এখন সেই দায়ের বোঝা কোর্টে গড়াচ্ছে। তা ছাড়া ব্রেন্ডান রজার্সের বিদায়ের পর একের পর এক কোচ বদলে স্থায়িত্ব উধাও! প্রিমিয়ার লিগ থেকে চ্যাম্পিয়নশিপে নামার ধাক্কা সামলানোর মতো কৌশলগত পরিচয় লেস্টার অর্জন করেনি।
তৃতীয় ডিভিশনে নামলে বিপর্যয়
রেলিগেশন হলে শুধু ফলাফলের বিষয় নয়—এতে প্রবল আর্থিক ধ্বস নামবে। লিগ ওয়ানে রেলিগেশনের জেরে টিভি স্বত্ব, স্পনসর, খেলোয়াড়ের বাজারমূল্য—সব একসঙ্গে তলিয়ে যেতে পারে। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন আদৌ সম্ভব কিনা বলা মুশকিল!
রাউয়েটের দল লড়াই করছে। ব্রিস্টলের বিরুদ্ধে জয় বলছে, মনোবল এখনও অটুট। কিন্তু পয়েন্ট কাটার খাঁড়া মাথার উপর থাকলে লড়াই আরও কঠিন হয়ে যায়। ২০১৬ সালে লেস্টার পৃথিবীকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। ২০২৬ সালে তারাই মনে করিয়ে দিচ্ছে—ফুটবলে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। উত্থান যত বেশি, পতনের বেদনাও ঠিক ততটাই গভীর।