মোলিনিউয়ের শীতল রাতে কাল শুধু দু’পয়েন্ট হারায়নি গানার্সরা। আত্মবিশ্বাসেও চিড় ধরেছে। এখন দেখার, রবিবারের ডার্বিতে কী জবাব দেয় আর্তেতার ছেলেরা।

উলভস বনাম আর্সেনাল
শেষ আপডেট: 19 February 2026 10:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাল রাতে প্রিমিয়ার লিগে খেলতে নেমেছিল এমন দুই টিম, যাদের পয়েন্ট টেবিলে অবস্থান একটা স্ক্রিনশটে নেওয়া অসম্ভব! এর জন্য দু'বার স্ক্রিন নামাতে হবে। একদিকে আর্সেনাল। লিগে এক নম্বরে। কারাবাও কাপের ফাইনালিস্ট৷ চ্যাম্পিয়নস লিগের একমাত্র অপরাজেয় দল। এফএ কাপেও খেতাবের দৌড়ে। অন্যদিকে উলভস৷ প্রিমিয়ার লিগের সর্বকালের নিকৃষ্ট টিম (পয়েন্টের বিচারে)। গতকালের আগে পর্যন্ত ২৬ ম্যাচে ঝুলিতে সাকুল্যে ৭ পয়েন্ট!
এমত পরিস্থিতিতে ম্যান সিটি পিছু ধাওয়া করছে বুঝে, গত দু'বার রানার্স হওয়ার যন্ত্রণা কী বস্তু জেনে গানার্সরা সহজেই ম্যাচ জিতে নেবে—আশা করেছিলেন অনেকেই। প্রথমার্ধের শুরুতে এগিয়ে যাওয়া, দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান বাড়ানোয় সে আশা উজ্জ্বলও হয়৷ কিন্তু দু'গোলের লিড লিগের লাস্ট বয়দের বিরুদ্ধে এভাবে হাতছাড়া হবে, তাও গোলকিপারের ছেলেমানুষি ভুলে সংযুক্ত সময়ে গোল হজম করতে হবে—এমনটা অতিবড় সমর্থক বা শত্রু কেউই হয়তো অনুমান করেননি!
কিন্তু কাল রাতে ঠিক এমনটাই হল। শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরাল উলভস। অবনমনের লজ্জা ভুলে ঘরের মাঠে দেখাল স্বভাবোচিত জেদ আর উগ্রাসন৷ অন্যদিকে দু'পয়েন্ট খুইয়ে ম্যান সিটির থেকে এক ম্যাচ বেশি খেলে লিগ টেবিলে এক নম্বরে থাকলেও সুখে নেই আর্সেনাল৷ পেপ গুয়ার্দিওলার ছেলেরা রবিবার নিউক্যাসেলের বিরুদ্ধে নামছে। সেই ম্যাচ জিতে নিলে ব্যবধান কমে দাঁড়াবে মাত্র দু'পয়েন্টে! যে খেতাবি দৌড় কয়েক সপ্তাহ আগেও মনে হচ্ছিল খতম, আর্সেনালের নিজেদের ভুলে তা আবারও জেগে উঠেছে!
নাটকীয় প্রথমার্ধ
মোলিনিউয়ে শুরুটা ছিল একেবারে স্বপ্নের। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই গোল করেন বুকায়ো সাকা (Bukayo Saka)। নতুন পাঁচ বছরের চুক্তিতে সই করার পরই যেন প্রতিদান উপহার দিলেন সমর্থকদের। গতকাল খেললেন ‘নম্বর ১০’ ভূমিকায়। ডেকলান রাইসের (Declan Rice) নিখুঁত ক্রস আর সাকার বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট—১-০ আর্সেনাল!
প্রথমার্ধে বলের দখল, পাসিং, গতি—সব দিকেই এগিয়ে ছিল গানার্সরা। কিন্তু দ্বিতীয় গোল আসব আসব করেও আসছিল না। এর জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৫৬ মিনিট। পিয়েরো হিঙ্কাপিয়ে (Piero Hincapie) ডিফেন্স চিরে সুন্দর ফিনিশে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। অফসাইডের পতাকা উঠেছিল কিন্তু ভিএআর (VAR) সিদ্ধান্ত পালটে গোলের সংকেত দেয়। ২-০। লিগের তলানির দল। এখানেই ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার কথা ছিল।
উলভসের কামড়, রক্ষণের বিভ্রান্তি
কিন্তু ফুটবল তো অনুমানে চলে না। যা বোঝাতেই যেন পাঁচ মিনিটের মধ্যে হুগো বুয়েনো (Hugo Bueno) দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে গোল করে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন উলভসকে (Wolves)। ২-১। নিষ্প্রাণ গ্যালারিতে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা।
তারপর থেকে ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে ম্যাচের হাওয়া। আর্সেনালের ডিফেন্সে অস্থিরতা। বল ক্লিয়ার করতে দেরি। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ হারানো। গোলকিপার ডেভিড রায়া ও ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েলের সমন্বয়ের অভাব… যার চরম মূল্য চোকাতে হয় সংযুক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে। আর্সেনাল ডিফেন্সে বিভ্রান্তির সুযোগ হাতছাড়া করেননি পরিবর্ত হিসেবে নামা ১৯ বছরের টম এডোজি (Tom Edozie)। তাঁর শট রিকার্দো ক্যালাফিওরির (Riccardo Calafiori) গায়ে লেগে জালে জড়ায়। স্কোর ২-২। এটাই চূড়ান্ত ফলাফল। এরপর ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ই ছিল না সাকাদের হাতে!
এই রেজাল্ট কতটা অপ্রত্যাশিত সেটা বুঝিয়ে দেবে এই তথ্যটুকু: ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে প্রথমবার টেবিলের একেবারে শেষে থাকা দল, যারা দুই গোলে পিছিয়ে, তারা লিডারদের বিরুদ্ধে হার এড়াল! আর্সেনালের কাছে এ এক নির্মম খতিয়ান!
আর্তেতার আক্ষেপ: ‘স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছইনি’
ম্যাচ শেষে স্পষ্ট হতাশ মিকেল আর্তেতা (Mikel Arteta)। তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘দ্বিতীয়ার্ধে কোনও দিক থেকেই আমরা প্রিমিয়ার লিগ জেতার মতো মান দেখাতে পারিনি। যার দাম দিতে হয়েছে।’ এই সিজনে সাতটি ড্র। ম্যাচ জেতার জায়গা থেকে পয়েন্ট খোয়ানোর সংখ্যাও বেড়েছে। গত কয়েক মরসুমেও এপ্রিল-মে-তে এমন স্লিপ-আপ শিরোপা হাতছাড়া করেছে। এবারও কি তার অন্যথা হবে না? সাকা নিজেও মেনে নিয়েছেন, ‘দ্বিতীয়ার্ধে আমরা নিজেদের মান থেকে অনেকটা নিচে নেমে গিয়েছিলাম!’
শুধু মানসিক চাপ? নাকি আত্মতুষ্টি? উলভস কোচ রব এডওয়ার্ডসের (Rob Edwards) বক্তব্য, ‘আমরা জানতাম ওরা বিরাট প্রেসারে রয়েছে। সেটা কাজে লাগিয়েছি মাত্র।’
শিরোপার অঙ্কে নতুন মোড়
এখন অঙ্ক সহজ। আর্সেনালের লিড নয় থেকে সাত হয়ে পাঁচে নেমেছে। ম্যান সিটির (Manchester City) হাতে রয়েছে একটি অতিরিক্ত ম্যাচ। এপ্রিলে এতিাহাদ (Etihad Stadium) দুই দল মুখোমুঝি হতে চলেছে। যা পরিস্থিতি, তাতে সেই দ্বৈরথ লিগ খেতাবের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
আর্সেনালের সামনে লন্ডন ডার্বি—টটেনহ্যাম (Tottenham) ও চেলসি (Chelsea)। এই মুহূর্তে ছন্দ ফিরিয়ে আনা জরুরি। কারণ শেষ ৭ ম্যাচে মাত্র ২ জয়। শিরোপা জিততে হলে ‘মার্সি’ নয়, ‘মার্সিলেস’ হতে হয়। দুই গোলে এগিয়ে থেকেও ম্যাচ শেষ করতে না পারা—এটাই এখন বড় প্রশ্নচিহ্ন। গানার্সরা কি মানসিকভাবে প্রস্তুত? নাকি ইতিহাসের ভূত আবার তাড়া করবে? এমিরেটস কিন্তু স্বস্তিতে নেই!
মোলিনিউয়ের শীতল রাতে কাল শুধু দু’পয়েন্ট হারায়নি গানার্সরা। আত্মবিশ্বাসেও চিড় ধরেছে। এখন দেখার, রবিবারের ডার্বিতে কী জবাব দেয় আর্তেতার ছেলেরা। শিরোপার লড়াই এখনও শেষ হয়নি—কিন্তু অ্যাডভান্টেজ কি ধীরে ধীরে সিটির দিকে সরে যাচ্ছে?