লিগ দীর্ঘ। এক ম্যাচে পাকা সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও বোকামো। কিন্তু কখনও কখনও এক ম্যাচই স্রোত বদলের ইঙ্গিত দেয়। এজেজ্জারির আগমন লাল-হলুদ শিবিরে সেই সংকেত পৌঁছে দিয়েছে।

ইউসেফ এজেজ্জারি
শেষ আপডেট: 17 February 2026 13:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সল্টলেকের গ্যালারির দুঃস্বপ্নের স্মৃতি বেশ লম্বা। বহু বছর ধরে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা গোলের খরা, সুযোগ নষ্ট, বিদেশি স্ট্রাইকারের ব্যর্থ পরীক্ষার সাক্ষী। কিন্তু সোমবার রাতে দৃশ্যটা বদলে গেল। ইস্টবেঙ্গল (East Bengal FC) ৩-০ গোলে হারাল নর্থইস্ট ইউনাইটেড–কে (NorthEast United FC)। আর সেই জয়ের ফোকাসে একটাই নাম—ইউসেফ এজেজ্জারি (Youssef Ezzejjari)।
অভিষেক ম্যাচে জোড়া গোল। ৬৫ মিনিটের মধ্যে প্রথম আইএসএল (ISL 2025-26) গোল। ১৮ হাজার সমর্থকের সামনে এমন আত্মপ্রকাশ কেবল স্কোরলাইন নয়, মানসিক বার্তাও পৌঁছে দেয়—এই মরসুমে লাল-হলুদের বক্সে কেউ আছে, যে ‘শেষ কাজটুকু’ করতে জানে।
গোলের গন্ধ পাওয়া স্ট্রাইকার
এজেজ্জারি (Youssef Ezzejjari) দীর্ঘদেহী। কিন্তু তিনি কেবল ‘টার্গেট ম্যান’ নন। তাঁর খেলার ধরন মূলত বক্সকেন্দ্রিক। প্রথম গোলের ক্ষেত্রে ডিফেন্ডারের থেকে বল গিয়ে পৌঁছয় বিপিন সিংয়ের (Bipin Singh) পায়ে, বাম দিক থেকে ক্রস। এজেজ্জারি জায়গা বুঝে উপরে উঠে হেড। কোনও বাড়তি টাচ নেই। খাঁটি স্ট্রাইকারের কাজটুকু সেরে ফেলতে জানেন।
পাঁচ মিনিট পর এল দ্বিতীয় গোল। এডমুন্ড লালরিনডিকার (Edmund Lalrindika) লব ডিফ্লেক্ট হয়ে বক্সে। এজেজ্জারি ঠিক জায়গায় হাজির। ‘রাইট প্লেস, রাইট টাইম’—এই ক্লিশে বাক্যটাই আসলে নিখুঁত স্ট্রাইকারের অভিজ্ঞান। লাল-হলুদ শিবির বহু বছর ধরে এই জাতের স্ট্রাইকারের অভাবেই ভুগেছে।
আর এখানেই সমর্থকদের স্বপ্ন দেখার শুরু। কারণ গোল করা শেখানো যায় না, শেখা যায় না। সেটি ‘ইনস্টিংক্ট’। গতরাতে লাল-হলুদ জার্সিতে দুরন্ত অভিষেকেই এজেজ্জারি দেখালেন, তাঁর ইনস্টিংক্ট কতটা তীব্র!
হাই-প্রেসের সৈনিক: অস্কারের পরিকল্পনায় মানানসই
এই জয়ের কৃতিত্ব কেবল স্ট্রাইকারের নয়, কোচেরও। অস্কার ব্রুজো (Oscar Bruzon) শুরু থেকেই হাই-লাইন ডিফেন্স ও আক্রমণাত্মক প্রেসিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। এই প্ল্যানিংয়ে প্রথম রক্ষক আসলে স্ট্রাইকার। এজেজ্জারি সেই দায়িত্বও পালন করেছেন। শুধু গোল নয়, সমানতালে প্রেসিং-ও চালিয়েছেন। বল হারালেই সামনে থেকে চাপ। নর্থইস্টের ডিফেন্ডারদের সময় দেননি। এতে মিডফিল্ডের উপর চাপ কমেছে। লাল-হলুদ খেলোয়াড়রা দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করেছেন।
গত কয়েক মরসুমে ইস্টবেঙ্গলের বিদেশি স্ট্রাইকাররা অনেকেই অপেক্ষা করতেন ফাইনাল সার্ভিসের। এজেজ্জারি নিজে খেলা গড়ায় অংশ নিতে আগ্রহী। এই মানসিকতা ইস্টবেঙ্গলে নতুন।
পরিসংখ্যান বলছে তিনি ‘ধারাবাহিক’
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—সিঙ্গাপুর লিগ থেকে আসা স্ট্রাইকার কতটা সফল হবেন? পরিসংখ্যান যদিও অন্য কথা বলছে। ইন্দোনেশিয়ার পারসিক কেদিরিতে (Persik Kediri) ৩২ ম্যাচে ১৮ গোল। সিঙ্গাপুর প্রিমিয়ার লিগে (Singapore Premier League) ৬ ম্যাচে ৫ গোল। মানে, ধারাবাহিকতা আছে। এজেজ্জারি শুধু এক সিজনের ‘বিস্ময়’ নন।
অভিষেক ম্যাচে ৩ শটে ২ গোল—এই দক্ষতা আইএসএলে বিরল। অনেক সময় দেখা যায় স্ট্রাইকার ৬-৭ খানা সুযোগ নষ্ট করেন, গোল আসে একটা। এজেজ্জারি যদিও এই ছকে পড়েন না। তাঁর স্টাইল আশ্বাস জোগাচ্ছে। কার্যকারিতা (Efficiency) যত বেশি, দল তত কম সুযোগ তৈরি করেও জিততে পারে। লিগ ফুটবলে এটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—‘টাইম টু গোল’। কাল ৬৫ মিনিটে প্রথম গোল। কোনও অভিযোজনের সময় নেননি এজেজ্জারি। এশিয়ার বিভিন্ন লিগে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। কলকাতার আর্দ্রতা, শারীরিক ফুটবল—এর কোনও কিছুই তাঁর কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ নয়।
শুধু গোল নয়, জায়গা তৈরি করার ক্ষমতা
একজন ভালো স্ট্রাইকার নিজে গোল দেন। একজন বড় স্ট্রাইকার অন্যদের গোল করতেও সাহায্য করেন। এজেজ্জারির উপস্থিতি নর্থইস্টের দুই সেন্টার-ব্যাককে ব্যস্ত রেখেছিল। ফলে বিপিন সিং (Bipin Singh), লালরিনডিকা (Edmund Lalrindika), মিগেল ফেরেইরা (Miguel Figueira) বেশি জায়গা পেয়েছেন। শেষ গোল এসেছে মিগেল ফেরেইরার পা থেকে। কিন্তু তার আগে পুরো ম্যাচ জুড়ে নর্থইস্টের ডিফেন্সকে বক্সে চেপে রেখেছিল এজেজ্জারির অস্থির নড়াচড়া। এই জায়গা-তৈরির ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে দলের আক্রমণকে বহুমাত্রিক করবে।
অবশ্য ইস্টবেঙ্গলের জন্য সতর্কবার্তাও আছে। হাই-লাইন ডিফেন্সে অনওয়ার আলি (Anwar Ali) ও জিকসনের (Jixson Singh) জুটি মাঝেমধ্যেই সমস্যায় পড়েছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ এর ফায়দা নেবে। তাই দলগত ভারসাম্য জরুরি। এই অবস্থায় সামনে একজন নির্ভরযোগ্য ফিনিশার থাকলে ছোট ভুলচুক ঢেকে দেওয়া সহজ।
সব মিলিয়ে লিগ দীর্ঘ। এক ম্যাচে পাকা সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও বোকামো। কিন্তু কখনও কখনও এক ম্যাচই স্রোত বদলের ইঙ্গিত দেয়। এজেজ্জারির আগমন লাল-হলুদ শিবিরে সেই সংকেত পৌঁছে দিয়েছে।