এই জীবন বদলে যাওয়া নিয়ে সবাই একই রকম নিঃসন্দিগ্ধ নন। কেউ ক্লিনচিট দেওয়ার ঢঙে বলছেন, ‘অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার উদাহরণ!’ কিন্তু পাশাপাশি সংশয়ীদের সওয়াল: ‘অতীত কি এত সহজে মুছে যায়?’

মেসির সঙ্গে আলভেস
শেষ আপডেট: 29 October 2025 15:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক সময় মাঠে ছুটতেন রাইট উইং বরাবর। ক্রস বাড়াতেন লিওনেল মেসিকে। দেশের জার্সিতে নেইমারকে। বার্সেলোনার অন্যতম স্তম্ভ। ব্রাজিলের বিশ্বস্ত সৈনিক!
এরপর মাঠের জীবন ছাপিয়ে অন্ধকার কারাবাস। যৌন হেনস্থার দায়ে জেলে কাটাতে হয় ১৪ মাস। আগাপাশতলা সবকিছু বদলে যায় দানি আলভেসের! কেরিয়ারের যাবতীয় লাইমলাইট উবে গিয়ে একফালি কুঠুরির নিঃসঙ্গ জীবন!
যখন মনে হচ্ছিল, সবই বুঝি গিয়েছে মুছে, মুক্তি নেই, কিংবা পেলেও আর মিশে যেতে পারবেন না স্বজনদের বৃত্তে—ঠিক তখনই বিরাট চমক! এখন আর জেলের সেলে বন্দি নন আলভেস… বদলে মাঠের টাচলাইন দাপিয়েও বেড়াচ্ছেন না তিনি… বদলে হররোজ দাঁড়াচ্ছেন গির্জার পোডিয়ামে, ভরা মঞ্চে, মাইক্রোফোন হাতে।
নির্বাক নন, নিশ্চুপ নন ব্রাজিলের প্রাক্তন তারকা। মুখ খুলছেন। কিন্তু ফুটবল নিয়ে নয়। বদলে যাওয়া জীবন আর বোধকে মেলে ধরছেন সাধারণ মানুষের সামনে। যে ‘অন্ধকার’ তিনি দেখেছেন আর চিনেছেন ‘আলো’-কে, ব্যাখ্যা করছেন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে। বলছেন, ‘আমি ঈশ্বরের সঙ্গে এক চুক্তি করেছি!’ বার্সেলোনা (Barcelona) ও ব্রাজিলের (Brazil) কিংবদন্তি ফুটবলার দানি আলভেস (Dani Alves) ধরা দিচ্ছেন এক নতুন পরিচয়ে—ধর্মপ্রচারক রূপে! জিরোনার (Girona) একটি গির্জায় সম্প্রতি দেখা যায় ৪২ বছর বয়সি প্রাক্তন ডিফেন্ডারকে, যেখানে তিনি উপস্থিত বিশ্বাসীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ঈশ্বরের বার্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে। নিজে তার প্রমাণ। আমি ঈশ্বরের সঙ্গে এক চুক্তি করেছি!’
মাত্র কয়েক মাস আগেই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন দানি আলভেস। ২০২২ সালে বার্সেলোনার নাইটক্লাবে এক মহিলাকে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এর পর দীর্ঘ ১৪ মাস কাটাতে হয় জেলে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত চার বছর ছ’মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। কিন্তু চলতি বছরের মার্চে কাতালোনিয়ার হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ—‘প্রমাণে অসঙ্গতি রয়েছে!’
এই নির্দেশ কার্যত আলভেসের জীবনে এক নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। জেলমুক্তির পর থেকেই তিনি প্রকাশ্যে বলছেন, ‘এই সময় আমাকে টিকিয়ে রেখেছে শুধুমাত্র বিশ্বাস!’ ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এখন বাইবেলের উদ্ধৃতি, ধর্মীয় সংগীত ও প্রার্থনামূলক পোস্টে ভরপুর। নিজের বায়োতে লিখেছেন, ‘Disciple of Jesus Christ’! এখানেই শেষ নয়। স্পেনের জিরোনার এলিম গির্জায় (Elim Girona Church) অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে আলভেস বলেন, ‘ঝড়ের মধ্যে, বিপর্যয়ের মধ্যে ঈশ্বর সব সময় একজন দূত পাঠান। আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ে সেই দূতই আমাকে পথ দেখিয়েছে, গির্জায় টেনে এনেছে! আর আজ আমি সেই যাত্রার অংশ!’
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, মুক্তির পর থেকেই আলভেস নিয়মিত এই গির্জায় যাচ্ছেন, গিটার হাতে সংগীত পরিবেশন করছেন। অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রার্থনায় অংশ নিতে ও ধর্মীয় সঙ্গীত গাইতে দেখা যায়। গির্জার সদস্যদের বক্তব্য, ‘তিনি এখন সম্পূর্ণ শান্ত ও সংযমী। নিজের জীবনের গল্প ভাগ করে নিচ্ছেন অন্যদের অনুপ্রেরণা দিতে।’
২০০১ সালে কেরিয়ার শুরুর পর আলভেস খেলেছেন ব্রাজিল, স্পেন, ইতালি ও ফ্রান্সের ময়দানে। বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন ছ’খানা লা লিগা (La Liga) ও তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (Champions League) ট্রফি। জুভেন্তাস (Juventus), প্যারিস সাঁ জারমাঁ (PSG) এবং সাও পাওলোতেও (São Paulo) খেতাব হাতে তুলেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্রাজিলের হয়ে জিতেছেন দুটি কোপা আমেরিকা (Copa América) ও অলিম্পিক্স স্বর্ণপদক।
২০২২ সালের গ্রেপ্তারের পর তাঁর ফুটবল–কেরিয়ার কার্যত থমকে যায়। চোট, মামলা এবং ব্যক্তিগত জীবনের অস্থিরতায় এক সময়কার দুর্দমনীয় রাইট ব্যাক (Right-back) চলে আসেন বিতর্কের কেন্দ্রে। অভিযোগ অস্বীকার সত্ত্বেও কঠিন সময় পেরতে হয় তাঁকে। মুক্তির পর আলভেস জীবনের সেই অধ্যায় নিয়ে বলেননি কিছুই। তবে ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তিনি এখন পরিবার ও ধর্মকর্মে মন দিচ্ছেন। সঙ্গী জোয়ানা সানজের (Joana Sanz) সঙ্গে অশান্তি মিটেছে, কিছুদিন আগে তাঁদের প্রথম সন্তানও জন্ম নিয়েছে!
তবে এই জীবন বদলে যাওয়া নিয়ে সবাই একই রকম নিঃসন্দিগ্ধ নন। কেউ ক্লিনচিট দেওয়ার ঢঙে বলছেন, ‘অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার উদাহরণ!’ কিন্তু পাশাপাশি সংশয়ীদের সওয়াল: ‘অতীত কি এত সহজে মুছে যায়?’ যদিও সব বিতর্কের মধ্যেও দানি আলভেসের গন্তব্য অন্তত তাঁর কাছে স্পষ্ট। ফুটবল মাঠ থেকে ধর্মীয় মঞ্চে সরে এসে তিনি বলছেন, ‘ঈশ্বরই আমাকে বাঁচিয়েছেন!’
এক সময় যাঁর জার্সিতে খোদাই করা নম্বর ছিল ২, আজ তাঁর জীবনের নতুন ব্যাজ: ‘বিশ্বাস’।