আগামিকাল উত্তপ্ত পরিবেশে চেলসি যখন সেন্টার সার্কেলে হাডল বাঁধবে, গ্যালারির শোরগোল নিঃসন্দেহে বাড়বে। আর ঠিক তখনই বোঝা যাবে, এই কৌশল শুধু প্রতিপক্ষের মাথা গরম করার হাতিয়ার, নাকি সত্যিই একটা দলকে একসুতোয় গেঁথে রাখার সচতুর পন্থা!

বিতর্কিত হাডল
শেষ আপডেট: 10 March 2026 17:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখেন? নিয়মিত? তাহলে নিশ্চয় আপনার নজরে এসেছে, ইদানীং বিপক্ষ দলের সমর্থকরা চেলসির খেলোয়াড়দের বেশ তীক্ষ্ণ ও তীব্রভাবেই শিস বাজিয়ে দুয়ো জানাচ্ছেন। তিতিবিরক্ত প্রতিপক্ষ শিবির হাত ছুড়ে বিরক্তি জাহির করছে৷ প্যানেলে বসা ধারাভাষ্যকারও সমান উত্যক্ত, বিব্রত!
কিন্তু কেন? কী এমন অপরাধ করে ফেলছে লিয়ম রোজেনিয়রের ছেলেরা, যে সবাই মিলে কোমর বেঁধে তাঁদের নিশানা করে চলেছে? ব্যাপারটা আসলে এক চক্করের খেলা!
একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই চোখে পড়বে, প্রতিটি হাফ শুরুর আগে চেলসির (Chelsea FC) এগারোজন খেলোয়াড় একত্রিত হচ্ছেন। হাডল বাঁধছেন। এটা নতুন কিছু নয়। অনেক দলই করে থাকে। কিন্তু চেলসির হাডলে নতুনত্ব হল জায়গা বেছে নেওয়া—মাঠের একদম কেন্দ্রবিন্দু, সেন্টার সার্কেল। যেখানে ম্যাচ শুরু হয়। যেখানে কিক-অফের বলটা রাখা থাকে। ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে চেলসির ফুটবলাররা একে অপরের কাঁধে হাত রেখে জটলা পাকাচ্ছে। আর বীতশ্রদ্ধ প্রতিপক্ষ দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। রেফারি ঘড়ি দেখছেন। গ্যালারি? রাগে গনগনে!

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এটা এমনি এমনি হতে পারে না, পরিকল্পিত।
শুরুটা নাপোলির মাঠে
গল্পের শুরু ২৮ জানুয়ারি। চেলসি গিয়েছিল ইতালিতে, নাপোলির বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের (UEFA Champions League) গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলতে। জিততেই হবে। না জিতলে সরাসরি শেষ ষোলোয় যাওয়ার সুযোগ নেই। দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা স্টেডিয়ামে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ গোলে জিতল দল। সেই ম্যাচেই নজরে এল প্রথম সেন্টার সার্কেলের হাডল।
Circling the ball before kick off is an all new tactic from Chelsea! ⚽️👀 pic.twitter.com/aDWuJHE4UE
— Football on TNT Sports (@footballontnt) March 6, 2026
ফুটবলারদের কুসংস্কার প্রবল। একবার কাজ হলে সেটা আঁকড়ে ধরেন তাঁরা। তিন দিন পরে ওয়েস্ট হ্যামের বিরুদ্ধে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও আবার ৩-২ জয়। ‘হাডল-রথ’ চলতে থাকল।
আইডিয়াটা খেলোয়াড়দের
কোচ লিয়ম রোজেনিয়র (Liam Rosenior) স্পষ্ট জানিয়েছেন, এটা তাঁর ফন্দি নয়। খেলোয়াড়রা নিজেরাই ভেবে বের করেছেন। তবে পেছনে একটু হাত রয়েছে উইলি আইসার। প্রাক্তন রাগবি লিগ খেলোয়াড়, এখন ক্লাবের ‘প্লেয়ার সাপোর্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার’। তেরো মাস হল চেলসিতে আছেন। মাঠের ভেতরে ও বাইরে খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি বাড়ানোই তাঁর কাজ। হাডলের পেছনে উইলির পরোক্ষ অবদান আছে বলেই ধারণা।
রোজেনিয়রের মন্তব্য, ‘আমি এটা পছন্দ করি। এতে দলের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে। কৌশল বা ফর্মেশনের আগে দরকার একদল খেলোয়াড়, যারা একে অপরের জন্য দৌড়াবে, লড়বে। আমি যে ক’দিন কোচিং করেছি, একটা ম্যাচও হয়নি যেখানে ওরা সব দিয়ে খেলেনি!’
ভিলা পার্কে ক্ষোভের আগুন, উলভসে ভিন্ন ছবি
অ্যাস্টন ভিলার মাঠে ৪-১ জয়ের আগে হাফটাইমে যখন চেলসি সেন্টার সার্কেলে জটলা বাঁধল, ভিলার খেলোয়াড়রা রীতিমতো ক্ষেপে আগুন। রেফারির দিকে প্রায় তেড়ে গেলেন স্ট্রাইকার ওলি ওয়াটকিন্স (Ollie Watkins)। মিডফিল্ডার আমাদো ওনানা অবিশ্বাস ও রাগ মিলিয়ে অভিযোগ জানাতে লাগলেন। রেফারি জারেড গিলেট পড়লেন ফ্যাসাদে।

উলভসের মাঠে আবার এই ছবিটাই গেল বদলে। সেখানে প্রতিপক্ষে খেলোয়াড়রা কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে! তীব্র আপত্তি নয়, বরং, আবছা বিস্ময়। আর এই হতভম্ব দশার ফায়দা তুলে প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলে এগিয়ে গেল চেলসি।
ধারাভাষ্যকারও বিরক্ত, পরিসংখ্যান মিশ্র
প্রাক্তন লিভারপুল ও রিয়াল মাদ্রিদ তারকা স্টিভ ম্যাকমানামান টিএনটি স্পোর্টসে ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে সরাসরি বললেন, ‘এটা হাস্যকর। মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা নিতে গিয়ে সবাই একটা না একটা নতুন বোকামি বের করছে। এটাও ঠিক তাই!’
কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও ডেটার সত্য উপেক্ষা করা কঠিন। হাডল চালু হওয়ার পর ১০ ম্যাচে চেলসির ফলাফল—৬ জয়, ২ ড্র, ২ হার। দুর্দান্ত না হলেও তেমন খারাপও নয়। অধিনায়ক রিস জেমস (Reece James) চোটে বাইরে থাকলে ভাইস-ক্যাপ্টেন এনজো ফার্নান্দেজ (Enzo Fernandez) নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের রোটেশন হয়েছে, হাডল থামেনি।
পরের পরীক্ষা প্যারিসে
এবার পালা পিএসজির (PSG)। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে পার্ক দে প্রাঁসে অপেক্ষায় আছে লুই এনরিকের দল। গত গ্রীষ্মে ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনালে চেলসির কাছে হেরেছে পিএসজি। ফরাসি ক্লাবের সেই হিসেব মেটানোর জেদ প্রবল।
আগামিকাল উত্তপ্ত পরিবেশে চেলসি যখন সেন্টার সার্কেলে হাডল বাঁধবে, গ্যালারির শোরগোল নিঃসন্দেহে বাড়বে। আর ঠিক তখনই বোঝা যাবে, এই কৌশল শুধু প্রতিপক্ষের মাথা গরম করার হাতিয়ার, নাকি সত্যিই একটা দলকে একসুতোয় গেঁথে রাখার সচতুর পন্থা!