আসলে লেওয়ানডস্কি থেকে কেন—বুন্দেশলিগার প্রতিটি তারকা ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছেন, বিশ্ব ফুটবলের এই ভোট-উৎসবে তাঁদের জন্য অন্য নিয়ম। রঙিন আলো প্যারিস–মাদ্রিদ–ম্যানচেস্টারের দিকে, মিউনিখে নয়।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 26 September 2025 17:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাম হ্যারি কেন (Harry Kane)। বয়স ৩১। প্রথম মরশুমেই বায়ার্ন মিউনিখের (Bayern Munich) হয়ে ৫৫টি গোল কনট্রিবিউশন—৪১ গোল, ১৪ অ্যাসিস্ট। বুন্দেশলিগা শিরোপা ঘরে তুলেছেন, দলের আক্রমণে এনেছেন নতুন মাত্রা। তবু ব্যলন ডি’অরের (Ballon d’Or) ভোটে তাঁর স্থান ১৩ নম্বরে!
অবিশ্বাস্য?
বিশেষজ্ঞরা কিন্তু জানাচ্ছেন, এটাই ভবিতব্য। ফুটবলের ব্যক্তিগত সম্মানের সর্বোচ্চ মঞ্চের পরিচিত গল্প। ফ্রাঙ্ক রিবেরি (Franck Ribery), ম্যানুয়েল নয়্যার (Manuel Neuer), রবার্ট লেওয়ানডস্কির (Robert Lewandowski) তালিকায় ইংরেজ স্ট্রাইকার নয়া সংযোজন মাত্র, নতুন কোনও মুখ নন! সেই চিরায়ত ‘অবহেলার শিকারে’র তকমাই জুড়ে গেল হ্যারি কেনের নামের পাশে। এমন এক ট্রফির মঞ্চে, যেখানে বুন্দেশলিগার সাফল্য কোনওদিনই তেমন মূল্যই পায়নি।
কেনের বঞ্চনাকে ঘিরে বিস্ময়টা অহেতুক নয়। ইংল্যান্ডে টটেনহ্যামে বছরের পর বছর গোল করেও ট্রফির আকাল। এই না পাওয়াটাই হয়ে ওঠে একজন প্রায় নিখুঁত ফুটবলারের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় দাগ। মিউনিখে এসে সেই ঘাটতি শুধু পূরণই করলেন না, বরং নিজের খেলার মানকেও পৌঁছে দিলেন অন্য উচ্চতায়। প্রতিটি ম্যাচে লেওয়ানডস্কির উত্তরসূরি হওয়ার চাপ সহ্য করেও কেন প্রমাণ করেছেন তিনিই এই মুহূর্তে বায়ার্নের ভরসা। তবু ইউরোপ-শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি কিছুতেই জুটছে না।
নিছকই কাকতালীয় নয়। বরং, ফুটবল মহল বলছে, লেওয়ানডস্কির গল্পই যেন আবার ফিরে এসেছে। ২০১৯-২০ মরশুমে পোলিশ স্ট্রাইকার ছিলেন কার্যত অপ্রতিরোধ্য। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বুন্দেশলিগা, ডিএফবি পোকাল—সব মিলে বায়ার্ন জিতেছিল ঐতিহাসিক ‘সেক্সটুপল’। আর লেওয়ানডস্কি ছিলেন সেই দুরন্ত যন্ত্রের চালক। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর হাতে উঠত ব্যলন ডি’অর। কিন্তু ২০২০-তে ফ্রান্স ফুটবল পুরস্কারটাই বাতিল করে দিল। কোভিড মহামারির কারণ দর্শিয়ে! আর ঠিক সেদিন থেকেই শুরু হল ‘বুন্দেশলিগা অবমূল্যায়নে’র নতুন অধ্যায়।
এরপর ২০২১। পুরস্কার ফিরল। কিন্তু লেওয়ানডস্কির বদলে ট্রফি গেল লিওনেল মেসির (Lionel Messi) হাতে। যুক্তি—তিনি কোপা আমেরিকা জিতেছেন। অথচ সংখ্যার বিচারে লেওয়ানডস্কি কিন্তু এগিয়ে। প্রতি ম্যাচে ১.৪১ গোল কনট্রিবিউশন। ইতিহাসের অন্যতম সফল সিজন। কিন্তু বুন্দেশলিগায় দেখানো পারফরম্যান্সকে যেন বিশ্বমঞ্চ গুরুত্ব দিতে নারাজ!
এই অস্বীকৃতির প্রমাণ নতুন করে দিলেন হ্যারি কেন। ৫৫ গোল কনট্রিবিউশনের পরও যদি জায়গা হয় ১৩ নম্বরে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—কোন মানদণ্ডে বিচার চলছে? কিলিয়ান এমবাপে, ওসমান ডেম্বেলে বা লামিনে ইয়ামালের নাম-ই কি ফ্রান্স ফুটবলের কাছে বেশি ‘প্রাসঙ্গিক’? বুন্দেশলিগার মাঠে মহাকাব্যিক পারফরম্যান্সও গুরুত্ব পাবে না?
বিষয়টা এতটাই স্পষ্ট, যে এ নিয়ে এখন আর বিতর্কও চলে না। বুন্দেশলিগা অবমূল্যায়িত। শুনতে তেতো হলেও কথাটা সত্যি। অথচ এই লিগ থেকেই জার্মান ফুটবলের আসল শক্তি গড়ে ওঠে, রকেটগতি ফরোয়ার্ড থেকে শুরু করে শক্তপোক্ত মিডফিল্ডার—সবার আঁতুড়ঘর এই মঞ্চ! তবু বায়ার্ন মিউনিখের মতো ইউরোপ-দাপানো ক্লাবের তারকা খেলোয়াড়রা বারবার হতাশার শিকার। রিবেরি ২০১৩-তে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পরও পুরস্কার পাননি। ২০১৪-তে বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপার হয়েও সেরা তিনে নয়্যারের জায়গা জোটেনি। লেওয়ানডস্কি তো রয়েইছেন। এখন তাঁদের লিস্টে যোগ হল হ্যারি কেনের নাম।
কেনের প্রতি এই অবিচার নিছকই ভোটের ফল নয়, বরং গোটা সিস্টেমের ‘ব্র্যান্ড বায়াস’। প্রিমিয়ার লিগ বা লা লিগায় কেউ এমন পারফরম্যান্স করলে তাঁকে ‘বিশ্বসেরা’ বলে মাথায় তুলত সবাই। কিন্তু জার্মানির মাঠে করলে সেটা হয়ে যায় ‘গড়পড়তা’ সাফল্য। এ এক আজব সমীকরণ!
ফুটবল মাঠের পরিসংখ্যান মিথ্যে বলে না। ২০২৫-২৬ মরশুমের শুরুতেই ক্লাব আর দেশের হয়ে ১২ ম্যাচে ১৭ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট। এই মুহূর্তে দুরন্ত ফর্মে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—শিকে আদৌ ছিঁড়বে তো? এবারও যদি সব কিছু ছাপিয়ে যান, তাহলেও কি ব্যলন ডি’অরের মঞ্চ তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেবে? নাকি আবারও পুরনো অজুহাত, পুরনো অবহেলা?
আসলে লেওয়ানডস্কি থেকে কেন—বুন্দেশলিগার প্রতিটি তারকা ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছেন, বিশ্ব ফুটবলের এই ভোট-উৎসবে তাঁদের জন্য অন্য নিয়ম। রঙিন আলো প্যারিস–মাদ্রিদ–ম্যানচেস্টারের দিকে, মিউনিখে নয়। আর এই একচোখামিতেই ব্যলন ডি’অরের আসল ‘অসম্মান’ লুকিয়ে।