প্রশ্ন একটাই—ফুটবল প্রশাসন কি তাঁর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে? নাকি ২১তম অভিযোগ-ই ভবিতব্য… স্রেফ সময়ের অপেক্ষা?

ভিনিসিয়াস জুনিয়র
শেষ আপডেট: 19 February 2026 13:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আবারও খেলা থামল। আবারও উঠল চিরচেনা বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ। লিসবনের এস্তাদিও দা লুজে (Estadio da Luz) চ্যাম্পিয়ন্স লিগ প্লে-অফে ম্যাচ থেমে রইল ১০ মিনিট। অভিযোগ তুললেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র (Vinicius Jr)। দাবি—গ্যালারি থেকে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য ছোড়া হয়েছে তাঁকে লক্ষ্য করে! নতুন নয়… এটা আট বছরে ২০তম ঘটনা!
রিয়াল মাদ্রিদে (Real Madrid) যোগ দেওয়ার পর থেকে বারবার একই তিক্ত অভিজ্ঞতা। প্রশ্ন উঠবে, উঠছেও—একজন ফুটবলার এতবার একই ইস্যুতে অভিযোগ জানালে তাকে কি আর ‘আলাদা ঘটনা’ বলা যায়?
লিসবন থেকে শুরু: নতুন বিতর্ক, পুরনো ক্ষত
বেনফিকার (Benfica) বিরুদ্ধে গোল করার কিছুক্ষণ পরেই অভিযোগ তোলেন ভিনি। অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানির (Gianluca Prestianni) নাম। তিনি অবশ্য বেমালুম সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। যদিও রিয়াল শিবিরের জোর গলায় দাবি, কিলিয়ান এমবাপে (Kylian Mbappe) পর্যন্ত জানিয়েছেন, তিনি নাকি পাঁচবার বর্ণবিদ্বেষমূলক শব্দ শুনেছেন!
বেনফিকা কোচ জোসে মোরিনহো (Jose Mourinho) অবশ্য উল্টো সুরে কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য, গোলের পর উদ্যাপন ‘সম্মানজনক’ হওয়া উচিত। এমন মন্তব্যে বিতর্ক আরও ঘনীভূত করেছে। কারণ আদত প্রশ্নটা গোল উদ্যাপনের নয়, অভিযোগের!
আর এই চক্রের সূত্রেই স্পষ্ট—ফুটবলে বর্ণবাদ নিয়ে বিতর্ক এখনও ‘বিভক্ত’, ‘খণ্ডিত’। অনেকেই বলেন, ‘হ্যাঁ, গালাগাল হয়েছে, কিন্তু ভিনিসিয়াসেরও আচরণও ভাল নয়!’ এই বক্তব্য শুনতে যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আসলে সমস্যার গভীরতা বুঝিয়ে দেয়।
২০ ঘটনার দীর্ঘ তালিকা
২০২১ সালে বার্সেলোনার (Barcelona) মাঠে ক্লাসিকোতে প্রথম বড় অভিযোগ সামনে আসে। এরপর ২০২২-তে মায়োরকা (Mallorca) সমর্থকদের ‘বানর-ডাক’। টেলিভিশন শো-তে ‘বাঁদরের মতো আচরণ’-সূচক মন্তব্য। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ব্রিজে ঝুলন্ত পুতুল—ভিনির জার্সি পরানো। চার জন গ্রেফতার, পরে সাজা কমে জরিমানা।
ভ্যালেন্সিয়ার (Valencia) মেস্তায়ায় ২০২৩ সালের ঘটনা ছিল টার্নিং পয়েন্ট। প্রকাশ্যে গ্যালারির দিকে আঙুল তুলে অভিযোগ করেন ভিনিসিয়াস। ম্যাচে লাল কার্ডও দেখেন। পরে তিন সমর্থক জেলে। স্পেনে এই প্রথম বর্ণবিদ্বেষের জন্য এহেন শাস্তি।
যদিও এরপরও ট্র্যাডিশন থামেনি। আতলেতিকো মাদ্রিদের (Atletico Madrid) বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে স্লোগান। ওসাসুনার (Osasuna) মাঠে ‘ভিনিসিয়ুস ডাই’ চিৎকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা-প্রচার। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। নিরন্তর সামনে এসেছে। ধারাবাহিক। এটাই উদ্বেগের।
প্রতিরোধের মুখ হয়ে ওঠা
ব্রাজিলীয় কৃষ্ণাঙ্গ উইঙ্গার শুধু অভিযোগ তোলেননি। লড়েওছেন। লা লিগা (La Liga) প্রশাসন মামলা করেছে। কিছু ক্ষেত্রে আদালত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছে। ২০২৪ সালে ভিনি লেখেন, ‘আমি বর্ণবাদের শিকার নই, বর্ণবাদীদের শত্রু।’বক্তব্যটা আসলে লঘু আবেগ নয়, দৃঢ় অবস্থান।
সমাজবিজ্ঞানীদের বক্তব্য, অনেক সময় ‘রেসিজম উইদাউট রেসিস্টস’—অর্থাৎ প্রকাশ্যে গালি নয়, কিন্তু ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়। ভিনির ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। মাঠে তিনি আক্রমণাত্মক, আবেগপ্রবণ। সমালোচকদের বিচারে, আচরণে সংযম জরুরি। সমর্থকদের কথায়, প্রতিদিনের চাপ সহ্য করতে করতে এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক।
ফুটবলের আয়না
আট বছরে ২০ অভিযোগ—সংখ্যাটা নিজেই আস্ত, নিরেট প্রশ্ন। উয়েফা (UEFA) প্রোটোকল আছে, ম্যাচ থামে, ঘোষণা হয়, তদন্ত চলে। কিন্তু তাতে কি সমস্যা কমছে? ভিনিসিয়াস আজ শুধুই উঠতি উইঙ্গার নন। তিনি প্রতীকও বটে। ব্রাজিল (Brazil) থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠালাভ। গোল, ট্রফি, ব্যালন ডি’অর নিয়ে নিরন্তর আলোচনায়। কিন্তু তাঁর কেরিয়ারের সমান্তরালে চলছে অন্য লড়াই। ভিনি সেই একক সংগ্রাম থামাননি। প্রশ্ন একটাই—ফুটবল প্রশাসন কি তাঁর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে? নাকি ২১তম অভিযোগ-ই ভবিতব্য… স্রেফ সময়ের অপেক্ষা?