ভেঙে যায়নি, কেবল অবহেলায় ধুলো জমছে! ভালবাসায় এখন শুধুই বেঁচে 'এক্সপায়ারি ডেট'

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 29 November 2025 17:16
তুমি আমি মুখোমুখি নীরবতা পালনের গান শুনে যাই...
একটা পুরনো বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে দেওয়ালে ফাটল, রং প্রায় ফ্যাকাসে, জানলার কাঠে ঘুণ ধরেছে...যেন সময়ের ধুলোয় ঢাকা। দূর থেকে তাকালে মনে হচ্ছে, আর কয়েকটা বর্ষা এলেই ভেঙে পড়বে। অথচ, ভেতরে যেতেই বোঝা গেল, বাড়িটা এখনও মজবুত, এখনও টিকে থাকার ক্ষমতা আছে। ভিতরের কাঠামো এখনও ভরসা দিচ্ছে। শুধু অনেকদিন ধরে তার দিকে কেউ ফিরে তাকায়নি, যত্ন করে হাত বুলিয়ে দেয়নি। আজকের অনেক দাম্পত্যও ঠিক তেমনই। ভাঙছে না। কেবল অবহেলায় তাতে ধুলো জমছে। আর সম্পর্কে থাকা দু'জন মানুষ 'ভুল করে' ধরে নিচ্ছে, “এটাই বোধহয় শেষ।"
আধুনিক সম্পর্কগুলো এত আলগা হয়ে যাচ্ছে কেন?
আগের প্রজন্মের মতো মান-সম্মান, সমাজের ভয়, পরিবারের চাপে সবকিছু মুঠোফোনের মধ্যে আটকে নেই। এখন চাইলে যে কেউ নিজের মত করে বেরিয়ে আসতে পারে। দরজা খোলা, পথ খোলা। কেউ কাউকে আটকাতে বাধ্য নয়। আর ভালবাসা? সে তো নিজে একা কখনওই কোনও সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে পারে না! ওই যে পুরনো বাড়ির মতোই, যত্ন না পেলে সেটাতেও ধুলো জমে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।

দাম্পত্যে 'স্বাধীনতা' এসেছে, কিন্তু 'ধৈর্য্য' আসেনি...
এখন কেউ কাউকে ধরে রাখে না, কেউ কাউকে ছাড়তে ভয়ও পায় না। চাইলে যে-কেউ নিজের ইচ্ছেমতো বেরিয়ে যেতে পারে। এটাই সময়ের বদল। কিন্তু এই বদলের ভিড়ে হারিয়ে গেছে একটা জরুরি জিনিস। অপেক্ষা করার ক্ষমতা...
আজকের প্রজন্ম শেখেনি কীভাবে ঝগড়া সামলাতে হয়, কীভাবে প্রতিটা ভুলে ক্ষমা চাইতে হয়, কীভাবে সব সমস্যা সামলে নিতে হয়, আর কীভাবে 'অবশেষে ভালবেসে' থেকে যেতে হয়।
তাহলে কি আজকালকার সম্পর্ক 'এক্সপায়ারি ডেট'-এর উপর টেকে?
চারিদিকে তাকালে মাঝে মাঝে তেমনই মনে হয়। দু’জন মানুষ একসঙ্গে পথ হাঁটছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন দু’জনের হাতেই অদৃশ্য একটা স্টপওয়াচ। যখনই অসুবিধা বাড়বে, যখনই ভুল বোঝাবুঝি জমবে, তখনই বেরিয়ে আসা যাবে সম্পর্ক থেকে। তাই কি প্রয়োজন 'এক্সপায়ারি ডেট'?
আসলে মানুষ ক্লান্ত। অভ্যেস নেই মেরামতের। অভ্যেস নেই নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর। সর্বক্ষণ একে অপরের দোষ, ভুল, খামতি ধরতে ব্যস্ত। অভ্যেস নেই সঙ্গীর মনখারাপে হাতটা ধরে পাশে বসে থাকার। তার ওপর এই যুগে সুযোগ এত বেশি, চাইলে এক ক্লিকেই জীবন পাল্টে ফেলা যায়। ফলে অনেকেই এমনটা ভাবেন, সম্পর্ক মানেই যেন একটা 'সাবস্ক্রিপশন', ইচ্ছে মতো 'রিনিউ' করলেও হয়, না করলেও হয়। আর এতেই বাড়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ।
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, সম্পর্কে একজন যখন 'এক্সপায়ারি ডেট' খুঁজতে ব্যস্ত, অন্যজন তখন 'শেষ চেষ্টা' করছে থেকে যাওয়ার, আগলে রাখার। মুখ বুজে সব কিছু সহ্য করে যাওয়ার। আর যখন ব্যর্থ হচ্ছে, তখনই চারিদিকটা গিজগিজ করছে 'মন-ভাঙা' লোকজনে।

কিন্তু এদেশে ডিভোর্সের পরিসংখ্যানটা কোথায় দাঁড়িয়ে?
আসলে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার ভিড়ে ভারতে বিয়ের পর বিচ্ছেদের গল্পটা বেশ আলাদা। সংখ্যা বলছে, দেশে বিচ্ছেদের হার প্রায় এক শতাংশ। অর্থাৎ একেবারে কম। এই সংখ্যা আমাদের সমাজের একটা গভীর বাস্তবতাকে তুলে ধরছে। যেখানে এখনও বহু মানুষ সমাজের কথা ভেবে, সামনের মানুষটার কথা ভেবে 'ডিভোর্স'-এর দিকে পা বাড়াচ্ছেন না। তাই সেখানে বিচ্ছেদের সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে কম হয়ে যাচ্ছে। ধৈর্য ধরে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। ফলে যাঁরা হাল ছাড়ছেন, যাঁরা মনে করছেন, সয়ে গেলেই রয়ে যাওয়া যায়! তাঁরা একবার এই লাইনটা বলেই ফেলুন...
কত কী যে সয়ে যেতে হয় ভালবাসা হলে...