এখানে গল্প বলে সিঁদুরে লাল ইটের টিকিটঘর, বিশ্বের প্রাচীনতম স্টেশন আজও ট্রেনের ফিরে আসার অপেক্ষায়।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 18 October 2025 22:19
'চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি, না হলে তো আরও কিছুক্ষণ থাকতাম...'
স্টেশনের পুরনো ঘড়িটা তখনও টিকটিক করে চলছে। প্ল্যাটফর্মে ভেসে আসছে কেটলিতে চা ঢালার শব্দ, মাটির ভাঁড়ের সোঁদা গন্ধ, দূরে ধোঁয়া উড়িয়ে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে কালো ইঞ্জিনওয়ালা ট্রেনটা। আজকের মতো মোবাইলে টিকিট দেখানো বা এয়ারকন্ডিশন্ড কামরার আরাম তখন ছিল না। মানুষ গন্তব্যে পৌঁছতে নয়, যাত্রার স্বাদ নিতে ট্রেনে উঠত। যেখানে স্টেশনও 'প্রেমে পড়ত' রেলগাড়ির। সেই সময়ের রেলযাত্রা কেমন ছিল, তা জানতে হলে একবার তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। সেখানে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন স্টেশনের নিত্যদিনের গল্প, সময়ের ধুলোয় চাপা পড়ে যাওয়া যাত্রাপথের 'প্রমাণ'।
এখানে শব্দে বাঁচে অতীত
আজও সেই রেললাইনের ধারে দাঁড়ালে, হাওয়ায় ভেসে আসা শব্দগুলো কানে কানে কথা বলে। সিঁদুরে লাল ইটের স্টেশনঘর, কাঠের বেঞ্চ, আর কেরোসিন ল্যাম্পের ম্লান আলো যেন মনে করিয়ে দেয় এক 'অন্যরকম' গল্প মিশে আছে এই রেলস্টশনে। এক সময় ট্রেনের হুইসেলে জেগে উঠত সকাল, আর সন্ধ্যায় সেই শব্দ মিলিয়ে যেত গ্রামের নিস্তব্ধতায়।

হোক পুরাতন আজও নুতন
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো স্টেশনটি হল ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে অবস্থিত লিভারপুল রোড স্টেশন। এর গল্প যেন এক ইতিহাসের সাক্ষী। দিনটা ছিল ১৮৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। বিখ্যাত লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার (L&M) রেলওয়ের মূল টার্মিনাস। এখান থেকেই প্রথমবার ধোঁয়া উড়িয়ে একটি ট্রেন রওনা দিয়েছিল নিজের গন্তব্যে।

এক্কেবারে একলা এখন
সময়ের স্রোতে এই স্টেশনের কাজও পাল্টেছে। ১৯৪৪ সালের ৫ মে, যখন ম্যানচেস্টার ভিক্টোরিয়া স্টেশনের সঙ্গে L&M রেলওয়ের সংযোগ তৈরি হল, তখন এখান থেকে যাত্রীবাহী পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেল। একদম একা পড়ে রইল এই স্টেশনটা। ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেনটা আর ফেরে না এখানে। আর তো কই কোনও লোকের পায়ের শব্দ শোনা যায় না। দিনে দুপুরে খবর নেয় না, কেমন আছে একলা হয়ে যাওয়া প্ল্যাটফর্মটা। ফলে যখন হুইসেলের শব্দ ছাড়াই স্টেশনের সকাল পেরিয়ে দুপুরে হল, সেও মনে মনে ভাবল... 'শেষবার তাকিয়ে দেখলাম, ট্রেনটা মিলিয়ে গেল। আর এল না...'

শেষ হইয়াও হইল না শেষ...
রোজের ট্রেন চলাচল নেই। কিন্তু তাতেও এর গুরুত্ব শেষ হয়নি। যাত্রী পরিষেবা বন্ধ হলেও স্টেশনটি টিকে ছিল আরও বহু বছর। তবে এবার 'মালবাহী স্টেশন' হিসেবে। এক সময় ট্রেনের হুইসেলে যে স্টেশনের সকাল হত, সেখানেই সারাদিন নিস্তব্ধতা গিলে খেতে শুরু করল।
ঠিক যেমন সবকিছুরই একটা শেষ আছে। তেমনই এক 'শেষ দিন' ঘনিয়ে এল এই রেলস্টশনেও। যেদিন মালগাড়িটাও সঙ্গ ছাড়ল! দীর্ঘ যাত্রার পরে, ১৯৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর স্টেশনটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। এই ঐতিহাসিক স্টেশনটি পরে গ্রেটার ম্যানচেস্টার কাউন্সিলের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে সুখবর হল, এর মূল কাঠামোর কিছু অংশকে এখনও একটি সংগ্রহশালায় (মিউজিয়াম) সংরক্ষিত করা আছে। ফলে, যারা ইতিহাসের পাতা থেকে সেই ১৮৩০ সালের রেলযাত্রার স্বাদ নিতে চান, তারা আজও এই প্রাচীন স্টেশনে পা রাখতে পারেন। একবার দেখেই আসতে পারেন, কেমন একলা মন খারাপে পড়ে আছে 'ব্যর্থ প্রেমিক' স্টেশনটি।