তিনি বলতেন, ভারত স্বাধীন হলে শুধু ভোটাধিকার নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ আপডেট: 15 August 2025 14:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি আগের কথা। তখন সারা ভারত জুড়ে স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে। ব্রিটিশ রাজের শাসন ভেঙে নিজের পতাকা উড়ানোর স্বপ্নে বিভোর ভারতবাসী। ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে, ১৯০৭ সালের ২১ অগস্ট। ভারতের মাটি থেকে বহু দূরে, জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে ঘটেছিল ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্ত - প্রথমবার বিদেশের মাটিতে উত্তোলিত হয়েছিল ভারতের ‘জাতীয় পতাকা’।
সেবছর আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে দেখা যায়, ভারতের নামে ব্রিটিশ পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। উপস্থিত ভিড়ের মধ্য থেকে প্রতিবাদে উঠে দাঁড়ালেন এক সাহসী নারী - ভিকাজি রুস্তম কামা, যিনি সবার কাছে পরিচিত মাদাম কামা নামে। নিজের ব্যাগ থেকে তিনি বের করলেন তেরঙ্গা পতাকা, এবং সেটিই সম্মেলনে ভারতের পতাকা হিসেবে উত্তোলিত হয়। উপস্থিত সকলে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শুনলেন তাঁর কণ্ঠে এক গর্বিত ঘোষণা - “দেখুন, এটাই ভারতের জাতীয় পতাকা!”
এই পতাকার নকশা পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় পতাকার অন্যতম স্বীকৃত নকশা হয়ে ওঠে। সেদিন থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে মাদাম কামার নাম অমর হয়ে যায়।

নারীর অধিকার ও মানবমুক্তির লড়াই
মাদাম কামা আজীবন সমাজসেবা, মানবাধিকার ও নারীর অধিকার রক্ষায় নিবেদিত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি নারীর ভোটাধিকার ও সমানধিকারের দাবিতে সরব ছিলেন। রাশিয়ানরা তাঁকে ডাকত ‘ইন্ডিয়ান জোয়ান অফ আর্ক’, আর ভারতীয়দের কাছে তিনি ‘বিপ্লবের মা’।
তিনি বলতেন, ভারত স্বাধীন হলে শুধু ভোটাধিকার নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় নারীরা ভোটাধিকার পেলেও বাস্তবে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা হতে বহু সময় লেগেছে।
ব্যক্তিগত জীবনেও লেগেছিল বিপ্লবের ছোঁয়া
১৮৬১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন বম্বে (বর্তমান মুম্বই) শহরে এক ধনী পার্সি পরিবারে জন্ম ভিকাজির। পিতা সোরাবজি ফ্রামজি প্যাটেলের স্নেহের কন্যা তিনি। পড়াশোনা করেন আলেকজান্দ্রা গার্লস এডুকেশন ইনস্টিটিউটে।
১৮৮৫ সালে বিয়ে করেন আইনজীবী রুস্তমজি কামাকে। তবে তাঁদের দাম্পত্য ছিল আদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তায় দুই মেরুর মতো বিপরীত - রুস্তমজি ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের সমর্থক, আর ভিকাজি ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী। পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন ‘প্যারিস ইন্ডিয়ান সোসাইটি’, যা বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় বিপ্লবীদের সহায়তা করত।

মানুষের সেবায় নিবেদিত জীবন, নির্বাসিত-ও বটে
১৮৯৬ সালে ভয়াবহ প্লেগ মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। বিলাসিতা ত্যাগ করে সাদা অ্যাপ্রোন পরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে রোগীদের সেবা করতেন ভিকাজি। এই সময়েই তিনি মহামারীতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলে প্রাণে বাঁচেন, কিন্তু সেখান থেকেও স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন।
ব্রিটিশ সরকার তাঁর ব্রিটিশ-বিরোধী কার্যকলাপে রুষ্ট হয়ে জানিয়ে দেয়, তিনি যদি এসব কাজ বন্ধ না করেন, তবে দেশে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু মাদাম কামা আপস করেননি।
সাভারকরকে পালাতে সহায়তাও করেছিলেন ভিকাজি
লন্ডনে তিনি সাভারকর, সেনাপতি বাপ্তের মতো বিপ্লবীদের সহযোগিতা করেন। সাভারকরের লেখা “ভারতের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ” বইটি ইংরেজ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। তবু ভিকাজি ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে সেটি গোপনে ভারতে ছড়িয়ে দেন।
এর চেয়েও সাহসী পদক্ষেপ ছিল - লন্ডন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া সাভারকরকে জেল থেকে পালাতে সাহায্য করা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, স্বাধীনতার জন্য লড়াই মানেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকা, এবং সেই পরিবর্তন নারীদেরও সমানভাবে ছুঁয়ে যাওয়া উচিত।

জীবনের শেষ অধ্যায়
৩৩ বছর বিদেশে থাকার পর অবশেষে দেশে ফেরার অনুমতি মেলে। ফিরে আসেন বম্বেতে। কিন্তু মাত্র ৯ মাস পর, ১৯৩৬ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর আদর্শ বহু প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রাণিত করেছে।