শুধুমাত্র একটি গান জিতে নিয়েছিল গোটা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মনপ্রাণ। আর তা ছিল- ‘শর পে লাল টুপি রুশি, ফিরভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’।

রাজ কাপুর-নার্গিস জুটির অভিনীত ‘আওয়ারা’ সিনেমা সেই কালে রাশিয়ার মানুষের কাছে উন্মাদনায় পরিণত হয়েছিল।
শেষ আপডেট: 5 December 2025 12:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুধু ভ্লাদিমির পুতিনের চলতি ভারত সফরের মধ্য দিয়ে নয়। সোভিয়েত-আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেরও অনেক আগে থেকে রাশিয়ার মন জিতে রেখেছে ভারত। আর সেটা কোনও রাজনৈতিক দলিল-দস্তাবেজ, সামরিক সহায়তা, আর্থিক ঋণের নাগপাশে নয়। শুধুমাত্র একটি গান জিতে নিয়েছিল গোটা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মনপ্রাণ। আর তা ছিল- ‘শর পে লাল টুপি রুশি, ফিরভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’। রাজ কাপুর-নার্গিস জুটির অভিনীত ‘আওয়ারা’ সিনেমা সেই কালে রাশিয়ার মানুষের কাছে উন্মাদনায় পরিণত হয়েছিল। ১৯৫১ সালে দেশে সাফল্য অর্জনের পর সোভিয়েতে ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৪ সালে। কমিউনিস্ট দেশে এরকম কমিউনিস্ট-মনা চলচ্চিত্র ও গানের কথায় রুশি শব্দটি প্রাণ ছুঁয়ে গিয়েছিল জনজীবনের। তথ্য বলছে, সোভিয়েতে এই ছবির টিকিট বিক্রির সংখ্যা ছিল ৬.৪ কোটি।
এর অনেক বছর পর। এবারের ব্যাকড্রপ দিল্লির পালাম বিমানবন্দর। ২৬ নভেম্বর, ১৯৭৩ সাল। অর্থাৎ, ভারতের হাতে পাকিস্তানের পরাজয়ের দুবছর পর। মঞ্চ ছিল বিশ্ব রাজনীতির অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরাট সাফল্যের দিন। দিল্লির আকাশে-বাতাসে ছিল অদ্ভুত এক উন্মাদনা। যার মিশ্রণে ছিল সংগঠিত রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সুপরিকল্পিত জমায়েত তবে তাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের উৎসাহ। কারণ সেদিন পালাম বিমানবন্দরে পা রাখলেন এমন এক নেতা, যাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সমীহ আদায় করে নেওয়া। সেই রাজনৈতিক ফুল মার্কসটি আদায় করে নিয়েছিলন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ‘লৌহমানবী’ ইন্দিরা গান্ধী।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাজনৈতিক স্বার্থে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে স্বাগত জানাতে ছুটেছেন। তেমনই সেদিন বিমানবন্দরে সোভিয়েতের সর্বময় নেতা তথা আমেরিকার একমাত্র টক্করবাজ রাষ্ট্রনেতা লিওনিদ ব্রেজনেভকে স্বাগত জানাতে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। পালাম এবং চারপাশের কান ফাটিয়ে যখন বিশাল বপুর ইলুউজিন-৬২ বিমান বন্দরের মাটিতে স্পর্শ করল, তখন অপেক্ষমান সোল্লাসে চিৎকার করে ওঠে। বিমানের দরজা খুলে মুখ বাড়ালেন লিওনিদ ব্রেজনেভ। সোভিয়েতের রাষ্ট্রক্ষমতার হৃদপিণ্ড তথা কমিউনিস্ট পার্টি ও সোভিয়েত রাশিয়ার সাধারণ সম্পাদক। সেই আমলের বিশ্বে সবথেকে ক্ষমতাধর পুরুষ। তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী। ধীরস্থির অথচ দৃঢ়চেতা, রাজকীয় চলনবলন ও লক্ষ্যে অবিচল।
বিমানবন্দর থেকে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পর্যন্ত ৯ মাইল রাস্তার দুধার লোকে লোকারণ্য। দিল্লি যেন ভারত-সোভিয়েতের পতাকায় মুড়ে গেল। নিউইয়র্ক টাইমস খবরে লিখেছিল, ৫০ হাজার থেকে দেড় লক্ষ মানুষ গরুর গাড়ি এবং বাসের ছাদে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে জনঅভিবাদন জানিয়েছিল কমিউনিস্ট নেতাকে। পরে ব্রেজনেভ সংসদের যৌথ অধিবেশনে ইন্দিরা গান্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। সেই সুদূরকাল থেকে সবসময় রাশিয়া ভারতের পাশে থেকেছে। দুই দেশের বন্ধুত্ব চিরকালীন। সমাজতন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও ছিলেন সোভিয়েতের অন্তরঙ্গ বন্ধু। যা উত্তরসূরি হিসেবে আজও বন্ধুত্ব রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
এসব তো রাজনীতির কর্কশ কাহিনি। কিন্তু, রাশিয়ার সত্যিকারের মন ছিনিয়ে ভারতে নিয়ে এসেছিলেন যিনি, তিনি কোনও রাষ্ট্রনেতা বা পরমাণু শক্তিধর নেতা নন। নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষ। দ্য লেজেন্ড অ্যাক্টর রাজ কাপুর। ব্রেজনেভ-ইন্দিরা সাক্ষাতেরও বহুকাল আগের ঘটনা। ১৯৫০ সাল। মস্কো বিমানবন্দর লোকে লোকারণ্য। ভক্তরা চিৎকার করছে, বাঁধ ভেঙে এগিয়ে আসতে চাইছে। মাত্র একটি মানুষের কারণে। তাঁর নাম রাজ কাপুর। যাঁকে সোভিয়েত রাশিয়ার উপদেবতা বলে বর্ণনা করেছিলেন ঋষি কাপুর। সেই রাজ কাপুরে ছবি রাশিয়ার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল।
রাজ কাপুরকে বিমানবন্দরের ট্যাক্সিতে বসিয়ে সেই ট্যাক্সি কাঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিল মানুষ। এক সিনেমা সমালোচক অনেককাল পরে বলেছিলেন, রাশিয়ায় তিনজন হিরো আছেন। একজন জওহরলাল নেহরু, দ্বিতীয়জন ইন্দিরা গান্ধী ও তৃতীয় ব্যক্তিটি হলেন রাজ কাপুর। যাঁকে প্রতিটি রুশ মানুষ চেনেন। রাজ কাপুর হলেন প্রথম সেই ব্যক্তি যিনি ১৯৫৪ সালে ভিসা ছাড়াই মস্কো গিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট দেশের কঠিনতম প্রটোকল সত্ত্বেও রুশ সরকার তাঁকে অভিবাসন ছাড়পত্র ছাড়াই ঢুকতে দিয়েছিল দেশে।
এমনকী রাজ কাপুরের এই জনপ্রিয়তা দেখা গিয়েছিল ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মস্কো সফরের সময়েও। ক্রেমলিনের প্রেসিডেন্সিয়াল অর্কেস্ট্রায় বাজানো হয়েছিল আওয়ারা হুঁ। সিনেমার বাইরে রাজ কাপুর ভারত-রাশিয়ার সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রদূতে পরিণত হয়েছিলেন।