রবির লেখা সেই গানে পরে সুর বসিয়েছিলেন জ্যোতি ঠাকুর। 'সরোজিনী'র মতোই দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল সেই নাটকের গান। ১২ বছরের ছোটভাই রবি অবাক করেছিল জ্যোতিদাদাকে (Jyotirindranath Tagore)।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 15 November 2025 15:27
ঠাকুরবাড়িতে তখন পালাবদল চলছে। নাট্য-কাব্য-সুরের যে দ্যুতিমান সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন জ্য়োতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেখানে ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে রবির আলো। ১৪ বছর বয়সে জ্য়োতিদাদাকে অবাক করে দিয়েছিলেন রবি (Rabindranath Tagore)। তাঁর নাটক 'সরোজিনী'তে 'জ্বলজ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ' গানটি লিখে। রবির লেখা সেই গানে পরে সুর বসিয়েছিলেন জ্যোতি ঠাকুর। 'সরোজিনী'র মতোই দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল সেই নাটকের গান। ১২ বছরের ছোটভাই রবি অবাক করেছিল জ্যোতিদাদাকে (Jyotirindranath Tagore)।
তারপর শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। পরের পর নানা কাব্য রচনা তো আছেই, সঙ্গে সুরসৃষ্টি। জ্যোতিদাদার সঙ্গে থেকে থেকে সেটা যে পুরোদস্তুর রপ্ত করে ফেলেছেন তিনি। সরলাদেবীর লেখা থেকে জানা যায়, কখনও তাঁর রবিমামা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন বৈষ্ণব পদাবলীর ‘ভরা ভাদর মাহ ভাদর’-এ সুর বসাতে, কখনও আবার তাঁর চেতনা আচ্ছন্ন করত বিহারীলাল চক্রবর্তীর ‘বুঝতে নারি নারী কী চায়’। আত্মকথা ‘জীবনের ঝরাপাতা’য় কবির ভাগ্নি সরলাদেবী লিখেছেন,‘‘জীবনের প্রথমদিকে কাব্য বা সঙ্গীতের রসগ্রাহিতায় রবীন্দ্রের আত্মপর বিচার ছিল না। যে কবির যেটি ভাল লাগত সেটিতে নিজের সুর বসিয়ে গেয়ে ও গাইয়ে তার প্রচার করতেন (Jana Gana Mana)।’’
রবি তখন উদীয়মান। আর মধ্যগগনে বিরাজ করছেন বঙ্কিমচন্দ্র (Bankim Chandra Chatterjee)। হঠাৎ সত্য়ের ধারণা নিয়ে বাঁধল গোল। রবীন্দ্রনাথ বললেন, মিথ্যে কখনই কহতব্য নয়, ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেও নয়। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র ব্যতিক্রমকে সমর্থন করলেন। প্রস্তুত হল সংঘাতের ক্ষেত্র। এই লড়াইয়ে নিজের দুই দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথকেও পাশে পেলেন না কবি। তবে প্রবল উচ্ছ্বাসে ঠাকুরবাড়ির নতুন প্রজন্ম কেউ তাদের রবিকা আর কেউ তাদের রবিমামার পাশে দাঁড়াল। প্রকাশ্য সভায় বঙ্কিমচন্দ্রের মতের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথ।
তাতে কী! বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম স্তোত্রে সুর দেওয়ার সময় এগোতে পিছপা হলেন না ঠাকুরবাড়ির রবি।
বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাং
শস্যশ্যামলাং
মাতরম্৷৷
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্৷৷
তবে বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম’ স্ত্রোত্রের প্রথম দুটো স্তবকেই শুধু সুর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাকিটা তবে কে? ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থে সেই গল্পই শোনালেন কবির ন’দি স্বর্ণকুমারীদেবীর কন্যা সরলাদেবী। তাঁর লেখায় পাওয়া যায়, ‘‘একদিন মাতুল আমাকে ডেকে বললেন তুই বাকিটুকুতে সুর দিয়ে ফেল না। ওরকম ভার মাঝে মাঝে আমায় দিতেন। তাঁর আদেশে ‘সপ্তকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদ করালে’ থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবের সঙ্গে ও গোড়ার সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুর দিয়ে ফুটিয়ে নিলুম। দুই একটা জাতীয় উৎসবে সমস্বরে বহুকণ্ঠে বহুজনকে গাইতেও শেখালুম। সেই থেকে সভাসমিতিতে সমস্তটাই গাওয়া হতে থাকল।’’
আসলে রবীন্দ্রনাথ যে নিশ্চিত হয়ে ঠিক লোককেই নির্বাচন করেছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাড়িতে দেশি-বিদেশি সংগীতচর্চার চল যে ছিলই। সেই পরিবেশেই হাতেখড়ি, তারপর প্রেম। এভাবেই শুরু হয়েছিল নিজেকে ধীরে ধীরে গড়ে নেওয়ার পালা। নানা ধর্মসঙ্গীত শেখার পাশাপাশি সরলা বিদেশী গানের চর্চা করতেন মেম সাহেবদের কাছে। কালে কালে দক্ষ হয়ে উঠলেন বাংলা গানে ইংরেজি কর্ড ব্যবহারে। ১২ বছরের জন্মদিনে তাই তো রবিমামা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ইউরোপীয় মিউজিক লেখার ম্যানুস্ক্রিপ্টের খাতা।
সরলা লিখছেন, ‘‘সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে বলে- রবিমামার একটি ব্রহ্মসংগীতকে আমি রীতিমতো একটি ইংরেজি বাজনার piece-এ পরিণত করেছিলুম। পুরোদস্তুর ইংরেজি piece,পিয়ানোতে বা ব্যান্ডে বাজাবার মতো। না জানলে কেউ চিনতে পারবে না এর ভিতরটা দিশী গান, জানলে- তারা উদারা মুদারা তিনটে গ্রামে ছড়ানো কর্ডের বহুস্বরের বৈচিত্রের ভিতর থেকে আসল সুরটির উঁকিঝুকি ধরে ফেলে বিস্ময়ামোদিত হবে।’’
এবার বন্দে মাতরমের গল্পে ফিরি। ময়মনসিংহে সুহৃদ সমিতির সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সরলাদেবী চৌধুরানীকে। স্টেশন থেকে প্রসেশন করে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময় ধ্বনি উঠল ‘বন্দেমাতরম’। তারপর থেকেই সারা বাংলা তো বটেই, গোটা দেশের মন্ত্র হল এই শব্দবন্ধ। সরলাদেবী লিখেছেন, ‘‘ বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যখন গভর্নর সাহেবের অত্যাচার আরম্ভ হল আহিমালয়কুমারিকা পর্যন্ত ঐ বোলটি ধরে নিল।’’
সরলাদেবী বিয়ের পরে বেনারস কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। সভাপতি গোখলে। আচমকাই অনুরোধ আসতে থাকে তাঁকে দিয়ে বন্দেমাতরম গাওয়ানোর। তখন সভা সমিতিতে বন্দে মাতরম (Vande Mataram) গাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। বিপদে পড়লেন সাবধানপন্থী গোখলে। কীভাবে যাবেন সরকারের আদেশের বিরুদ্ধে! কিন্তু আগত প্রতিনিধিদের অনুরোধই বা ফেলেন কী করে! সরলাদেবীর কলমে ফুটে উঠেছে সেই টানাপড়েনের ছবি। ‘‘তখন গোখলে আমার কাছে একটা ক্ষুদ্র লিপি পাঠালেন গাইতে অনুরোধ করে। সঙ্গে সঙ্গে লিখলেন, সময় সংক্ষেপ, সুতরাং দীর্ঘ গানের সবটা না গেয়ে ছেঁটে গাই যেন। কোন অংশটা ছাঁটা তাঁর অভিপ্রেত ছিল জানি নে, আমি মাঝখানে একটুখানি ছেঁটে চট করে ‘সপ্ত কোটির’ স্থলে ‘ত্রিংশ কোটি ’ বলে সমগ্রটা গাওয়ারই ফল শ্রোতাদের কাছে ধরে দিলুম, তাঁদের প্রাণ আলোড়িত হয়ে উঠল।’’