ব্যারিস্টার থেকে দূরপাল্লার সাঁতারু এমনকী সেখান থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেশম রফতানিকারী।

মানসিক যন্ত্রণা, উদ্বেগ দিয়ে তিলতিল করে কমিউনিস্ট শাসকরা মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছিল ‘শিল্পপতি’ মিহির সেনকে।
শেষ আপডেট: 10 November 2025 15:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিস্মৃত বাঙালি মিহির সেন। প্রথম ভারতীয় সাঁতারু যিনি ইংলিশ চ্যানেল পার করেছিলেন, আদতে কিন্তু ছিলেন ব্যারিস্টার। সেই ব্যারিস্টার থেকে দূরপাল্লার সাঁতারু এমনকী সেখান থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেশম রফতানিকারী। সব কিছুতেই মিহির সেন ছিলেন শুধু বাঙালির নয় দেশের গৌরব। সেই মিহির সেনই পড়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর রোষানলে। সদ্য মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বদলা-রাজনীতির রোষানলে ছারখার হয়ে যান মিহির সেন। মাত্র ৬৬ বছর বয়সেই জীবনদীপ নিভে যায় একাধিক স্নায়ুর রোগে। মানসিক যন্ত্রণা, উদ্বেগ দিয়ে তিলতিল করে কমিউনিস্ট শাসকরা মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছিল ‘শিল্পপতি’ মিহির সেনকে। ১৬ নভেম্বর মিহির সেনের ৯৫-তম জন্মবার্ষিকী।
রাজ্যের সিপিএম বিরোধীরা জ্যোতি বসুকে বহু ঘটনার জন্য দায়ী ঠাউরে থাকেন। মরিচঝাঁপি থেকে আরও অনেক অন্ধকার দিক রয়েছে জ্যোতি বসু সরকারের ঘাড়ে। কিন্তু, খুব কম লোকেই জানেন এই ঘটনার কথা। বিশ্ববিখ্যাত সাঁতারু মিহির সেনের সঙ্গে জ্যোতি বসু স্বয়ং এবং তাঁর দলের সাঙ্গোপাঙ্গরা যা ঘটিয়েছিল তা অকল্পনীয়। জ্যোতি বসুর ‘নির্দেশ’ অমান্য করায় হাড়মাস কালি করে ছেড়ে দিয়েছিল সিপিএম।
১৯৫৮ সালে ইংলিশ চ্যানেল পার করার পরের বছর ভারত সরকার মিহির সেনকে পদ্মশ্রী এবং ১৯৬৭ সালে পদ্মভূষণ সম্মান দেয়। ব্যতিক্রমী প্রতিভার কারণে ব্লিৎজ নেহরু ট্রফিও পান মিহির সেন। মিহির সেনের তহবিলে ছিল পক প্রণালী, তুরস্কের দারদানেলস প্রণালী এবং পানামা ক্যানেল জয়।
সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নের উত্তরে মিহির সেনকে সকলেই সাঁতারু বলে জানেন। অথচ তাঁর পিছনে রয়েছে আরও একটি কাহিনি। লোকে বলে বাঙালির ছেলে ব্যবসা করতে জানে না। কিন্তু মিহির সেন তা ভ্রান্ত প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। কলকাতার কাছেই তিনি একটি রেশম গুটি কারখানা তৈরি করেন। তাঁর নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে সেই কোম্পানিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেশম উৎপাদনকারী কারখানায় পরিণত করেন।
সেই সময় তাঁর জীবনে উপস্থিত হন জ্যোতি বসু। ভাগ্য অথবা বামপন্থার মনে মনে ছিল অন্য ছক। সেটা ১৯৭৭ সাল। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন প্রায়। ইন্দিরা গান্ধী জমানার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। সেই সময় জ্যোতি বসু মিহির সেনকে ‘নির্দেশ’ দেওয়া জ্যোতি বসুর জন্য প্রচার করতে। এই অনুরোধের সঙ্গেই তাঁর কাছে একটি লোভনীয় সরকারি পদের টোপও দেওয়া হয়। কিন্তু, মিহির সেন সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেন। শুধু তাই নয়, তার পরদিনই তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন।
ইতিহাস জানে, ওই ভোটে কমরেড জ্যোতি বসু বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেন। কিন্তু তিনি মিহির সেনের ‘বেয়াদবি’ বরদাস্ত করতে পারেননি। যার প্রত্যুত্তর মেলে ধারাবাহিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে। বিরোধীদের কথায়, জ্যোতি বসু সিপিএমের গুন্ডাবাহিনীকে লেলিয়ে দেন মিহির সেনের বিরুদ্ধে। তাঁক কোম্পানিতে শুরু হয় নিয়মিতভাবে ধর্মঘট, চলতে থাকে হুমকি এবং গন্ডগোল।
মিহির সেন যখনই শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি মানতে অস্বীকার করছেন, তখনই তাঁর অফিস, দোকান এবং কারখানার দেওয়ালে নিন্দা ও ধিক্কার জানানো স্লোগান লিখে দিচ্ছে সিটু বাহিনী। দিনের পর দিন সিটুর ধর্মঘটে তাঁর কারখানা ও ব্যবসা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। খিদিরপুরে তাঁর কারখানায় যেখানে একদিন গমগম করত উৎপাদনের শব্দে, তা রাতারাতি ভূতের আড্ডায় পরিণত হয়।
আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ গোটা বিষয়টি নীরব দর্শক হয়ে দেখে। মিহির সেন মাথা নোয়াতে অস্বীকার করায় সিটু কর্মীরা একটি ট্রাকবোঝাই রফতানির ট্রাক আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। কয়েক লক্ষ টাকার সামগ্রী ছাই হয়ে গেলেও পুলিশ তা থামানোর চেষ্টা করেনি।
এখানেই শেষ নয়, জ্যোতি বসুর পলিশ মিহির সেনের বাড়ি, কোম্পানি, কারখানা- সর্বত্র তল্লাশি অভিযান চালায়। তাঁর নগদ টাকাকড়ি, সম্পত্তি সবকিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়। যে মানুষটি একদিন দেশকে গর্বিত করেছিলেন, তিনি কোনওমতে পরিবারের জন্য সামান্য খাবার জোগাড় করতে পারতেন সেই সময়। মাত্র ৫০ বছর বয়সে মিহির সেনের একটি স্ট্রোক হয় এবং তিনি স্মৃতিভ্রংশ হন। তার মধ্যেও বিভিন্ন মামলায় হাজিরা দিতে তিনি আদালতে আসতেন। সেখানে বামপন্থী আইনজীবীরা তাঁকে এবং স্ত্রীকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশা, বিদ্রূপ করতেন।
এরপর ১৯৮৮ সালে জ্যোতি বসু এই ভেঙে যাওয়া মানুষটিকেই আবার ডেকে বামফ্রন্টে যোগদানের প্রস্তাব দেন। মিহির সেন সেখানে বসেই সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এরপরেও বামপন্থী কর্মীরা তাঁকে হেনস্তা ও অপদস্থ করতেই থাকে। ১৯৯৭ সালে মিহির সেন যখন মারা যান, তখন তিনি একেবারে দেউলিয়া। কানাকড়িটিও ছিল না তাঁর কাছে। কেবলমাত্র জীবনবিমা কোম্পানির দেওয়া আলিপুরের ফ্ল্যাটটি ছাড়া।
এখানেই শেষ নয়, মিহির সেনের লন্ডনবাসী মেয়ে বাবার মৃত্যুর কয়েক মাস পরে আলিপুরের ফ্ল্যাটে এসে দেখেন সেখানে ভাঙচুর করা হয়েছে। মিহির সেনের পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ পদক সহ অন্যান্য বহু কিছু লুট হয়ে গিয়েছে। এমনকী মেয়েকেও ওই ফ্ল্যাটের দখল ছেড়ে দিতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল স্থানীয় থানায় অভিযোগও জানিয়েছিলেন তিনি। এইভাবে কমিউনিস্ট শাসকরা কথা অমান্য করার প্রতিশোধ নিয়েছিল ভারতের গর্ব মিহির সেনের বিরুদ্ধে।